সিলিকনের স্বপ্নে ভারত: বিশ্ব চিপ শিল্পে নতুন শক্তি হওয়ার পথে
সোহিনী মন্ডল:
নয়াদিল্লি: একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতি ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠছে সেমিকন্ডাক্টরের ওপর। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসা প্রযুক্তি থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা শিল্প পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই চিপ এখন অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে ভারত নিজেকে বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সেই বার্তাই আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘সেমিকন’ সম্মেলনে মোদি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্ব যখন নতুন ও নির্ভরযোগ্য উৎপাদন কেন্দ্রের সন্ধান করছে, তখন ভারত সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত। তাঁর দাবি, ভারতীয় কারখানাগুলোতে উৎপাদিত চিপ ইতোমধ্যেই দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছাতে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোভিড-১৯ মহামারি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার ফলে চিপের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে বহুবার। এর ফলে বিশ্বজুড়ে শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বাস্তবতায় অনেক দেশ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ শৃঙ্খলের বিকল্প উৎস খুঁজছে। ভারত সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়।
সম্মেলনে ফক্সকন, ইন্টেল, মাইক্রন, এএসএমএল, অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস ও টাটা ইলেকট্রনিক্সসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উদ্দেশে মোদি ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন দক্ষ মানবসম্পদকে। তিনি জানান, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য এক লক্ষ প্রকৌশলী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের জন্য এক কোটিরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, এই বিশাল প্রতিভার ভাণ্ডার ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে।
ভারত সরকার ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিপুল আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ‘সেমিকন ২.০’ কর্মসূচির আওতায় ১৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তা দেওয়া হবে, যার লক্ষ্য দেশীয় চিপ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি-ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। নতুন উৎপাদন ইউনিট, প্যাকেজিং ব্যবস্থা, গবেষণা ও সরঞ্জাম নির্মাণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে এই উদ্যোগের মাধ্যমে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। তাইওয়ান, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও চীনের মতো দেশগুলো কয়েক দশকের বিনিয়োগ ও গবেষণার মাধ্যমে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। সেই তুলনায় ভারত এখনও পথের শুরুতেই। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃহৎ বাজার, সরকারি সহায়তা এবং বিপুল জনশক্তি ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্প যখন নতুন ভারসাম্য খুঁজছে, তখন ভারত নিজেকে কেবল একটি বাজার নয়, বরং একটি উৎপাদন ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। সেই লক্ষ্যে মোদির এই উদ্যোগ ভারতের প্রযুক্তি-অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




