আফগানিস্তানে লুকিয়ে থাকা বিপদ

Published: 29 April 2022, 10:46 AM

শারলট স্লেনটা


বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সামাজিক পরিষেবা কার্যক্রম ভেঙে পড়ার কারণে আফগান নাগরিকদের বেশির ভাগই এখন ক্রমবর্ধমান এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছে। এর মধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আছে প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ আফগান। ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যাটি দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। সংগত কারণেই বিশ্ব এখন ইউক্রেনের দিকে তাকিয়ে আছে; কিন্তু আমাদের অবশ্যই আফগানিস্তানকে ভোলা উচিত নয়।

আফগানিস্তানে এখন মানবিক সংকট চলছে, তার জন্য কিছুটা হলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো দায়ী। গত আগস্টে আফগান সরকারের পতনের পর দেশটির প্রতি নানা নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। যদিও নিষেধাজ্ঞা একটি বৈধ রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে; কিন্তু এগুলো কোনোভাবেই বেসামরিক নাগরিকদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না।

এই নিষেধাজ্ঞাগুলো যে আফগান বেসামরিক নাগরিকদের জীবনের জন্য কিছু হুমকি সৃষ্টি করেছে তা একেবারে পরিষ্কার। তবে আরো ভয়াবহ কিছু হুমকি লুকিয়ে রয়েছে দেশটির মাটির নিচে। সেগুলো এখন শুধু বিস্ফোরিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এর কারণ হচ্ছে দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাতে স্থলমাইন ও পরিত্যক্ত বিস্ফোরক সরঞ্জামে আফগানিস্তান আবর্জনায় পরিণত হয়েছে। ফলে বর্তমানে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর একটি।

কয়েক সপ্তাহ আগে আফগানিস্তানের হেরাতে একটি পুরনো গ্রেনেড হাতে নেওয়ার পর বিস্ফোরিত হয়ে চার শিশু প্রাণ হারায়। কয়েক মাস আগে নানগাহার প্রদেশের দেগনান গ্রামে একই ধরনের আরেকটি দুর্ঘটনায় মারা যায় ৯ শিশু। ২০২২ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আরো অনেকে এভাবে নিহত, আহত ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ৩০ বছরে দেশটিতে ৪১ হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক পরিত্যক্ত গোলাবারুদে প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই শিশু।

ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিল (ডিআরসি) ২০১৯ সাল থেকে স্থানীয় অংশীদারদের নিয়ে আফগানিস্তানে মানবিক ‘মাইন অ্যাকশন’ কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে মাইন অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা, পুরনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ধ্বংস করা এবং বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ঝুঁকি হ্রাস বিদ্যা প্রদান করার মতো বিষয়গুলো রয়েছে। প্রথম ও সর্বাগ্রে জীবন বাঁচানোই মুখ্য। ঠিক এ কারণে মাইনমুক্তকরণ অভিযান আফগানিস্তানের মানুষের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাইন অপসারণ ছাড়া কয়েক দশকের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত আফগানরা নিজ দেশে নিজেদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে না। কার্যকর মাইনমুক্তকরণ অভিযান ছাড়া দেশটিতে মানুষ কৃষিকাজ চালাতে পারবে না, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে পারবে না এবং শিশুরা স্কুলে যেতে পারবে না বলে শিক্ষা কার্যক্রমও ঠিকভাবে চলবে না।

এই মুহূর্তে আফগানিস্তানকে মাইন এবং অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থেকে মুক্ত করার কার্যক্রম ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে বিশেষায়িত মাইনমুক্তকরণ সরঞ্জাম প্রাপ্তি আগের চেয়ে আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আফগানদের নেতৃত্বাধীন জীবনরক্ষাকারী মাইনমুক্তকরণ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

নিষেধাজ্ঞার ফলে যে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে তা দ্রুত আফগানিস্তানের মাইনমুক্তকরণ মন্ত্রণালয়ের পতন ঘটাতে পারে। এই ধরনের পতন আফগানিস্তানের জনগণের জন্য এবং বিপজ্জনক পরিত্যক্ত যুদ্ধ সরঞ্জাম থেকে তাদের ভূমি নিরাপদ করার কাজে একটি বেদনাদায়ক ধাক্কা হয়ে আসবে। এ বিষয়ে কয়েক দশক ধরে যে সক্ষমতা গড়ে উঠেছে এবং জ্ঞান সঞ্চিত হয়েছে তা হঠাৎ করেই হারিয়ে যেতে পারে। মন্ত্রণালয়ের বেশির ভাগ কর্মচারী বছরের পর বছর ধরে কর্মরত এবং আন্তর্জাতিক মাইন অপসারণ সম্প্রদায়ের সঙ্গে একসঙ্গে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। তাই দেশটিতে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এই কর্মচারীরা বিনিয়োগ ও সমর্থন পাওয়ার যোগ্য।

অন্যদিকে মাইন অপসারণ কার্যক্রম পতনের ঝুঁকিটি এমন একসময়ে তৈরি হচ্ছে, যখন এই কাজে গতি বাড়ানোর কথা। ২০২১ সালের আগস্টের পর থেকে সংঘাত কমে যাওয়ার পর এখন আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে মানুষের কাছে গিয়ে এবং দেশটির অনেক বেশি এলাকায় কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা মাইনমুক্ত করার কার্যক্রমকে আরো বাড়ানোর জন্য একটি অনন্য সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যাতে অগণিত জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এটি এমন একটি সুযোগ, যা আমাদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে।

এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য আফগানিস্তানের জনগণের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন পুনর্বহাল এবং অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত সুবিধা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাহলে দেশটিতে পরিষ্কারভাবে আবারও পূর্ণমাত্রায় মাইনমুক্তকরণ অভিযান চালু করার সুযোগ তৈরি হবে। আফগানিস্তানের জনগণের স্বার্থে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত, জরুরি ভিত্তিতে মাইনমুক্তকরণ সক্ষমতা গড়ে তোলার সফল উপায়গুলো অনুসন্ধান করা। আফগান জনগণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তাদের উচিত নয়।

লেখক : ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিলের (ডিআরসি) সেক্রেটারি জেনারেল

সূত্র : আলজাজিরা, ভাষান্তরিত