পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড তুস্কের নয়াদিল্লি সফর শুধু ভারত-পোল্যান্ড সম্পর্কেই নতুন গতি আনছে না, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের জন্যও খুলছে নতুন সম্ভাবনা। এখন বড় পরীক্ষা হলো এই কূটনৈতিক অগ্রগতিকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া।
তুস্কের ভারত সফর: মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে নতুন সমীকরণ

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড তুস্কের ভারত সফরকে শুধু ওয়ারশ-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অগ্রগতি হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য ধরা পড়বে না। ভারত যখন ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বিস্তৃত করছে, তখন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপও নতুন অংশীদার হিসেবে সামনে আসছে। প্রায় ১০০ কোম্পানির প্রতিনিধিদল নিয়ে ২১ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে আসেন তুস্ক। সফরটি হয়েছে ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ হওয়ার পর। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে সম্পন্ন হওয়া এই আলোচনা দুই পক্ষের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে শুল্ক কমলেই বাণিজ্য বাড়বে না। প্রয়োজন সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব। এখানেই তুস্কের সফরের গুরুত্ব।
মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার পোল্যান্ড। ২০২৪ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। যদিও পশ্চিম ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর তুলনায় এই অঙ্ক এখনো সীমিত, তবু বৃদ্ধির সম্ভাবনা যথেষ্ট। এই সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তিও ইতিমধ্যে শক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওয়ারশ সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও মহাকাশ সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়। পোল্যান্ড নিজেকে ভারতীয় ব্যবসার জন্য ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই সুযোগ কি পোল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের অন্য দেশগুলোও সম্মিলিতভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারবে?
ভারতের ইউরোপনীতি দীর্ঘদিন পশ্চিম ইউরোপের বড় শক্তিগুলোকেন্দ্রিক ছিল। সেই ভারসাম্য বদলাতে শুরু করলে পোল্যান্ডসহ মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর গুরুত্ব বাড়তে পারে। ভারতের জন্য এতে অংশীদারত্ব বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে এ অঞ্চলের দেশগুলো পাবে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ। পরিবর্তিত ভূরাজনীতিও দুই পক্ষকে কাছাকাছি আনছে। সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি এবং নির্দিষ্ট বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভারত ও ইউরোপ উভয়কেই নতুন অংশীদার খুঁজতে উৎসাহিত করছে। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও শিল্প সহযোগিতা তাই ভবিষ্যতে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
তবে সম্পর্কের পথে বড় সংবেদনশীল বিষয় রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে উদ্বেগের বিষয়। ভারত দ্রুত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থেকে সরে আসবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং ইউরোপের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও শিল্পে ভারতের সামনে আকর্ষণীয় বিকল্প অংশীদারত্ব তৈরি করা। দুই পক্ষের সব বিষয়ে অভিন্ন অবস্থানও প্রয়োজন নেই। বরং মতপার্থক্য মেনে নিয়ে যেখানে স্বার্থের মিল রয়েছে, সেখানে সহযোগিতা বাড়ানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি। তুস্কের সফর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভারত ও পোল্যান্ডের ভূমিকার প্রশ্নও সামনে এনেছে। পোল্যান্ডের জি২০ আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ওয়ারশ সম্প্রসারিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্বের বৃহত্তর প্রশ্নটিও উঠে আসছে। তবে সফরটির সাফল্য শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক ঘোষণায় নির্ধারিত হবে না। আসল পরীক্ষা হবে নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক চুক্তি এবং প্রযুক্তি, শিল্প ও নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা কতটা তৈরি হয়। ভারতের জন্যও এটি পশ্চিম ইউরোপের প্রচলিত অংশীদারদের বাইরে সম্পর্ক বিস্তারের সুযোগ। আর মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের জন্য সুযোগটি হলো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ব্রাসেলসনির্ভর কাঠামোর বাইরে আরও প্রত্যক্ষ ও কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। তুস্কের সফর সেই সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। এখন প্রশ্ন, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ কি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠতে পারবে?
সুমনা আদক, যুক্তরাজ্য




