নির্বাচন কমিশন সতর্ক হোন

Published: 4 February 2021, 2:04 PM

।। আহমদ রফিক ।।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় নানা রাজনৈতিক কারণের টানে আকাঙ্ক্ষিত সুষ্ঠু পথ ধরে চলেনি। নব্বইয়ের দশকে যদিও গণতান্ত্রিক পথে চলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল স্বৈরাচারী শাসনের উৎখাতের পর, দ্রুতই সে ব্যবস্থার স্বাস্থ্য রক্ষা সম্ভব হয়নি। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের শর্তগুলো, আদর্শিক কাঠামোগুলো অক্ষত থাকেনি।

থাকেনি কোনো স্তরের নির্বাচনেই—জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রান্তিক স্তর পর্যন্ত কোথাও নিয়ম-শৃঙ্খলা বা নির্দিষ্ট বিধি-বিধান কোনোটিরই সুস্থতা পুরোপুরি রক্ষা করা যায়নি। সংসদীয় গণতন্ত্র স্বভাবতই অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার টানে ভেসে গেছে। অভিযোগ অনেকের এবং তা বহু রকমের।

দুই.

সম্প্রতি দেশব্যাপী সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায়। কিন্তু অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, পক্ষপাতিত্ব ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ থেকেই গেল সুষ্ঠু সংসদীয় ব্যবস্থার নিরপেক্ষ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমনকি নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নীরবতাই শ্রেয় বিবেচনা করেছে বলে প্রশ্ন উঠেছে।

একটি দৈনিক পত্রের শিরোনাম সংবাদ : ‘সহিংসতায় ম্লান ভোট উৎসব’। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে নৌকার দ্রুত অগ্রগতি। তাতে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকে না যদি নির্বাচনব্যবস্থা ও পরিবেশ স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বাস্তবে যে তা থাকেনি কিছু ঘটনা তার প্রমাণ।

নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে উল্লিখিত প্রতিবেদনের শুরুতে সংক্ষিপ্ত শিরোনামে বলা হয়েছে : ‘গোলাগুলিতে একজন নিহত। মেয়র পদে নিশ্চিত জয়ের পথে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী।’ এ পরিবেশকে কি স্বাভাবিক নির্বাচনী পরিবেশ বলা যায় বা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিফলন বলা চলে?

নির্বাচনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ‘আশঙ্কাই সত্য হলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভোটে। হামলা, গোলাগুলি ও একজনের প্রাণহানি এবং ক্ষমতাসীনদের শক্তির প্রদর্শনী ভোটের উৎসব ম্লান করে দিয়েছে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র থেকে বিরোধী দলের প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়া বা ঢুকতে বাধা দেওয়া, ভোটকেন্দ্রের প্রবেশপথসহ আশপাশের এলাকা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা… আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ পাওয়ার পরও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সবই এসেছে চট্টগ্রামে।’

এমন এক প্রশ্নবিদ্ধ পরিবেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বাকি মেয়র পদের নির্বাচনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই শেষ নয়। চট্টগ্রাম নির্বাচনের আরো কিছু অবৈধ দিক এ প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা একেবারেই বাঞ্ছিত নয় এবং নির্বাচনের বিধি-বিধানবিরোধী বলে চিহ্নিত করা যায়।

এ প্রসঙ্গে সরেজমিন অভিজ্ঞতার একটি ছোট চমকপ্রদ শিরোনাম : ‘এজেন্ট চেনেন না প্রার্থী, গোপন কক্ষ উন্মুক্ত’। এ ছাড়া মূল প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের বিবরণ এবং সেই সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের ঝলসানিতে সংঘাতের বড়সড় ঘটনার বিবরণ উদ্ধৃত। কেন্দ্রবিশেষে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সাংবাদিকদের প্রবেশে পুলিশের বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অথচ অনিয়মের অভিযোগে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশাধিকারে বাধা দেওয়ার কথা নয়। বিভিন্ন সূত্রে এজাতীয় অনিয়ম অনেক ঘটেছে চট্টগ্রাম নির্বাচনে।

শুধু আরেকটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনেও অনুরূপ অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ মিলেছে। এদের সংবাদ শিরোনাম প্রায় একই রকম : ‘উৎসব ম্লান সহিংসতায়’। বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাঙালি ভোটপাগল—ভোট দেওয়ার অধিকারটি তাদের কাছে উৎসবের বেশ ধরে আসে। তার প্রমাণ শিরোনামগুলোর বৈশিষ্ট্যে।

তিন.

কিন্তু উৎসব অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতিত্ব এবং আগ্নেয়াস্ত্রের সহিংসতায় উৎসবের মেজাজ ধরে রাখতে পারে না। একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে সকালে সাংবাদিকের দেখা দীর্ঘ ভোটার লাইন দুপুর হতেই ফাঁকা হয়ে যায়। ভীত, আতঙ্কিত ভোটাররা স্বভাবতই প্রাণভয়ে ভোটের লাইন ছেড়ে চলে যায়। অথচ দুপুরের পর ভোট সংখ্যা কমা দূরে থাক, বেড়েছে।

ওই প্রতিবেদনের শিরোনামে বিস্ময় প্রকাশ করে লেখা হয়েছে : ‘দুপুরের পর এত ভোট!’ তাদের বিশ্লেষণে প্রথম চার ঘণ্টায় গড়ে ভোট পড়েছে ৪ থেকে ৬ শতাংশ, পরের চার ঘণ্টায় তা কয়েক গুণ বেড়ে হয় ২২.৫২ শতাংশ। গুলি-সন্ত্রাস, আগ্নেয়াস্ত্রের ঝলসানি না থাকলে এ বৃদ্ধির হার নিয়ে আপত্তির কারণ থাকার কথা নয়।

কিন্তু বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনমাফিক, তাই এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। দৈনিকের শিরোনামে এ অস্বাভাবিকতা নিয়ে সংবাদ শিরোনাম ‘বিরোধীহীন চসিক মঞ্চ’। পরিবেশ সহিংস হলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তার চেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্বাচনের স্বাভাবিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে, তা হলো সর্বসাকল্যে ভোট পড়েছে মাত্র ২২.৫ শতাংশ।

অথচ সবারই প্রত্যাশা ছিল, সুষ্ঠু, সুস্থ ও নির্ভয় পরিবেশে ভোটদানপর্ব উৎসবের আমেজে সম্পন্ন হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এমনকি প্রথম ধাপের ভোটের সহিংসতা নিয়ে সংবাদপত্রগুলো সমালোচনায় মুখর হওয়া সত্ত্বেও কী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কী নির্বাচন কমিশন—কেউ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে বলে মনে হয় না।

তাই ৩১ জানুয়ারি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় সংবাদ শিরোনাম : ‘তৃতীয় দফা ভোটেও বিচ্ছিন্ন সহিংসতা’। দৈনিক কালের কণ্ঠ’র সংবাদ শিরোনামে অধিকতর সহিংসতার প্রকাশ। ‘কেন্দ্র দখল, গুলি সংঘর্ষ’। তাদের নিজস্ব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃতীয় ধাপের ভোটেও ওই একই অবস্থা। কোনো পরিবর্তন নেই। তাদের জরিপে ‘বেশ কিছু নির্বাচনী এলাকায় সংঘর্ষ, গোলাগুলি, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তৃতীয় ধাপের পৌর নির্বাচন।’

এমনটা কি প্রত্যাশিত ছিল? এমন জয় কি প্রকৃত জয়? সংসদীয় গণতন্ত্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার এটা কি সঠিক পরিচয় বহন করে? কী জবাব দেবেন নির্বাচন কমিশন। এর আগে নির্বাচন কমিশনের দুর্বল ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, সমালোচনা, অনেক কিছুই উঠে এসেছে। এমনকি সংগত কারণে দাবি উঠেছে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের। কিন্তু সেসব দাবির প্রতি কান দেওয়া হয়নি, কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি, যাতে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়। একেই কি বলে সংসদীয় গণতন্ত্র?

আমাদের প্রত্যাশা, আগামী নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে সরকার গণতন্ত্রের রীতিনীতির কথা ভেবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। যাতে নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের যথার্থ ভূমিকা পালনে বাধ্য হয়। তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ মিলবে।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •