নজরদারির শঙ্কায় স্বস্তি নেই ইরানিদের
পোস্ট ডেস্ক :

ইরানে টানা ৮৮ দিনের প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বিভ্রাটের পর মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে সীমিত পরিসরে সংযোগ ফিরতে শুরু হয়েছে।
জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রথমে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
ফেব্রুয়ারিতে ধীরে ধীরে সংযোগ ফিরতে শুরু করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর আবারও নতুন করে ব্ল্যাকআউট জারি করা হয়। খরচসাপেক্ষ ভিপিএন ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে অল্প কিছু মানুষ মাঝেমধ্যে অনলাইনে আসতে পারলেও অধিকাংশ নাগরিক কার্যত ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতায় ছিল।
যারা ভিপিএনের উচ্চমূল্য বহন করতে পারেননি, মঙ্গলবারই তাদের প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিরে আসার সুযোগ হয়।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ফিরে আসা উদযাপনের বদলে অনেকের মধ্যে উৎকণ্ঠা এবং ক্ষোভ তৈরি করেছে।
তেহরানের ৪২ বছর বয়সী শিল্পী এলি (ছদ্মনাম) প্রথমবারের মতো ২৮ ফেব্রুয়ারির পর ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি একটা সিগারেট ধরালাম, সাউন্ডক্লাউড চালালাম, আমাদের প্রিয় গান শুনলাম। আমি আর আলি (স্বামী) চোখের পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছিলাম। পরে কাঁদলাম।
নিজেদের বোঝালাম, এই শাসনের পতনের পর যে বড় স্বাধীনতা আসবে, এটা তারই ছোট্ট এক স্বাদ… এবং আমরা সত্যিই তা বিশ্বাস করি।’
ইরানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় সচলের পর নেটওয়ার্ক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থীরা।
তেহরানের এক শিক্ষার্থী ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘হ্যালো, মনে হচ্ছে আমি যেন কারাগার থেকে সাময়িক ছুটিতে বের হয়েছি।’
আংশিক ইন্টারনেট পুনঃসংযোগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হলেও সরকারপন্থীদের অনেকেই এটিকে স্বাগত জানান।
তেহরানের আলোকচিত্রী মরিয়ম বলেন, ‘উৎসব আর হাততালি দেখতে বমি পাচ্ছিল।
এটা একেবারেই হাস্যকর। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো যেভাবে আংশিক সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়াকে সরকারের কোনো সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছে, সেটা অবিশ্বাস্য। ইন্টারনেট আমাদের মৌলিক অধিকার।’
তিনি জানান, ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তিনি কোনো অ্যাসাইনমেন্ট পাননি। সংসার চালাতে মা-বাবার কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে। তবু আংশিক সংযোগে কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এই আলোকচিত্রী বলেন, ‘মোবাইল ইন্টারনেট এখনো ঠিকমতো কাজ করে না। হোয়াটসঅ্যাপও প্রায় অচল। শুধু ভিপিএনে কিছুটা সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে, এটুকুই।’
নির্বাচিত কিছু খাতের ব্যাবসায়িক প্রয়োজন মেটাতে গত মাসে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সীমিত পরিসরে ‘ইন্টারনেট প্রো’ অনুমোদন দেয়। কেউ কেউ আশা দেখলেও অনেকেই এটিকে নজরদারির নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন।
জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার হওয়া ২৩ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী মিনা বলেন, “পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার কোনো কারণ তাদের নেই। বরং এটা হয়তো মানুষকে ‘ইন্টারনেট প্রো’ কিংবা এমন কোনো নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা, যেখানে আমাদের আরো সহজে নজরদারি করা যাবে। আমরা একে বলি ‘ফিল্টারনেট’। এটা স্বাধীনতার লক্ষণ নয়।”
সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কিংবা মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের স্মরণসহ জানুয়ারির বিক্ষোভে নিহত সন্তানদের ছবি আঁকড়ে ধরা মায়েদের কান্না ও যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য। এসব দেখে অনেক ইরানি জানিয়েছেন, ফোন স্ক্রল করতে করতে তারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
তেহরানের অধ্যাপক আমিন নামে একজন বলেন, ‘আমার অ্যাকাউন্ট ভরে গেছে মায়েদের কান্না, বাবার চিৎকার আর বাবা-মায়ের কবরের পাশে শুয়ে থাকা শিশুদের ভিডিওতে। আমার হৃদয় আগের চেয়েও ভারী হয়ে গেছে। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় পরাজিত আমরা। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র নয়। আমরা হারিয়েছি জীবিকা, যৌবন আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বাস।’
তিক্ত রসবোধও ধীরে ধীরে ফিরছে। কারাজের তথ্য-প্রযুক্তি পেশাজীবী মইন বলেন, ‘ট্রাম্পের উচিত ডিএম বন্ধ রাখা। যারা তার ওপর ভরসা করেছিল, তাদের ক্ষোভের মুখোমুখি তিনি এখনো হননি। সরকার স্পষ্টতই জনমতযুদ্ধে এগিয়ে গেছে। কারণ সরকারবিরোধীরাও এখন ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ।’
বিদেশে থাকা ইরানিদের জন্যও এই অনলাইন প্রত্যাবর্তন ছিল মিশ্র অনুভূতির। প্যারিসভিত্তিক মানবাধিকারকর্মী মাহশিদ নাজেমি বলেন, ‘আমি একই সঙ্গে আনন্দ আর শোক অনুভব করেছি। যারা এখনো অনলাইনে আসেনি, তাদের অ্যাকাউন্ট বারবার দেখছিলাম। জানি না তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, নাকি নিহত।’
তিনি জানান, তার বোন জীবিকার জন্য ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। দীর্ঘ সংযোগ বিচ্ছিন্নতায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। জানুয়ারির বিক্ষোভ ও যুদ্ধে নিহতদের ছবি তাকে গভীর শোকে ডুবিয়েছে।
অধ্যাপক আমিনের ভাষায়, ‘সব সত্য বিষয় অনলাইনে ফিরে আসতে শুরু হয়েছে, ফলে এটি আর স্বাধীনতা নয়—আমাদের দুর্ভোগ।’




