পশ্চিমবঙ্গ দিদিরই

Published: 4 May 2021, 7:30 AM
সৌমিক সাহা

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন নামের ‘খেলা শেষ’ হলো রবিবার।  ক্রিকেটীয় ভাষায় খেলার ফল- মমতা বন্দোপাধ্যায়ের  ‘ডাবল সেঞ্চুরি’… নরেন্দ্র মোদী ‘ক্লিন বোল্ড’। নির্বাচনের ফল পরিষ্কার হতেই ডিজিটাল দুনিয়ায় শুরু হয়ে যায় মিম-এর চালাচালি।

আর পাঁচটা সামাজিক অথবা রাজনৈতিক সময়ের কৌতুকের থেকে এইবারের ডিজিটাল কৌতুকে নতুন সংযোজন, বাংলা অথবা বাঙালি গরিমা। কোন মিম-এ পশ্চিম বাংলা-কে তুলনা করা হয় ‘এস্টেরিক্স ও ওবেলিস্ক’ কমিক্স-এর ‘গৌল’ প্রদেশের সঙ্গে, যা রোমান-দের কব্জার বাইরে, আবার কোনও মিম-এ মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিজয়ী আষ্ফালন- বাংলাই পারে।

তবে ফোনে ফোনে ছড়িয়ে পড়া একটি ফরোয়ার্ড সবথেকে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে আমার । ১৮৯৭ সালে, লন্ডন-এর উদ্দেশ্যে পাঠানো ভাইসরয় এলগিন-এর একটি রিপোর্টের অংশ: “বাঙালিরা অদ্ভুত এক জাতি। এরা প্রায়শই আমরা যা বলি তা বিশ্বাস করে না। এরা মুক্ত চিন্তা করতে সক্ষম, এবং নিজেদের জ্ঞানের মাদ্ধমে সুস্পষ্ট মতামত বহন করে। অত্যন্ত প্রগতিশীল এই জাতি। এই সমস্যা আমরা ভারতবর্ষের অন্য কোথাও সম্মুখীন হয়নি।” এই ফরওয়ার্ড-এর ঐতিহাসিক ভিত্তির চেয়েও যেটা বেশি অনুধাবন করা প্রয়োজন, তা হলো এই গরিমার আষ্ফালন ও তার কারণ।

ভারতবর্ষে ধর্মের নামে ভোট চাওয়া নতুন কোনো বিষয় না হলেও, পশ্চিমবঙ্গে এই প্রবণতা ২০১৬এ আমদানি হয়, এবং বলাই বাহুল্য উগ্রতা পায় ২০১৯এর নির্বাচন থেকে।  প্রচার মঞ্চ থেকে, দলীয় মিছিল- বিজেপি-র ‘জয় শ্রী রাম’-এর পাল্টা উঠে আসে মা দূর্গা অথবা মা কালীর মন্ত্রোচ্চারণ। তার বিরুদ্ধে ওঠা মুসলমান তোষণের  অভিযোগ বার বার খণ্ডন করলেও, কয়েক বছর আগে মুসলমান ভোটার-দের ‘দুধ দেওয়া গরুই ‘ বলে বসেন মমতা বন্দোপাধ্যায়।

পশ্চিমবঙ্গএ  যেমন ঘটা করে রাম নবমী পালন হতে দেখা যায় গত পাঁচ অথবা ছয় বছরে, তেমন রাম নবমীর ‘পাল্টা’ হনুমান জয়ন্তীর আয়োজন ও করা হয় তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। হিন্দুত্বের দৌড়ে মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং অমিত শাহ-রা সবাই সমান তালে শামিল হন। অতএব সদ্য শেষ হওয়া ‘খেলাতেও’ যে ধর্ম এক রেফারীর কাজ করে তা বলাই বাহুল্য। এই নির্বাচনে তার সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক বিভাজন- বাঙালি এবং অবাঙালি।

এই ঘটনা সর্বজনবিদিত যে, আরও পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন থাকলেও বিজেপি-র সর্বভারতীয় নেতৃত্বের কাছে ‘পাখির চোখ’ ছিল পশ্চিমবঙ্গই। আর সেই কারণেই, নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি-র কোনো হেভিওয়েট নেতাই বাদ যাননি হেলিকোপটার-এ উড়ে আসতে এই বঙ্গভূমিতে।  প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ১৭টির ওপর নির্বাচনী সভা করেন পশ্চিমবঙ্গে। অমিত শাহর  নির্বাচনী মিটিং মিছিল ও  সভার সংখ্যা প্রায় ৬২। কিন্তু এই হেভিওয়েট প্রচারের ফল যে ‘পর্বতের মুশিক প্রসব’-এর শামিল তা নির্বাচনী ফলেই স্পষ্ট। বিজেপি-র পাওনা খাতে, পশ্চিমবঙ্গে নিরঙ্কুশ বিরোধীর আসন যা এতদিন ভাগাভাগি করে নিতে হতো বাম এবং কংগ্রেস-এর সঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা কি তাহলে বিজেপি-কে ভোট দায়ে নি? দিয়েছে, কিন্তু তাতে বিভাজনের ছবি স্পষ্ট- এই বিভাজন জাতিগত, ভাষাগত। হিন্দিভাষী সর্বভারতীয় নেতাদের আশ্বাস আষ্ফালন যে বাঙালি ভোটার-এর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, তা নির্বাচনী ফলাফলেই স্পষ্ট। হিন্দিভাষী ভোটার বিজেপি-কে বিরোধীদের আসন অবধিই পৌঁছে দিতে পেরেছে, তার বেশি নয়।

এখানেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচার এর সাফল্য, “বাংলা তার মেয়েকেই চায়”। মমতা বন্দোপাধ্যায়-এর সহযোদ্ধারা সাফল্যের সঙ্গে বিজেপি-কে ‘বহিরাগত’ প্রমান করতে পেরেছে, এবং বলাই বাহুল্য তাতে তাদের সাহায্য করেছে বিজেপি-র হিন্দিভাষী নেতাদের বিকৃত বাংলা উচ্চারণ এবং বাংলা এবং বাঙালির সংকৃতি ও কৃষ্টি সম্বন্ধে অনভিজ্ঞতা।

নরেন্দ্র মোদী সহ বিজেপি-র অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আর একটি কাজে ডাহা ফেল- পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটার -এর মন জয় করতে যে তারা পারেননি শুধু তাই নয়, দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখে মমতা বন্দোপাধ্যায় সম্বন্ধে তির্যক ব্যাঙ্গও তাদের বিরাগভাজন করেছে। নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দোপাধ্যায়-এর ওপর আক্রমণ ও তার পরবর্তীকালে, তৃণমূল নেত্রীর প্লাস্টারমোড়া পা অচিরেই নির্বাচনের ‘খেলা হবে’ পোস্টারএ এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজ সাথির মতো মহিলা কেন্দ্রিক প্রকল্প তো ছিলই, স্বাস্থ্য-সাথী প্রকল্পের কার্ড বাড়ির মহিলাদের নামে বিলি করাও মমতা বন্দোপাধ্যায়-এর একটি মাস্টার স্ট্রোক। নির্বাচনী প্রচারেও তার মুখে বার বার উঠে এসেছে নারীশক্তির কথা।

পশ্চিম বাংলার মহিলাদের কাছে শক্তি ভিক্ষা করে তৃণমূলনেত্রী শুধু যে তাদের মন জয় করেছেন তাই না, মহিলা ভোটারদের মধ্যে শক্তিও সঞ্চার করেন যা সরাসরি তাকে ফল দিয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনএ। অতএব, নির্বাচন পরবর্তী মিম-এ মমতা বন্দোপাধ্যায়-এর কাল্পনিক মহিলা ফুটবল টীম-এর ছবি এই নির্বাচনের প্রতিকৃত হয়েই উঠতে পারে।
‘খেলা শেষ’। বলাই বাহুল্য যে এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ তার তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ পরিচিতি এবং কৃষ্টি বজায় রাখতে সফল। কিন্তু তাতেই কি পশ্চিমবঙ্গবাসীর স্বস্তি পাওয়ার কথা? এই নির্বাচনের ফল পশ্চিমবঙ্গের  গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে পারবে তো? বছর ঘুরলে পঞ্চায়েত কিংবা কর্পোরেশন নির্বাচনে আবার মৃত্যুর মিছিলের সাক্ষী হতে হবে না তো পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে?

যে মহিলাদের কাছ থেকে মমতা বন্দোপাধ্যায় এই ‘খেলায়’ তাদের একটা করে পা চেয়ে নিয়েছিলেন, সেই সব মহিলাদের কারো স্বামী, কারো সন্তান, কারো ভাই এই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের বলি হবে না তো ভবিষতে? প্রশ্নগুলো প্রয়োজনীয়, কারণ আজ পশ্চমবাংলা অথবা বাঙালির জয় বলে যারা উচ্ছসিত হচ্ছেন, তাদের অনেকেই এর আগের বহু নির্বাচনে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু প্রয়োগ করতে অপারগ হয়েছিলেন।

যে মৃত্যুর মিছিল পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা ভারতবর্ষ দেখছে, কোনো নির্বাচনের জয়ই কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলির ঘাড় থেকে তার দায় স্খালন করতে পারে না। নির্বাচনী প্রচার সব রাজনৈতিক দোল করেছে। মিছিলে মিটিং-এ ভিড় করানোর জন্য সব দলের ক্যাডাররা ঝাঁপিয়েছে। নির্বাচনী মিটিং এ করোনা নিয়ে দু একটি শুকনো সতর্কবার্তা ছাড়া কোনো নেতা নেত্রীরই তা সামাল দেওয়ার বিশেষ উদ্যোগ চোখে পরেনি।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন শেষ হতেই যে আংশিক লোকডাউন শুরু হলো, তা কি আগে করা যেত না? উত্তরটা সহজ, না যেত না, কারণ তাতে সবারই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুন্ন হতো। মমতা বন্দোপাধ্যায় কিংবা নরেন্দ্র মোদী অজুহাত দিতেই পারেন যে নির্বাচনের সময় কমিশনই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, কিন্তু রাজনৈতিক দোল হিসেবে তারা কি নির্বাচন স্থগিত করার কথা ভেবেছিলেন? না, ভাবেন নি। রাজ্যে যখন দৈনিক মৃত্যু প্রায় একশো ছুঁয়েছে তখনও রাজনৈতিক হিংসা হানাহানি চলেছে, কেও বাধা দায়নি।

‘খেলা শেষ’, কিন্তু মৃত্যু মিছিলের শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ‘খেলা শেষ’, কিন্তু অক্সিজেন এর ঘাটতি কিছুতেই মিটছে না। ‘খেলা শেষ’ কিন্তু ভেন্টিলেটর বেড এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। ‘খেলা শেষ’, কিন্তু একটা হাসপাতাল বেড অথবা অক্সিজেন এর আকুতি নিয়ে ফোন থামছে না। ‘খেলা শেষ’, কিন্তু এখনো এই প্রশ্নের জবাব মিলছে না যে গত এক বছরে আমরা দেশ হিসেবে কেন প্রস্তুত ছিলাম না কোরোনার দ্বিতীয ঢেউ সামলানোর জন্য? ‘খেলা শেষ’ কিন্তু কিছুতেই উত্তর মিলছে না, জানুয়ারী মাসের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের অস্থায়ী করোনা শেল্টারগুলো কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো?

মমতা বন্দোপাধ্যায়, আপনি হ্যাটট্রিক করেছেন শুধু না, ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রীষ্ঠান, ধর্মনির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আপনাকে ভোট দিয়েছে। এবার আপনার পালা সেই আশীর্বাদ ফিরিয়ে দেওয়ার। এবার আর একটা খেলা শুরু হোক- মানুষকে বাঁচানোর খেলা। এবার কোরোনার বিরুদ্ধে একটা ‘খেলা হবে’ পোস্টার পড়ুক পশ্চিমবঙ্গের দেওয়ালে দেওয়ালে।

শেষ কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশ্যে- পশ্চিমবঙ্গ আপনাকে খালি হাতে ফিরিয়েছে। গণতন্ত্রে কারো না কারো খালি হাতে ফেরারই কথা, এই খেলায় আপনি ফিরেছেন। ‘খেলা হবে’ চ্যালেঞ্জ আপনি গ্রহণ করেছিলেন, আপনি হেরেছেন, কিন্তু তাতে গণতন্ত্রের যেন হার না হয়- ইতিহাস নজর রাখবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যেন পর্যাপ্ত অক্সিজেন আর ভ্যাকসিন সময়মতো পায়ে সেটা দেখা আপনার ‘রাজ্ ধর্ম’, দয়া করে তার পালন করবেন।

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দোপাধ্যায়, দুজনেই অঙ্গীকার করেছিলেন যে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকাবেন।  একজন পেরেছেন, একজন পারেননি। কিন্তু অসহায় ভারতবাসী এবার কোরোনার বিরুদ্ধে আপনাদের ডাবল সেঞ্চুরি দেখতে চায়। এই খেলায় গোটা দেশ আপনাদের পাশে, আপনাদের দিকে তাকিয়ে- ‘খেলা হবে’।

  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares