স্টারমারের পদত্যাগের নেপথ্যে

Published: 22 June 2026

পোস্ট ডেস্ক :


অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। সেই সঙ্গে তিনি লেবার পার্টির দলীয় প্রধানের পদ থেকেও পদত্যাগ করছেন। সোমবার (২২ জুন) লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে স্টারমার এই ঘোষণা দেন।
তিনি বলেছেন, তার দল এখন যে প্রশ্নটি করছে তা হলো আগামী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না। এনিয়ে স্টারমার বলেন, এই প্রশ্নের বিষয়ে তিনি তার দলের উত্তর শুনেছেন এবং উদার মনে সেই উত্তর মেনে নিয়েছেন।
ক্ষমতায় আসার প্রায় ২৩ মাসের মাথায় পদত্যাগ করছেন স্টারমার। গত এক দশকে দেশটি ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।

স্টারমারের এই পদত্যাগের ঘোষণা হুট করে আসেনি। বিগত কয়েক মাস ধরেই তার নিজের দল লেবার পার্টির ভেতরে চাপ বাড়ছিল। তার নেতৃত্বে অসন্তুষ্ট সংসদ সদস্যরা তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরে দাঁড়ানোর দাবি জানান।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ভূমিধস জয়ের পর বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমার ক্ষমতায় বসেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে লেবার পার্টির জনপ্রিয়তার বিস্ময়কর পতন শুরু হয়। আর এ থেকেই দলটির ভেতরে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। দলটির এমপিরা এই পতন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

লেবার পার্টি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যে তারা উদারপন্থী ভোটারদের হারাচ্ছে ক্রমবর্ধমান গ্রিন পার্টির কাছে, পাশাপাশি নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে থেকেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির জনসমর্থন কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। স্টারমার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ- দুই ক্ষেত্রেই সংগ্রাম করেছেন। স্থবির জীবনমান এবং একাধিক প্রশাসনিক ভুল তার সরকারের দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন তিনি বিতর্কিত সাবেক এমপি পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে বৃটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, কুখ্যান যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন কেলেঙ্কারির সঙ্গে পিটার ম্যান্ডেলসনের সম্পর্ক রয়েছে। এ তথ্য প্রকাশের পর ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করা হয়, কিন্তু ততক্ষণে রাজনৈতিক ক্ষতি হয়ে গেছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকেই বলেছিলেন যে অভিবাসন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইস্যু স্টারমারের সম্ভাব্য প্রস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ ছাড়া সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। ফলাফলগুলোতে দেখা গেছে, বৃটেনের ঐতিহ্যগতভাবে লেবার সমর্থিত এলাকাগুলোতেই তাদের ভোটব্যাংক ভেঙে পড়েছে, একই সঙ্গে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসেও দলটির সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।Politics

বৃটেনের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি মোট ১ হাজার ৪৯৬ জন কাউন্সিলর পদ হারিয়েছে, যা ১৯৮১ সালে কনজারভেটিভ পার্টির আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া দলটি ৩৮টি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণও হারায়। এই নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে জনপ্রিয়তার ভোটে (পপুলার ভোট) শীর্ষস্থান দখল করে। আর এমন ফলাফলের পর লেবার পার্টির একাধিক মন্ত্রী পদত্যাগ শুরু করেন। এ ছাড়া শতাধিক এমপি স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে শেষমেশ রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করলেন ২৩ মাসের এই বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী।
তবে সমালোচনা সত্ত্বেও স্টারমার কিছু ক্ষেত্রে প্রশংসাও পেয়েছেন। বিশেষ করে তিনি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপীয় সমর্থন জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টাতেও যুক্ত ছিলেন।

স্টারমারের উত্তরসূরি কে হবেন?
লেবার পার্টি এখনও স্টারমারের উত্তরসূরি নির্বাচন করেনি। তবে সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি সাম্প্রতিক একটি বিশেষ নির্বাচনে সংসদীয় আসন জিতেছেন। ১৫ বছর বয়স থেকে লেবার পার্টিতে যুক্ত এই রাজনীতিবিদ ২০১৭ সাল থেকে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্টারমার ঘোষণা করেছেন যে, তার উত্তরসূরি নির্বাচনের জন্য আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তাহলে কি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই কেউ সরাসরি জয়ী হতে যাচ্ছেন?
লেবার পার্টির ক্রমবর্ধমান সংখ্যক এমপি অন্তত তেমনই মনে করছেন। আর এই দৌড়ে সবচেয়ে ফেভারিট বা এগিয়ে আছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সব হিসাব-নিকাশ এখন অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দিকেই ইঙ্গিত করছে যে, তিনিই খুব শিগগিরি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।