মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমাদের সতর্ক হতে হবে

Published: 18 November 2021, 3:15 PM

।। আবু আহমেদ ।।

কভিড-উত্তর আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি একটি যন্ত্রণাদায়ক বিষয়। সামনের দিনগুলোতে তা আরো বাড়তে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। দেশে ব্যবহৃত শিল্পপণ্যের বিরাট একটা অংশ দেশের বাইরে থেকে আসে। বিশ্ববাজারে এসবের দাম বাড়তির দিকে। বাংলাদেশ যেসব খাদ্যশস্য আমদানি করে, সেগুলোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় দেশগুলোতেও অনেকটা তাই। পেট্রোলিয়ামের দাম বিশ্ববাজারে গত সাত-আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং সামনে আরো বাড়তে পারে। বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে। এর ফলে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতিতে যোগ হবে।

kalerkanthoমূল্যস্ফীতি আমরা যেভাবে পরিমাপ করি, এর সবই কন্ট্রিবিউটরি ফ্যাক্টর (প্রভাবক উপাদান)। এটা কৃষিতে হোক, শিল্পে কিংবা পরিবহনে হোক। ২০ থেকে ৩০ বছর আগে মূল্যস্ফীতি বৈশ্বিকভাবে হতো না, স্থানীয়ভাবে হতো। প্রকৃতপক্ষে গত দুই দশক ধরে বিশ্বের অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক ছিল। এটা কারো কারো জন্য সমস্যা হয়তো ছিল। কিন্তু স্বস্তিদায়ক ছিল এই অর্থে যে অন্তত জীবনযাত্রার মানের ওপর আঘাত হানত না। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এমন একটা বিষয়, যা প্রত্যেকের জীবনযাত্রার মানের ওপর আঘাত হানে। ধনীরা ততটা সমস্যায় না পড়লেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরা সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটাকে আমরা এক ধরনের রিগ্রেসিভ ট্যাক্স (ধনী-গরিব সবার ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য মাসুল) বলি। মানে কোনো সুবিধা না দিয়ে সবাইকে সমানভাবে দণ্ড দেওয়া। কিন্তু চূড়ান্তভাবে এর অভিঘাতটা দরিদ্রদের ওপরই বেশি পড়ে। যাদের আয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ খাবারের পেছনে ব্যয় হয়, তাদের ওপরই আঘাতটা বেশি পড়ে। এটা সব দেশেই প্রযোজ্য।

মূল্যস্ফীতি এখন বৈশ্বিক প্রপঞ্চ হয়ে দাঁড়াচ্ছে—এটাই শঙ্কার বিষয়। বাংলাদেশ গত দুই দশক সাফল্যের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। এর হার ৫ বা সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। এখন আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে, এটা সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটা কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা নির্ভর করছে আমরা কিভাবে মূল্যস্ফীতিকে পরিমাপ করছি এবং কাদের জন্য করছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন আয়ের লোকদের জন্য মূল্যস্ফীতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তাদের ব্যয়টা হচ্ছে ওই সব দ্রব্যের ওপর, যেগুলোর দাম বেশি বাড়ছে। যেমন—ভোজ্য তেল ও চাল ইত্যাদি। এখন চালের বাজার অস্থির থাকার আশঙ্কা খুবই বেশি বাংলাদেশে। বাংলাদেশের খাদ্যের ৯০ শতাংশ চালনির্ভর। এখন আমরা যেহেতু চাল আমদানিকারক হয়ে গেছি, তাই আন্তর্জাতিকভাবে পণ্যটি অস্থির থাকতে পারে। এরই মধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, এমনকি ভারতও আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ায় চালের দাম বাড়িয়ে দেবে। স্বাভাবিকভাবেই সুযোগটা তারা নেবে।

এটি বাংলাদেশের জন্য এককভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের মতো একটি বিষয়। এ জন্য আমি সব সময় বলি যে অন্তত আমাদের গুদাম যেন ভরা থাকে। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় এটা বড় হাতিয়ার। আরেকটা ব্যাপার ঘটতে পারে, আমাদের টাকা মার্কিন ডলার, ইউরো বা বড় কারেন্সিগুলোর বিপরীতে আরো মূল্য হারাতে পারে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যখন বেশি হবে, তখন ‘পারচেজিং পাওয়ার অব কারেন্সি’ ধাক্কা খাবে। তখন ডলার কিনতে হবে বেশি টাকা দিয়ে অথবা পাউন্ড বা ইউরো কিনতে হবে বেশি টাকা দিয়ে। ফলে বিনিময় হারটা আমাদের বিরুদ্ধে যেতে পারে।

আরেকটা বিষয়, আমদানি খচর বাড়লে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিকে খুব খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের রিজার্ভের প্রধান ভূমিকা পালনকারী হচ্ছে দুটি। একটি রপ্তানি, অপরটি রেমিট্যান্স। কিন্তু রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। এর মধ্যে আমদানি খরচ বাড়ছে। ফলে ডলারের দাম বাড়ছে। আমাদের সুখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। গত কোয়ার্টারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে, সামনেও বাড়তে পারে। কিন্তু তার পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভের ওঠা-নামা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা খরচের ব্যাপারেও সাবধান হতে হবে।

এই কঠিন সময়ে ওই সব রাষ্ট্র সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম। সামনের সংকটের দিনগুলোতে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলো আরো বেকায়দায় পড়তে পারে। বাংলাদেশের একটা সুবিধা আছে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভটা স্বস্তিদায়ক। দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা যদি কমতির দিকে যায় বিশেষ করে আমদানি বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসার কারণে, তাহলে বিষয়টা আমাদের খুব সাবধানতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। কারণ এটা আমাদের পেমেন্ট ক্যাপাসিটি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সংকেত দেয়।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যেটা করতে পারে, সেটা হচ্ছে গরিব জনগণকে সরকারের সহায়তা দিয়ে যেতে হবে। কারণ কভিডের কারণে আরো ১৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় প্রবেশ করেছে। এখনো তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অর্থনীতি যদি আরো মজবুত ভিত্তির দিকে যায়, তাহলে হয়তো তারা কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তাই আমি মনে করি, বাংলাদেশকে আরো বেশ কিছুদিন দরিদ্র জনগণকে, বিশেষ করে খাদ্যপণ্য সহায়তা দিয়ে যেতে হবে। এটা কাজের বিনিময়ে খাদ্য হোক অথবা টিসিবির মাধ্যমে সরাসরি বিক্রি করে হোক। এই সহায়তা বাড়াতে হবে। সরকারকে এখানে ভর্তুকি দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, দরিদ্র লোকজনের আয় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায় মূল্যস্ফীতির কারণে। কারণ মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে প্রকৃত আয়টা হিসাব করতে হয়। দরিদ্র মানুষ যেহেতু আয়ের প্রায় সম্পূর্ণ অর্থটাই খাবারে ব্যয় করে, তাই তার প্রকৃত আয় অন্যদের তুলনায় অনেক কম।

বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করার বিষয়ে অর্থায়নের প্রশ্ন আসতে পারে। আমাদের আরেকটা সুবিধা হচ্ছে আমরা গত ১০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তেমন ঋণ করিনি। ঋণ কিছুটা করা হয়েছে, সেটা কনসেশনারি লোন, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে। কিন্তু এর বাইরে বাংলাদেশ অতটা ঋণ করেনি। এটা আমাদের প্লাস পয়েন্ট এখন বাংলাদেশ যদি তার অর্থনীতিকে ঠিকঠাক রাখতে চায়, তাহলে তাকে তার নিজের বেল্ট নিজেকে টাইট করতে হবে। সে জন্য ব্যয় কমানোর পথে অগ্রসর হতে হবে। আমি আগেও বলেছি, আমাদের যে এস্টাবলিশমেন্ট কস্ট বা সরকারি ব্যয় সবখানে কমাতে হবে। এর মাধ্যমে যে অর্থ বাঁচবে, তা গরিব জনগণকে সহায়তায় কাজে লাগানো যাবে। এ ছাড়া অর্থনীতি যদি ধীরগতিতে চলে, তাহলে ট্যাক্স কালেকশনও কমে যাবে। এখন উপায় হচ্ছে আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে, সাশ্রয়ী হতে হবে এবং সেটা সরকারকেই করতে হবে। তাই সরকারের কস্ট কাটিং প্রগ্রাম নেওয়া উচিত। একসময় খরচ কমানোর জন্য বাংলাদেশে সরকারি অফিসে এক কাপের বেশি চা দেওয়া হতো না। এমন উদাহরণ আমাদের আছে।

মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধে বাজার নিয়ন্ত্রণেরও দরকার আছে। এটা যেহেতু বেসরকারি খাতের বিষয়, তাই কাজটা সহজ নয়। এ জন্য সরকারকে তার হাতিয়ারগুলো কাজে লাগাতে হবে। যেমন—মনিটরিং বাড়াতে হবে। বাজারে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা ব্যাহত করে যারা সিন্ডিকেট ট্রেডিং করে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দফায় দফায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করার কিছু দেখি না। এটা বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো হাতিয়ার নয়। কারণ ব্যবসায়ীরা তাঁদের স্বার্থই দেখেন এবং তাঁরা তাঁদের পণ্যের দাম বাড়াতেই চাইবেন। সরকারের কাজ হলো বৈঠক নয়, তার হাতিয়ারগুলো কাজে লাগানো। যেমন—দেশে ভোজ্য তেলের অল্প কয়েকটি কম্পানি রয়েছে। এখানে প্রতিযোগিতার তেমন সুযোগ নেই। তারা সহজেই যোগসাজশ করে এবং কারসাজি করতে চাইলে করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের চালের বাজারে মোটামুটি প্রতিযোগিতা আছে, গমের বাজারেও আছে; কিন্তু ভোজ্য তেলের বাজারে নেই।

সরকারের আরেকটা কাজ হবে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিকে এগিয়ে নেওয়া। এটা একটা প্রমাণিত ভালো কর্মসূচি, যদি অপব্যয় না হয়, দুর্নীতি না হয়। সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে এখন নিচের দিকে, ওপরের দিকে দুর্নীতি বেড়ে গেছে। যে বরাদ্দই সরকার দিক না কেন, তা ঠিকমতো ব্যবহার হয় না।

মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে। রাস্তাঘাটে গরিব মানুষের সংখ্যা যদি বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কাদের জন্য উন্নয়ন, কিসের জন্য উন্নয়ন? যারা টাকা পাচার করে এমন কিছু বড় লোকের জন্য উন্নয়ন? এসব প্রশ্ন বড় করে সামনে আসবে। এ জন্য অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে উল্লিখিত কর্মসূচিগুলো ও উপায়গুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। সামনের দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিটা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল্যস্ফীতি এখন এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রবাহিত হয়। একটি বড় অর্থনীতিতে যদি মূল্যস্ফীতি হয়, এটা অন্যান্য দেশেও যাবে যাদের সঙ্গে তার লিংকেজ আছে। এটাই এখনকার প্রক্রিয়া। তাই এর চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবেলা করতে হবে, যেভাবে অতীতে করেছি। গত ২০ বছরে মূল্যস্ফীতি বড় ইস্যু ছিল না। কিন্তু এখন বড় ইস্যু হিসেবে দেখা দেওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নীতিনির্ধারকদের নজরদারি বাড়াতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share