জাপানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-হয়রানির ‘বিস্ফোরণ’

Published: 2 June 2026

পোস্ট ডেস্ক :


জাপানে বিদেশি বাসিন্দাদের প্রতি বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক আচরণ ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা। তাদের মতে, আগে যেখানে মূলত কোরিয়ান ও কুর্দি জনগোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তু ছিল, এখন সেই তালিকায় মুসলিম সম্প্রদায়ও যুক্ত হয়েছে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক মসজিদে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিয়মিত গালাগাল ও হুমকিমূলক ফোন এবং ইমেইল আসছে।

ফলে অনেক মুসলিম এখন প্রশ্ন করছেন, হঠাৎ করে কেন তাদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। কেউ কেউ নিরাপত্তার আশঙ্কায় ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন।
ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের শেষে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার। বর্তমানে দেশটিতে ১৬০টিরও বেশি মসজিদ রয়েছে।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কারণে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। গত বছর ওসাকায় একটি গুজব ছড়ায় যে একটি মসজিদ থেকে ভোরে উচ্চ শব্দে আজান দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর জাপানের হোক্কাইডোর এবেতসুতে পাকিস্তানি নাগরিকদের পরিচালিত একটি মসজিদ ও ব্যবহৃত গাড়ির একটি শোরুমে একাধিক সন্দেহজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

টোকিওর কাছে কানাগাওয়া প্রিফেকচারের ফুজিসাওয়ায় একটি মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও হয়রানির অভিযোগও উঠেছে।
উত্তর কান্টো অঞ্চলের একটি শহরের মসজিদের নেতা আলি (নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম আলি) জানান, হঠাৎ করেই হয়রানি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, গত বছর থেকে এখন প্রতিদিনই ৫ থেকে ১০টি করে ঘৃণামূলক ফোন ও ইমেইল পান, যেখানে বলা হয়- নিজ দেশে ফিরে যাও বা জাপানে মসজিদের প্রয়োজন নেই।

আলির ভাষায়, তাদের মসজিদটি প্রায় ৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে স্থানীয়দের সঙ্গে কিছু সমস্যা থাকলেও পরে প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় সম্পর্ক উন্নত হয়। তারা নতুন অভিবাসীদের জাপানের সামাজিক নিয়ম-কানুন যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পেনশন ব্যবস্থার বিষয়েও শিক্ষা দিতেন।
আলি বলেন, মসজিদটি সবসময়ই স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সেতুবন্ধনের ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গেছে।

ওই মসজিদের নামাজ আদায় করতে আসা পাকিস্তানি এক শিক্ষার্থী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষদের ছড়ানো উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তিনি প্রশ্ন করেন, আমার জাপানি বন্ধুরা আমার ধর্মকে সম্মান করে, তাহলে এই ঘৃণা কেন?
৩০ বছর বয়সী পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জাপানি এক নাগরিকও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই বিদ্বেষ ভবিষ্যতে সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

জাপানে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামিক কবরস্থান ও হালাল স্কুল খাবারের চাহিদা বাড়ছে। তবে দেশটিতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত দাহ প্রথাই অনুসরণ করা হয়।
আইচি প্রিফেকচারাল ইউনিভার্সিটির গবেষক মিচিতো ওহাশি বলেন, স্থানীয় ছোটখাটো ঘটনাগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় অনেক সময় অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, বিদ্বেষবিরোধী আইন থাকলেও তা এখনও যথেষ্ট কার্যকর নয়।

তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয়দের উচিত মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তাদের ব্যক্তিগত মানুষ হিসেবে দেখা এবং সেই ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা।