ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্মুক্ত সীমান্ত ভারত-নেপালকে দীর্ঘদিন ধরে কাছাকাছি রেখেছে। কিন্তু বদলে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব যথেষ্ট নয়। সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন আরও কার্যকর ও আধুনিক অংশীদারত্ব।

ভারত–নেপাল সম্পর্ক: ঐতিহ্যের বন্ধন থেকে আধুনিক অংশীদারত্ব

Published: 2 November 2026

ভারত ও নেপালের সম্পর্কের গভীরতা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অবাধ যাতায়াত দুই দেশকে এক বিশেষ বন্ধনে যুক্ত করেছে। কিন্তু সম্পর্কের আগামী অধ্যায় শুধু অতীতের ঘনিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো, এই পারস্পরিক নির্ভরতাকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে দুই দেশ। সাধারণ মানুষের কাছে ভারত-নেপাল সম্পর্ক শুধু কূটনীতির বিষয় নয়। কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও পারিবারিক প্রয়োজনে প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে যাতায়াত করেন বহু মানুষ। ভারতের বাজার, বন্দর ও পরিবহন নেটওয়ার্ক নেপালের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নেপালের স্থিতিশীলতা, জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে ভারতেরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। তাই দুই দেশের সম্পর্কের সাফল্য কতটি চুক্তি হলো, তা দিয়ে নয়, বরং সাধারণ মানুষ তার সুফল কতটা পেলেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।
সীমান্তে চাই নিরাপত্তা ও সহজ চলাচলের ভারসাম্য
উন্মুক্ত সীমান্ত ভারত-নেপাল সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে এর সঙ্গে মানব পাচার, চোরাচালান, নথি জালিয়াতিসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিও রয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। তবে সীমান্তকে অতিরিক্ত কঠোর করে বৈধ যাতায়াত ও বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করাও সমাধান নয়। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, শুল্ক কর্তৃপক্ষ ও দুই দেশের সরকারের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ই হতে পারে কার্যকর পথ। লক্ষ্য হওয়া উচিত স্পষ্ট: নিরাপত্তা বাড়বে, কিন্তু মানুষের বৈধ চলাচল ও বাণিজ্য সহজ থাকবে।
জলবায়ু সংকটে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র
জলবায়ু পরিবর্তন দুই দেশের সামনে আরও বড় অভিন্ন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বন্যা, ভূমিধস কিংবা চরম আবহাওয়া সীমান্ত মানে না। নেপালের দুর্যোগ ভারতের ভাটির জনপদে প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সীমান্ত যোগাযোগ ব্যাহত হয়। তাই দুর্যোগ প্রস্তুতিকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ করা প্রয়োজন। নদী ও আবহাওয়ার তথ্য দ্রুত বিনিময়, সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং যৌথ উদ্ধার ও দুর্যোগ মোকাবিলা প্রশিক্ষণের মতো উদ্যোগ বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। কূটনৈতিক ঘোষণার চেয়ে বন্যার আগে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়াই ‘বিশেষ সম্পর্কের’ মূল্য আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে।
যোগাযোগ প্রকল্পে চাই বাস্তব ফল
সড়ক, রেলপথ, সীমান্ত চেকপোস্ট, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বদলে দিতে পারে। কিন্তু শুধু প্রকল্প ঘোষণা যথেষ্ট নয়। শুল্ক ছাড়পত্রে কত সময় লাগছে, সীমান্তে যানজট কমছে কি না, পণ্য পরিবহনের ব্যয় কতটা কমল এবং ঘোষিত প্রকল্প সময়মতো শেষ হচ্ছে কি না, এগুলোই হওয়া উচিত অগ্রগতির মাপকাঠি। একইভাবে জলবিদ্যুৎ চুক্তির সাফল্যও শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়। সেই বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে বাজারে পৌঁছানোর অবকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি।
মতপার্থক্যে চাই পরিণত কূটনীতি
ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। সীমান্ত, আকাশপথ, বাণিজ্য, ট্রানজিট কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ভবিষ্যতেও দুই দেশের সম্পর্কের পরীক্ষা নিতে পারে। তবে প্রতিটি বিরোধকে কূটনৈতিক সংকটে পরিণত হওয়ার প্রয়োজন নেই। জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের বদলে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক ও কারিগরি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর সমাধান খোঁজা বেশি কার্যকর। বড় প্রতিবেশী হিসেবে নেপালের রাজনৈতিক পরিসরের প্রতি সংবেদনশীলতা ও সম্মান দেখানোর বিশেষ দায়িত্ব ভারতের রয়েছে। অন্যদিকে নেপালও ভারতের সঙ্গে দূরত্বকে কৌশলগত স্বাধীনতার মাপকাঠি না বানিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ করতে পারে।
ইতিহাসের বন্ধন থেকে আধুনিক অংশীদারত্ব
ভারত-নেপাল সম্পর্ক বহুবার উষ্ণতা, মতবিরোধ ও পুনর্মিলনের মধ্য দিয়ে গেছে। সংকটের পর প্রায়ই সম্পর্ক নতুন করে ‘রিসেট’ করার কথা ওঠে। কিন্তু এখন আর শুধু আরেকটি রিসেট যথেষ্ট নয়। দুই দেশের নতুন করে ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সেই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার প্রতিষ্ঠান ও সহযোগিতার কাঠামোকে আধুনিক করা। ভবিষ্যতের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় দুর্যোগ মোকাবিলা, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, ডিজিটাল সংযোগ, বাণিজ্য ও ট্রানজিট এবং আগের চুক্তিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত ভারত-নেপাল সম্পর্কের সাফল্য যৌথ ঘোষণা কিংবা কূটনৈতিক উষ্ণতায় নয়, বাস্তব ফলাফলে বিচার হবে। সীমান্তে চলাচল সহজ হলো কি না, অবকাঠামো সময়মতো তৈরি হলো কি না, বিদ্যুৎ বাজারে পৌঁছাল কি না, তরুণদের সুযোগ বাড়ল কি না কিংবা দুর্যোগের সতর্কবার্তা সময়মতো মানুষের কাছে পৌঁছাল কি না, এসবই হবে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি। বদলে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও নেপালের প্রয়োজন তাই আরেকটি কূটনৈতিক ‘রিসেট’ নয়, বরং ইতিহাসের বন্ধনের ওপর দাঁড়ানো আধুনিক, বাস্তবমুখী ও ভবিষ্যৎমুখী অংশীদারত্ব।

সুমনা আদক, যুক্তরাজ্য