পাক নাগরিকদের বিরুদ্ধে আমিরাতের ‘নীরব নিষেধাজ্ঞা’

Published: 30 July 2026

পোস্ট ডেস্ক :


সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পাকিস্তানিদের ওপর ‘নীরব ভিসা নিষেধাজ্ঞা’ ইসলামাবাদের ব্যবসায়ী মহলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
পাক ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও বাণিজ্য প্রতিনিধিদের অভিযোগ, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অঘোষিত বিধিনিষেধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। খবর ফার্স্ট পোস্টের।সংবাদ বিশ্লেষণ

পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএই সরকার পাকিস্তানি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও বণিকদের জন্য নতুন ভিসা ইস্যু কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।

তবে ইউএই কর্তৃপক্ষ এ দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, পাকিস্তানি নাগরিকদের ওপর কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা নেই এবং সব ধরনের ভিসা আবেদন স্বাভাবিক নিয়মেই প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে।
এদিকে পাকিস্তানের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ইউএইর ভিসা বিধিনিষেধকে “গুরুতর চ্যালেঞ্জ” হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের অমিল রয়েছে।
পাকিস্তান ফেডারেশন অব চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফপিসিসিআই) সাবেক মহাসচিব শাহিদ আনোয়ার এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি অবস্থানের সঙ্গে বহু পাকিস্তানি ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

রাওয়ালপিন্ডি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শওকত বলেন, দুবাই, শারজাহ ও আবুধাবিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করা অনেক পাকিস্তানি উদ্যোক্তাও এখন ভিসা পেতে সমস্যায় পড়ছেন।Executive Branch

তার ভাষায়, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক বৈঠক বাতিল হচ্ছে এবং অনেক রপ্তানিকারক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ হারিয়েছেন।
পাকিস্তান সল্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইসমাইল সত্তার বলেন, ভিসা সীমাবদ্ধতার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট না হওয়ায় ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল পাঠানো এবং রপ্তানি কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

ইউএই’র প্রতিক্রিয়া
ইউএই বারংবার জানিয়েছে, পাকিস্তানি নাগরিকদের ওপর কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে করাচি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কেসিসিআই) সদস্য জিয়া উল আরফিন বিষয়টি নিয়ে ইউএইর কনসাল জেনারেলকে চিঠি পাঠালেও কোনো জবাব পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

কেসিসিআইর আরও কয়েকজন সদস্য সতর্ক করে বলেছেন, সমস্যা অব্যাহত থাকলে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষ করে, দুবাইয়ের গালফুড প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে নিজেদের পণ্য প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে বহু পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু ভ্রমণ অনুমোদন জটিল হয়ে পড়লে এসব ব্যবসায়িক বৈঠক ও অংশগ্রহণ ব্যাহত হতে পারে।
পাকিস্তানের শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের মতে, এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু রপ্তানি নয়; স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন খাতেও পড়ছে।

অন্যদিকে বিমান চলাচল-সংশ্লিষ্ট পরামর্শকরা জানিয়েছেন, বিশেষ করে ভিজিট ও পারিবারিক ভিসা পাওয়ার জটিলতার কারণে ইউএইগামী যাত্রীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

পাকিস্তান-ইউএই সম্পর্কে টানাপোড়েন
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের শেষ দিকে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়।
চলতি বছরের এপ্রিলে ইউএই হঠাৎ করেই পাকিস্তানের কাছে বকেয়া ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ফেরত চায়।

পরবর্তীতে পাকিস্তান জানায়, তারা ইউএইকে ২ বিলিয়ন ডলারের একটি আর্থিক আমানত ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকার এটিকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় একটি নিয়মিত আর্থিক লেনদেন হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আবুধাবির অনুরোধেই অর্থ ফেরত দেয়া হচ্ছে।

গত ৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঋণ পরিশোধ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন মন্তব্যকে “ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর” বলে উল্লেখ করেছে।
তাদের দাবি, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে সংরক্ষিত অর্থটি ছিল পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়তার জন্য গৃহীত বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অংশ।
তবে সরকারি ও আর্থিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএইর অনুরোধের পরই অর্থ ফেরতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এসব বিতর্কের মধ্যেও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, দুই দেশের সম্পর্ক এখনো পারস্পরিক আস্থা, কৌশলগত সহযোগিতা এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে দৃঢ রয়েছে।

পাক মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আস্থা ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ইউএইর দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক রয়েছে।
এছাড়া দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইউএই’র প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ভূমিকারও প্রশংসা করেছে ইসলামাবাদ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, যদি পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবেই অঘোষিত বিধিনিষেধ কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে তা পাকিস্তান-ইউএই সম্পর্কের চলমান টানাপোড়েনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।