প্রেসিডেন্টের সংলাপে কোনো লাভ হবে কি?

Published: 6 January 2022, 4:38 PM

।। মোবায়েদুর রহমান ।।


নির্বাচন কমিশন গঠনকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ যে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন, সেই বিষয়ে লিখতে গিয়ে ‘দৈনিক সমকালের’ অনলাইন সংস্করণের ৩০ ডিসেম্বর সংখ্যায় চোখ আটকে গেল। ঐ সংখ্যায় একটি খবরের শিরোনাম, ‘ছুটিতে গেলেন বিচারপতি ইমান আলী’। বোধগম্য কারণেই এই খবরটিতে আগ্রহী হলাম। কারণ, আমি জানতাম যে, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে যাওয়ার পর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে যে ৪ জন বিচারপতি আছেন তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হলেন বিচারপতি ইমান আলী। তিনি কেন লম্বা ছুটিতে গেলেন সেটি জানার জন্য খবরটি খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লাম। সেই সাথে উইকিপিডিয়ায় তাদের চাকরির বৃত্তান্তও পড়লাম। দেখতে পেলাম, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং ইমান আলী একই তারিখে অর্থাৎ ২০০১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। মাহমুদ হোসেন এবং ইমান আলী একই তারিখে, অর্থাৎ ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছেন। বিচারপতি (অব.) আবদুল ওয়াহাব মিঞা হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হন ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর। হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হন ২০০১ সালে। আপিল বিভাগে নিযুক্তি পান ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির পদ ছাড়লে এবং দেশত্যাগ করলে জ্যেষ্ঠতার বিচারে বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্টের অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ ২ মাস ১৯ দিন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আবদুল ওয়াহাব মিঞাকে সুপারসিড করে (ডিঙ্গিয়ে) সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করা হলে বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা পদত্যাগ করেন।

সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে গেলে আপিল বিভাগের ৪ জন বিচারপতির মধ্যে জ্যেষ্ঠতম ছিলেন বিচারপতি ইমান আলী। ৩০ ডিসেম্বর বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ভার গ্রহণ করার পূর্বাহ্নে বিচারপতি ইমান আলী লম্বা ছুটিতে চলে গেছেন।

॥দুই॥
‘দৈনিক সমকালের’ আলোচ্য রিপোর্টের এক স্থানে বলা হয়, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর চাকরি বিধি অনুযায়ী ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। অবশ্য জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। এখানে আইন লঙ্ঘন ও জ্যেষ্ঠতার কোনো বিষয় নেই।’

সমকালের ঐ রিপোর্টে বলা হয়, ‘জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে (সুপারসিড) উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ নতুন কিছু নয়। সংবিধানই সুপারসিড করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে। গত এক দশকে আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগে সুপার সেশনের (জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের) একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হলে আপিল বিভাগের দুই বিচারপতি ছুটিতে যান। তারা হলেন বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল মতিন এবং বিচারপতি শাহ্ আবু নইম মোমিনুর রহমান। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেওয়ার পরেও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রাপ্ত বিচারপতিদের শপথ পড়াননি। এই দুজনের একজন হলেন বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস। তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলার অভিযোগ ছিল। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে তাকে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দেওয়া হলে প্রধান বিচারপতি ফজলুল করিম তাকে শপথ পাঠ করাতে অস্বীকার করেন। এ বি এম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হলে তাকে শপথ পাঠ করান। অপর বিচারপতি হলেন মোহাম্মদ খসরুজ্জামান। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে ভাংচুরের অভিযোগ ছিল। ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগে ১৭ জন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ১৭ জনের মধ্যে ছিলেন জনাব রুহুল কুদ্দুস ও জনাব খসরুজ্জামান। ১৮ এপ্রিল ২০১০ নবনিযুক্ত ১৭ জন বিচারকের মধ্যে রুহুল কুদ্দুস এবং মোহাম্মদ খসরুজ্জামান ছাড়া অবশিষ্ট ১৫ জনকে শপথ পাঠ করান প্রধান বিচারপতি ফজলুল করিম। পরে এ বি এম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হলে ঐ বছরের নভেম্বরে ঐ দুই জনসহ ৪ জনকে শপথ পাঠ করানো হয়। উল্লেখ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসলাম হত্যার প্রধান আসামি ছিলেন রুহুল কুদ্দুস। আর অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস ভাংচুর এবং প্রধান বিচারপতির দরজায় পদাঘাতের অভিযোগ ছিল খসরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।’

॥তিন॥
শুরু করেছিলাম নির্বাচন কমিশন গঠন কেন্দ্রিক এক শ্রেণির রাজনৈতিক দলের সাথে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সংলাপ নিয়ে। এখন আবার সেখানেই ফিরে যাচ্ছি। দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি এই বৈঠকে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাদের সংলাপে ডাকা হবে না। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলও (বাসদ) সংলাপে যাবে না। ইসলামী আন্দোলন এবং গণফোরামের একাংশও সংলাপে যাবে না। এরা না গেলে কাদের নিয়ে প্রেসিডেন্ট বৈঠক করছেন? আরো কয়েকটি দল আছে। তারা কি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে?

এসব দলের সাথে বৈঠক শেষ করে প্রেসিডেন্ট একটি সার্চ কমিটি গঠন করবেন। অতীতেও দুইবার সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কী ফল হয়েছে? তার আগে আরেকটি কথা। বাংলাদেশের সংবিধানের কোনো পৃষ্ঠাতেই সার্চ কমিটি বলে কোনো শব্দ নেই। তাহলে সার্চ কমিটি গঠন করা হয় কীভাবে? এর আগে ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান এবং ২০১৭ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের আমলেও সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সার্চ কমিটি সিইসির জন্য একাধিক নাম এবং ৪ জন ইসির জন্য অন্তত ৮টি নাম সুপারিশ হিসেবে প্রেসিডেন্টের কাছে পেশ করে। তাহলে এই প্রেসিডেনশিয়াল ডায়ালগের অর্থ কী? উদ্দেশ্য কী?

অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে, অনেকের অভিমত, প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠকের কোনো প্রয়োজন নেই। এটি ইংরেজি ভাষায় সম্পূর্ণ ‘আনপ্রোডাক্টিভ’। ২০১২ সালে সমস্ত বিরোধীদল বৈঠকে অংশ নিয়েছিল। ২০১৭ সালেও তাই, অর্থাৎ সমস্ত বিরোধী দল অংশ নিয়েছিল। ঐসব বৈঠকের ফল হিসেবে কি কোনো নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল? হয়নি। বরং ঐ দুই বারের (২০১২ এবং ২০১৭) বৈঠকের পর সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছিল, যে সার্চ কমিটির কোনো প্রভিশন শাসনতন্ত্রের কোথাও নাই। বরং দুইবারই দুইটি সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছিল এবং দুইবারই সার্চ কমিটির প্রধান করা হয়েছিল সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞাকে ডিঙিয়ে (সুপারসিড করে) সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি করা হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর সৈয়দ মাহমুদ হোসেন রিটায়ার করেছেন। সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সুপারিশেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন রকিব উদ্দিন এবং পরে কে এম নুরুল হুদা। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে যে কয়জন সিইসি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসেছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে অযোগ্য এবং সরকারের সবচেয়ে বেশি অনুগত হিসেবে সর্ব সাধারণের কাছে চিহ্নিত হয়ে আছেন এই দুই সিইসি।

॥চার॥
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের সাথে এক শ্রেণির রাজনৈতিক দলের বৈঠক হচ্ছে কি সার্চ কমিটি গঠনের জন্য? কারণ, এই বৈঠকের পরেই তো নির্বাচন কমিশন গঠিত হচ্ছে না। এই বৈঠকের পর তো গঠিত হবে সার্চ কমিটি। সার্চ কমিটি যেসব নাম দেবে সেসব নাম থেকে প্রেসিডেন্ট সিইসি এবং ইসির সদস্যদের নিয়োগ দেবেন। এই নিয়োগ দেওয়ার আগে যে, সরকার প্রধানের সাথে আলোচনা করা হয় সেটি উহ্যই থেকে যায়।

আসল কথা হলো, বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন কোনো অবস্থাতেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা সেই সাক্ষ্যই দেয়। কেয়ারটেকার সরকার পরিচালিত নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০১২ সালে আওয়ামীপন্থী চিফ জাস্টিস খায়রুল হক কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল করে। তারপর উত্থান ঘটে কর্তৃত্ববাদের। কেয়ারটেকার সরকার বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া কর্তৃত্ববাদের অবসান ঘটবে না।

  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares