কৃষ্ণসাগরে ভারতের কূটনৈতিক বাজি: যেখানে ব্যর্থ পরাশক্তিরা, সেখানে কি সফল হবে নয়াদিল্লি?
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে নতুন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ভারত; জ্বালানি অবকাঠামো, কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্য ও খাদ্য সরবরাহ সুরক্ষায় বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রায় পাঁচ বছরে গড়ালেও শান্তির কোনো সুস্পষ্ট পথ এখনও দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধবিরতির জন্য একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও অধিকাংশই কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নেপথ্যে নতুন এক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ভারত। নয়াদিল্লির প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাকে ইউক্রেন ইতোমধ্যে আলোচনাধীন উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত ও বাস্তবসম্মত বলে বর্ণনা করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এখনো সবচেয়ে বেশি আলোচনা ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু তার আড়ালেই ভারত এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার লক্ষ্য কেবল যুদ্ধের তাত্ক্ষণিক ক্ষতি কমানো নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সংঘাতের প্রভাবও সীমিত করা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের প্রস্তাব তিনটি মূল বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথমত, উভয় পক্ষের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলো দিয়ে খাদ্যশস্য ও জ্বালানি পণ্যের নিরাপদ রপ্তানি নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, বাণিজ্যিক জাহাজ ও আন্তর্জাতিক শিপিংয়ের ওপর হামলা বন্ধ করা। অর্থাৎ যুদ্ধ পুরোপুরি থামানো না গেলেও বিশ্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলোকে সংঘাতের বাইরে রাখাই নয়াদিল্লির লক্ষ্য। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কিয়েভ সফরের সময় এ বিষয়ে ইউক্রেনীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা প্রকাশ্যেই ভারতের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে টেবিলে থাকা চারটি প্রস্তাবের মধ্যে ভারতের পরিকল্পনাটিই সবচেয়ে বিস্তৃত, কারণ এটি একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যের প্রশ্নকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তবে কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়া আর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। রাশিয়া ভারতের সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে জোর দিয়েছে যে, যে কোনো সমাধানকে ‘ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই শান্তি’নিশ্চিত করতে হবে। মস্কোর আশঙ্কা, সাময়িক যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। ভারতের আগ্রহের পেছনে রয়েছে স্পষ্ট অর্থনৈতিক কারণও। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানি পথ। এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লেই বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম প্রভাবিত হয়। বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে ভারত সেই প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। দেশটির শিল্প, পরিবহন ও রপ্তানি খাত বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭ শতাংশে উন্নীত করেছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে স্থিতিশীল জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবেশ নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কও যুদ্ধ চলাকালেই নতুন মাত্রা পেয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার কিছু পরিশোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ চেইনেও নতুন নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার অর্থনৈতিক অভিঘাত দুই দেশই অনুভব করবে। বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অংশ নেওয়া দেশগুলোর লক্ষ্যও এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র মূলত জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে চায়। তুরস্কের আগ্রহ কৃষ্ণসাগরীয় শিপিং ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে। মিসরের প্রধান উদ্বেগ খাদ্য নিরাপত্তা, কারণ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গম আমদানিকারক। ভারতের অবস্থান কিছুটা আলাদা। নয়াদিল্লি একইসঙ্গে জ্বালানি, বাণিজ্য, খাদ্য সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে সামনে আনছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ ভারতের পররাষ্ট্রনীতিরও নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নয়াদিল্লি নিজেকে শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং একটি বৈশ্বিক কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখার সক্ষমতা ভারতের হাতে একটি বিশেষ কূটনৈতিক সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা রয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা। মস্কো কিংবা কিয়েভ, কেউই এখনও মনে করছে না যে তাদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। উভয় পক্ষই বিশ্বাস করে, সামরিক চাপ বজায় রাখলে আলোচনার টেবিলে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হবে। ফলে শান্তি আলোচনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনো কঠিন।
তারপরও ভারতের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেক পর্যবেক্ষক। কারণ এটি যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং এমন একটি সীমিত সমঝোতার কথা বলছে, যা জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজকে সুরক্ষিত রেখে বিশ্ব অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বিশ্বের বহু দেশ এর সুফল পাবে। এখন দেখার বিষয়, মস্কো এবং কিয়েভ যুদ্ধক্ষেত্রের হিসাব-নিকাশের বাইরে এসে সেই অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে কতটা গুরুত্ব দেয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, কৃষ্ণসাগরকে ঘিরে ভারতের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়াদিল্লিকে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টার নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকায় তুলে এনেছে। সফল হোক বা না হোক, যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় ভারতের নাম এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সুমনা আদক, UK




