আফগানিস্তানে ২.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার কোথায় খরচ হলো? কারা পেলো?

Published: 16 September 2021, 8:44 AM

।।ড. মাহফুজ পারভেজ।।

আফগানিস্তানে আমেরিকার ২.২৬ ট্রিলিয়ন খরচের বিরাট অংশই খোদ আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর পকেটে গিয়েছে। তালেবান শাসিত কাবুল থেকে আমেরিকানদের প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সেখানে বিপুল অংকের টাকা খরচের প্রসঙ্গে প্রচুর আলোচনা হলেও সে টাকা আসলে কোথায় গেল, সে সম্পর্কে কথাবার্তা হয়েছে কমই। GRAVITAS নামের একটি অনুসন্ধানী টিভি চ্যানেলের ‘ফলো দ্য মানি’ প্রতিবেদনে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। খুঁজে বের করার চেষ্টা হয়েছে, এই বিপুল অর্থের লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘কে কালপ্রিট’।

এই মিডিয়া রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল, স্টক মার্কেট কেলেংকারী, যুদ্ধের খরচ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আর্থিক দুর্নীতি উন্মোচন করে থাকে তাদের ‘ফলো দ্য মানি’ প্রতিবেদনে। আফগানিস্তান স্পটে যুদ্ধ বাবদ যে বিপুল খরচের বহর আমেরিকান প্রশাসন দিয়েছেন, তার ময়নাতদন্ত করেও এই সংবাদমাধ্যম পেয়েছে আশ্চর্যজনক তথ্য।

আফগানিস্তানে সর্বমোট ২.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার খরচের ভিত্তিতে আমেরিকানরা প্রতিদিন সেখানে ব্যয় করেছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। যে টাকা এসেছে আমেরিকান করদাতাদের কাছ থেকে। বৈশ্বিক মহামারি করোনার ভয়াবহ ছোবলে বিশ্বের শীর্ষ আক্রান্ত দেশ আমেরিকা নিজের দেশের সব নাগরিককে ভ্যাকসিন দিতে না পারলেও আফগানিস্তানে যুদ্ধের জন্য খরচ করেছে অকাতরে।

এতো টাকা খরচের পরও আমেরিকা লজ্জাজনক ফলাফল নিয়ে ফিরে আসে আফগানিস্তান থেকে। তাহলে এতো টাকা কোথায় গেলো? কে নিলো?

নিশ্চিতভাবে আফগানিস্তানের জনগণ সে টাকার ভাগ পান নি। কারণ, দেশটির শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ এখনও দিনে ২ ডলারের কম অর্থ দিয়ে জীবন-যাপন করেন। প্রকৃত ঘটনা হলো, বিরাট খরচের ‘মোস্ট অব মানি’ আমেরিকানদের হাতেই ফিরে এসেছে। কিভাবে? ডিফেন্স কোম্পানি ও কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে। কারণ, আফগানিস্তানের যুদ্ধ ও পরিকাঠামোর সবকিছুই আমেরিকানরা করেছে ‘আউট সোর্সিং’-এর মাধ্যমে, তাতে আমেরিকান কোম্পানিগুলোই ছিল সর্বেসর্বা। তারাই অস্ত্র, সরবরাহ করেছে, যানবাহন দিয়েছে, গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে, বিমান দিয়েছে, আফগান সৈন্যদের প্রশিক্ষণ করিয়েছে। আর এসব মোটেও বিনামূল্যে করে নি।

আফগানিস্তানে আমেরিকার বিপুল খরচকে তুলনা করা যায় ‘রিভলভিং ডোর’-এর সঙ্গে। একহাতে আমেরিকার সরকার টাকা দিয়েছে আর সেটা ফিরে গেছে আমেরিকার কয়েকটি কোম্পানির কাছে। তারাই সব খরচ করছে আমেরিকার নামে। তবে অবশ্যই বাণিজ্যিক মনোভাবে ও মুনাফার লক্ষ্যে।

এমন পাঁচটি আমেরিকান কোম্পানি হলো লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরোপ গ্রুম্ম্যান, রেথিওন ও জেনারেল ডায়নামিকস, যারা ২০০১ থেকে ২০২১ সময়কালে ২.০২ ট্রিলিয়ন টাকা নিয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ায় পরিচালিত আমেরিকার হয়ে যুদ্ধের জন্য। সেসব যুদ্ধে প্রচুর আমেরিকান সৈন্য মারা গেছেন এবং আমেরিকান দৃশ্যমান জয়লাভ না করে বরং এক ধরনের পরাজয় বরণ করেছে। কিন্তু আমেরিকান কোম্পানিগুলো ঠিকই লাভবান হয়েছে।

২০০১ সালের ৯/১১ তথা সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখের পর প্রেসিডেন্ট বুশ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করলে সেদেশে ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি, অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো হয়। আমেরিকার স্টক মার্কেটে এসব কোম্পানির লেনদেন ও মূলধন গত কুড়ি বছরে হাজার গুণ বৃদ্ধি পায়। আমেরিকান প্রশাসন, রাজনীতিবিদ ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট এসব অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে অভাবণীয় লাভ করে। আমেরিকার ‘অ্যান্ডলেস’ যুদ্ধে ‘অ্যান্ডলেস’ মুনাফা হয় এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের।

উইকিলিংকের জুলিয়াস অ্যাসেঞ্জ বার বার এসব বিষয়ে বলেছেন। কোনও জবাবদিহিতা, স্কুটিনি ও পূর্বধারণা ছাড়াই স্রোতের মতো টাকা খরচের ফলে আমেরিকা ও আফগানিস্তানের কোনও লাভ হচ্ছেনা, মুনাফা যাচ্ছে অস্ত্র বিক্রেতা কোম্পানিগুলো পকেটে, এসব তখন যুদ্ধের উন্মাদনায় কেউ শোনেন নি। যে আফগানিস্তানে মাত্র ২% বনাঞ্চল, সেখানে মিলিয়ন ডলার খরচ করে আফগান সরকারি বাহিনীকে ‘জঙ্গল অ্যামবুশ’ ইউনিফরম দেওয়ার বিষয়েও কেউ প্রশ্ন করেন নি।

শুধু সামরিক খাত নয়, জাতি গঠন ও পরিকাঠামো নির্মাণেও বিরাট নয়ছয় হয়েছে। ৫০ বিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে গেছে, যার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ইত্যাদি খাতের অঢেল টাকা কোনও পরিবীক্ষণ ও অডিট ছাড়াই ঢেলে দিয়েছেন আমেরিকার রাজনীতিবিদগণ, হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের কর্তাগণ, যা সরাসরি চলে গেছে তাদের পছন্দের কোম্পানিগুলোর কাছে।

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ পরিচালনার সময়ই প্রেসিডেন্ট বুশ বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে সামরিক তৎপরতা পরিচালনার আইনগত কাঠামো তৈরি করেন। আর তখনই বিভিন্ন কোম্পানি রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যারা হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগনের সঙ্গে মিলে যাবতীয় কার্যক্রম চালায় এবং বিপুল আর্থিক লেনদেন করে কোনও প্রশ্ন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই। ফলে এতো বিপুল বাজেটের আমেরিকান ‘প্রজেক্ট আফগানিস্তান’ ব্যর্থ হলেও এবং আফগান জনতা অনাহার, দারিদ্র্যের মধ্যে রক্তাক্ত ও উদ্বাস্তু হলেও যুদ্ধের ময়দান থেকে আমেরিকান কোম্পানিগুলো ঠিকই লাভবান হয়েছে।

আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায়ী ও যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো স্ফীতি লক্ষ্য করলেও তাদের বেশুমার লাভের বিষয়ে আঁচ করা যায়। উল্লেখ্য, বিশ্বের বৃহত্তম ২৫টি কোম্পানি ৩৬১ বিলিয়ন বা ৩৬ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সেবা বিক্রি করেছে, যার অধিকাংশই আমেরিকান, যা বাংলাদেশের ৩০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমান। প্রসঙ্গত, প্রতিবছরই বিশ্বে কমপক্ষে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ হারে অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) নিয়মিতভাবে এ সংক্রান্ত আপডেট প্রকাশ করে থাকে।

সিপ্রির আর্মস ইন্ডাস্ট্রি ডেটাবেইস অনুযায়ী ভৌগোলিকভাবে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্ত্র ও সামরিক সেবা বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে বৈচিত্র্যের মধ্যেও আমেরিকানদের প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব সুস্পষ্ট। বৈশ্বিক অস্ত্রের বাজারে আমেরিকার কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে এবং বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ অস্ত্র কোম্পানিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কোম্পানিগুলো হচ্ছে লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরোপ গ্রুম্ম্যান, রেথিওন ও জেনারেল ডায়নামিকস। এই পাঁচ কোম্পানি গত বছর (২০২০) অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে ১৬৬ বিলিয়ন বা ১৬ হাজার ৬০০ ডলার, যা মোট অস্ত্র বিক্রির প্রায় ৪৬ শতাংশ। গত কুড়ি বছরে আফগানিস্তানে ২.২৬ ট্রিলিয়ন খরচের ক্ষেত্রেও সামনের কাতারে রয়েছে এসব আমেরিকান অস্ত্র বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান।

আফগানিস্তানে আমেরিকান ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ প্রসঙ্গে নামজাদা ব্রাউন ইউনিভার্সিটির আরেক রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, কিভাবে আমেরিকা ২০ বছরের যুদ্ধে কমপক্ষে দুই লাখ কোটি ডলার খরচের খাত থেকে বেরিয়ে এসেছে সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রজেক্ট থেকে প্রকাশিত রিপোর্টে এসব তথ্য দেয়া হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থ যুবক, অতি ধনী কিছু মানুষের ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করতে সহায়ক হয়েছে। এসব আফগান আমেরিকান সেনাদের দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন। আর বিনিময়ে হয়ে গেছেন মিলিয়নিয়ার। এই কন্ট্রাক্টে যারা যুক্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ব্যাপক হারে দুর্নীতি জেগে উঠেছিল। আর তা পুরো আফগানিস্তানকে গ্রাস করে। ভেঙ্গে পড়ে এর ভঙ্গুর গণতন্ত্র।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির এই রিপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সিএনবিসি জানায়, আফগানিস্তান পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে এসব প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এত বেশি অর্থ পুনর্গঠনের নামে খরচ করা হলেও প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানী তালেবানদের দখল করতে সময় লেগেছে মাত্র নয়দিন। তারা সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। উৎখাত করেছে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকারকে।

পেন্টাগন ওয়াচডগ হিসেবে পরিচিত সিগার-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তানে দু’বারে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী রায়ান ক্রুকার ৯/১১ পরবর্তী দুর্নীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, আপনি জানেন যে, ব্যর্থতা ছিল আমাদের প্রচেষ্টায়। বিদ্রোহীদের জন্য আমাদের ব্যর্থতা নয়। এটা ছিল সীমাহীন এক দুর্নীতি। সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বিশ্বাস করেন, আফগানিস্তানে যে ভয়াবহ দুর্নীতি তার অনেকটার জন্য দায় যুক্তরাষ্ট্রকেও বহন করতে হবে।

তবে এতো কিছুর পরেও বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায় মন্দা আসার কোনও সম্ভাবনা নেই৷ এদিকে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা হাজির হয়ে শান্তির কথা বলেন৷ অস্ত্র নয়, মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার কথা বলেন৷ কিন্তু তাঁদের কথায় এবং কাজে যে বিস্তর ফারাক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট তা চোখে আঙুল দেখিয়ে দেয়৷ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এ ভাবে অস্ত্র ব্যবসা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় অশান্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না এবং বিশ্বশান্তির বিষয়টি উপেক্ষিত থাকার ইস্যুটিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •