ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার দায় সব পক্ষের

Published: 20 November 2021, 4:26 PM

।। এম হাফিজ উদ্দিন খান ।।

স্থানীয় সরকার কাঠামোর নিম্নস্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি অনেক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। ইতোমধ্যে দুই ধাপে ভোট গ্রহণের আগে-পরে ব্যাপক সহিংসতায় অর্ধশতের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে; আহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। পরবর্তী ধাপের নির্বাচন ঘিরেও আশঙ্কা বিরাজ করছে। ইতোপূর্বে অনেকবারই বলেছি, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচনের কারণেই আমাদের গ্রামীণ এই ভোটপর্বও সংঘাত-সহিংসতায় ম্লান হয়ে চলেছে। আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আদি রূপ ও সাম্প্রতিককালের রূপের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে এর অন্যতম কারণ আদর্শিকভাবে রাজনৈতিক অবক্ষয়। একই সঙ্গে নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা তো আছেই।

আমাদের পচনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যাপারে বিশ্নেষকরা অনেক কারণই তাদের পর্যালোচনায় তুলে ধরেছেন, ধরছেন। কিন্তু আমাদের যে রাজনীতির এত অর্জন এর বিসর্জন যে রাজনৈতিক হীনস্বার্থসিদ্ধির কারণে হয়েছে তাতে সন্ত্রাস ও কলুষমুক্ত ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশের ব্যাপারে নিরুদ্বিগ্ন থাকার উপায় খুঁজে পাওয়া যেন মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চাশ-ষাটের দশক তো বটেই এর পরও রাজনীতিতে যে আদর্শবাদ আমরা দেখেছি, তা যেন এখন শুধুই স্মৃতি। নির্বাচন ব্যবস্থা কলুষিত হয়ে পড়েছে। অথচ আমাদের দেশেই তো ভালো কিংবা দৃষ্টান্তযোগ্য নির্বাচনের উদাহরণ আছে যা দূর অতীতের বিষয় নয়। স্থানীয় সরকার কাঠামোর ইউপি চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হয়ে আসছে। যখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আমরা তখনই এর বিরোধিতা করেছিলাম। এই বিরোধিতার যৌক্তিকতা এখন বিদ্যমান পরিস্থিতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

ইউপি নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত-সহিংসতায় এত হতাহতের পরও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সরকারের দায়িত্বশীল কারও কারোর বক্তব্যে দায়িত্বহীনতারই সাক্ষ্য মিলেছে। বিস্ময়কর হলো, নির্বাচন কমিশনের ওপর থেকে জনগণের আস্থার পারদ নেমে যাওয়ার পরও এর পুনরুদ্ধারে তাদের কোনো প্রচেষ্টা তো নেই-ই, উপরন্তু তাদের কর্মকাণ্ড সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটিকে ক্রমেই ম্লান করছে। এসব বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার খবর ইতোমধ্যে বহুবার সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নিজেই নির্বাচন কমিশনের বেশকিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গৃহদাহ নির্বাপণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শুধু ব্যর্থতার পরিচয়ই দেননি, তিনি নিজেই নানা সময়ে তার দায়িত্বহীন বক্তব্যের কারণে বিতর্কিত হয়েছেন। সংবিধানে যে ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে, এর যথাযথ কিংবা সুষ্ঠু প্রয়োগে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করা দুরূহ কিছু নয়।

আমরা জানি, সংবিধান অনুসারে নির্বাচনকালীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশনকে সরকার ও প্রশাসন তাদের চাহিদার নিরিখে সহযোগিতা করতে বাধ্য। কিন্তু অভিযোগ আছে, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের এবং ক্ষমতাসীন মহলের প্রভাবশালী কারও কারও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠছে। নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন তো বটেই, একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। এর দায় সরকারও এড়াতে পারে না। তবে দায়টা বহুপক্ষের হলেও মূলত নির্বাচন কমিশনের দায়ই সর্বাধিক। কয়েকদিন আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘সংঘাতের দায় প্রশাসন, পুলিশ বা নির্বাচন কমিশনকে দিলে চলবে না। ঘরে ঘরে, মহল্লায় মহল্লায় পাহারা দিয়ে নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব নয়।’ এমন দায়িত্বহীন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি তার বা তাদের দায়িত্ব পালনে এখতিয়ারের ব্যর্থতার পাশাপাশি শপথও ভঙ্গ করেছেন।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ প্রায় অন্তিমে। তারা যাচ্ছে বটে, কিন্তু যেসব ক্ষত সৃষ্টি করে যাচ্ছে তাতে পরবর্তী যে কোনো কমিশনের পক্ষে এই ক্ষত সারানো অত সহজ হবে না। তাছাড়া পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়েও যে প্রক্রিয়ায় চিন্তাভাবনা চলছে তাতে কাঙ্ক্ষিত কিছু মিলবে কি? গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ নির্বাচন। অথচ এই নির্বাচন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আরও আগেই। এখন তো আরও ধস নেমেছে। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত অস্বচ্ছ ও অনিয়মের ইউপি নির্বাচনের যে চিত্র দেখা গেছে তাতে বলা যায়, এ কোনো নির্বাচন নয়, রীতিমতো নৈরাজ্য। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যেই সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। বিএনপি মাঠে নেই। তাদের অনুসারী স্বতন্ত্রভাবে কেউ কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তাদের অবস্থা কোণঠাসা। তাছাড়া অন্য দলের যারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বা নিয়েছেন তাদেরও ওই একই অবস্থা। অর্থাৎ আওয়ামী লীগই এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ।

নির্বাচন কমিশন সব পক্ষের জন্য মাঠ সমতল করতে পারেনি বিধায়ই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর দায় সরকারইবা এড়াবে কী করে? সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, আওয়ামী লীগ মনোনীত কোনো কোনো চেয়ারম্যান প্রার্থী যেভাবে ভোটারদের হুমকি-ধমকি কিংবা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক তো বটেই, আইনশৃঙ্খলার জন্যও চরম অশুভ বার্তা। এর কী প্রতিকার করতে পারলেন দায়িত্বশীলরা? বাহুবল, অর্থবল, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বৃত্তায়নের এমন ঘটনা অতীতেও অনেক ঘটেছে। এর কোনোটিরই দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার হয়নি বিধায় অবক্ষয় সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর নিম্নস্তর ইউপি নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতার এই চিত্র অনেক রোগের বড় উপসর্গ। দলভিত্তিক নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হতাহতের মর্মন্তুদ সম্পর্ক যে বিদ্যমান, এই সত্য এড়ানো যাবে না।

এও সত্য, দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন পদে নির্বাচনের কারণে শুধু সহিংসতাই বাড়ছে না, একই সঙ্গে যোগ্য কিংবা সৎ প্রার্থীরাও শিকার হচ্ছেন নানামুখী বঞ্চনার। সরকারি দলের অনেকেই এখন আবার দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের কথা ভাবছেন এও সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ। তাদের বিলম্বিত এই বোধোদয় দলের অন্য নীতিনির্ধারকদেরও মধ্যে ঘটুক। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকাণ্ড, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করতে অক্ষমতা ইত্যাদি নানা কারণে শুধু যে নির্বাচন ব্যবস্থাই কলুষিত হয়েছে তা-ই নয়, এর আরও বহুমুখী বিরূপ প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য শুদ্ধ রাজনীতির চর্চা যেমন অত্যন্ত জরুরি, তেমনি নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সবার নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনেরও বিকল্প নেই। জনকল্যাণের রাজনীতির অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে রাজনীতিকদের বিদ্যমান বৈরী পরিস্থিতির নিরসনের ব্রতী হতেই হবে। রাজনীতি কিংবা নির্বাচনের নামে প্রহসন কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •