বাংলাদেশ-ভারতের উন্নতি সমৃদ্ধি একই সূত্রে গাথা

Published: 12 March 2021, 9:52 AM

।। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)।।

অবিচ্ছেদ্য অভিন্ন সত্তাকে ছিন্ন করতে চাইলে রক্তক্ষরণ অপরিহার্য। অনবরত রক্তক্ষরণ নিয়ে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায় না।

উপমহাদেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খিস্টান, জৈন, শিখ আর শত শত ভিন্ন ভিন্ন জাতি, উপজাতি হাজার বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস, জীবনধারণ, রীতি-নীতি ও সংস্কৃতির বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু হাজার বছরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে উপেক্ষা করে ১৯৪৭ সালে সম্পূর্ণ উদ্ভট অবাস্তব তত্ত্ব, হিন্দু আর মুসলমান একসঙ্গে এক রাষ্ট্রে বসবাস করতে পারবে না মর্মে রাজনৈতিক ধোয়া তুলে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে দেশকে ভাগ করায় অবর্ণনীয় রক্তক্ষরণ ঘটল। সেই রক্তক্ষরণ আজও চলছে। কিন্তু ধর্মীয় উগ্রবাদীরা থামছে না। ভারতে এখনো প্রায় ১৮ কোটি মুসলমানের বসবাস প্রমাণ করে ওই দ্বিজাতিতত্ত্ব কত বড় অবাস্তব ছিল। এই তত্ত্বের অবাস্তবতার আরো বড় প্রমাণ ১৯৭১ সাল। পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করল, যার শতকরা ৯৫ ভাগ ছিল মুসলমান। তাই পূর্ব পাকিস্তানের মৃত্যু হলো, জন্ম নিল স্বাধীন বাংলাদেশ।

ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এখন তিনটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই কঠিন বাস্তবতা সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে, ইতিহাসকে রোলব্যাক করা যাবে না। তিনটি দেশ যদি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বেলায় সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও ধর্মীয় উগ্রবাদ পরিহার করতে পারত, তাহলে বিগত দিনের তিক্ততার সমন্বয় সাধনপূর্বক এই উপমহাদেশ হতে পারত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভাইব্র্যান্ট অর্থনৈতিক সহযোগিতার ব্লক। কিন্তু পাকিস্তানের প্রচণ্ড অনড় সামরিক ও মোল্লাতন্ত্রের প্রভাবে তা হওয়ার নয়। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আছে ভারত ও বাংলাদেশ, তার সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক আর মোল্লাতন্ত্রের সমন্বয় অসম্ভব। এটাও এক কঠিন বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি আদর্শগত, যার সুদৃঢ় উল্লেখ ছিল দুই মহান নেতা বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় স্বাক্ষরিত সেই অভূতপূর্ব মৈত্রী ও শান্তিচুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদ। তাতে বলা হয়, নিজ নিজ দেশের জনগণ যে আদর্শের জন্য একযোগে সংগ্রাম এবং স্বার্থ ত্যাগ করেছেন, সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উভয় দেশ ও জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও মৈত্রী বজায় থাকবে। মানবসভ্যতার কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস প্রমাণ করে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান এমন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কখনো যুদ্ধ-সংঘাত সংঘটিত হয়নি। আদর্শের জায়গায় বাংলাদেশ ও ভারত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভিন্ন, যদিও দীর্ঘ একটা সময় ধরে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। আদর্শ তো আছে, তার সঙ্গে আরো কিছু অবিচ্ছেদ্য জায়গা রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো অঞ্চলের দুই রাষ্ট্রের মধ্যে নেই।

বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, চালচলন, খাওয়াদাওয়া, আচার-অনুষ্ঠান, দৈনন্দিন অভ্যাস ইত্যাদি ভারতের প্রায় ১০ কোটি মানুষের সঙ্গে এতটাই অভিন্ন যে সেটাকে আলাদা করা একেবারেই অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক লিগ্যাসির বন্ধন, সেই বৈদিক-উত্তর খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মহাজনপদের আমল থেকে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, সুলতানি, মোগল ব্রিটিশের শেষ অবধি প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে কোনো দেশই এগোতে পারবে না। প্রাচীন যুগে প্রসদ্ধি ছয়টি ভারতীয় দর্শনের মধ্যে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে কানাডা ও কাপিলা কর্তৃক রচিত যথাক্রমে ভৈশ্বেশিক (Vaisheshik) এবং সামখিয়া (Samkhya) দর্শনে সর্বজনীন মানবমুক্তির যে পথ দেখানো হয়েছে তাতে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতের কোনো উল্লেখ নেই। তৃতীয়ত, ভৌগোলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার ও উপেক্ষা করার কি কোনো উপায় আছে। এখন চলছে ব্যবসা-বাণিজ্যের যুগ। ভারতের ১৩০ কোটি মানুষের বাজার তার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ সমৃদ্ধকরণ করতে পারলে আগামী দিনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশের পক্ষে যত সহজে ও স্বল্প খরচে যত বেশি সুবিধা পাওয়া সম্ভব তা কি অন্য কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশের পাওয়া সম্ভব। বিপরীতে স্ট্র্যাটেজিক্যালি ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের উন্নতি সমৃদ্ধির চাহিদায় ভারতের জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা ছাড়া তা কি সম্ভব। সম্ভব যে নয়, তা বিগত দিনে একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতায় আরোহণে মেকিয়াভেলি কৌটিল্য প্রদর্শিত বাঁকাপথের প্রয়োগ হয়তো আরেকটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা। তবে তা যেন সীমালঙ্ঘন না করে, সে সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ভোটের বাক্স ভরার জন্য ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়ানো হবে উভয় দেশের জন্য আত্মহত্যার সমান।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে উভয় দেশের জন্যই ধর্মীয় উগ্রবাদ সবচেয়ে বড় হুমকি। এত সময়ে ওপরে যেসব অবিচ্ছেদ্যতা ও অভিন্নতার কথা উল্লেখ করলাম তা ছিন্ন বা উপেক্ষা করে ভারত-বাংলাদেশের জন্য এককভাবে কি উন্নতি-সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। বিষয়গুলো প্রশ্ন আকারে উত্থাপন করলাম। কারণ ধর্মান্ধতায় পূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যাঁরা আজও আচ্ছন্ন হয়ে আছেন, তাঁরা যেন সঠিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারেন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধর্মীয় তত্ত্বের প্রাধান্য থাকলে অভিন্নতা রক্ষা করা কঠিন হবে। বিগত ১২ বছর ধরে উভয় রাষ্ট্র কর্তৃক এই অভিন্নতা রক্ষার যে প্রচেষ্টা চলছে তার সুফলটার ওপর একটু নজর বোলাই। ২০২০ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় এসে এক অনুষ্ঠানে বলেন, একেবারে একান্ত ভারতের জাতীয় স্বার্থে সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রয়োজন। একেবারে সঠিক কথাই তিনি বলেছেন। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে টেকসই করার পূর্বশর্ত হলো পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশের নৌ, স্থল ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে ভারত ও তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা মানেই বাংলাদেশের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবহারের মাসুল প্রাপ্তিসহ সেটি বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে। এর সঙ্গে ভুটান ও নেপাল যুক্ত হলে বাংলাদেশ আরো অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারত থেকে আসছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির জন্য বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৬৫ সালের আগ পর্যন্ত চালু ছিল এমন ছয়টি রেল যোগাযোগ ২০২১ সালের মধ্যে আবার চালু হয়ে যাবে। আসাম থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আসবে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ মানুষ ভারতে যায়। তাতে ভারতের চিকিৎসা খাতের নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ সহজে কম খরচে প্রত্যাশিত উন্নতমানের চিকিৎসা পাচ্ছে। ব্যাপক মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ যখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে, তখন দুই দেশের মানুষই হবে সম্পর্ক রক্ষার বড় অনুঘটক। এই পথেই দীর্ঘ মেয়াদে দুই দেশের অভিন্ন এবং অবিচ্ছেদ্য হয়ে যাবে।

গত ১২ বছরে ছিটমহল বিনিময়সহ স্থল ও সমুদ্র সীমানার মতো কঠিন ও দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকা সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। বর্তমান এই সময়ে পৃথিবীর সব অঞ্চলে যখন স্থল ও সমুদ্র সীমানার দ্বন্দ্ব মীমাংসা তো নয়ই, বরং সংঘাত-সংঘর্ষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেখানে ভারত-বাংলাদেশ সেটি অনায়াসে মিটিয়ে ফেলছে। এ জন্যই আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বলা হচ্ছে, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক কত উত্তম হতে পারে তার উদাহরণ এখন বাংলাদেশ ও ভারত। কিন্তু এখনো অনেক পথ সামনে। সবচেয়ে জটিল অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা। ৫৪টি কমন নদী বিশাল বিস্তৃত ইস্যু। তা ছাড়া এই নদীর অনেকগুলোর উৎস চীন, নেপাল ও ভুটান। সুতরাং শুধু ভারত-বাংলাদেশের পক্ষে পরিপূর্ণ পানি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে মৌলিক কথা হলো, এটা না হলে ওটা হবে না, এ রকম শর্ত দিয়ে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া যায় না। একসঙ্গে চলার পথে কোনো একটা সময়ে একটা নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান বের করা কঠিন হতে পারে। সেটিকে আপাতত পাশে রেখে অন্যান্য সহযোগিতার বহুবিধ যে জায়গাগুলো রয়েছে, সেগুলোকে সম্প্রসারিত এবং এগিয়ে নিতে পারলে একটা সময়ে এসে দেখা যাবে এর আগে যেটিকে পাশে রাখা হয়েছে তার সমাধানের পথও উন্মোচিত হয়ে গেছে। মোটকথা সম্পর্কটাকে বহমান রাখা অপরিহার্য। এই অপরিহার্যতার উপলব্ধিতে গত ৪ মার্চ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঝানু কূটনীতিক ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর ঢাকা সফর করে গেলেন। আমাদের স্বাধীনতা ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী এবং মুজিববর্ষ পালন উপলক্ষে ২৬ মার্চ ঢাকায় আসবেন ভারতের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উভয় দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে অবিচ্ছেদ্য অভিন্ন সম্পর্ক নিয়ে দুই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি কথা বলবেন। তাতে দুই দেশের উন্নতি সমৃদ্ধির ঐক্যবদ্ধ যাত্রার পথ আরো সমুজ্জ্বল হবে, এটাই প্রত্যাশা করি।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares