এই ঈদ হোক সম্প্রীতি ও আনন্দের

Published: 4 May 2022, 9:46 AM

।।আবদুল মান্নান।।


একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবার সারা বিশ্বে চাঁদ দেখা যাওয়া সাপেক্ষে ৩ মে মুসলমানদের ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসীদের যে কয়েকটি বড় উৎসব আছে তার মধ্যে ঈদুল ফিতর অন্যতম। ৩০ বা ২৯ দিন রমজান বা রোজা শেষে এই দিনটি বছরে একবার আসে। যেহেতু দিনটি হিজরি সন অনুযায়ী ধার্য করা হয়, সেহেতু মুসলমানদের কোন উৎসব ঠিক কোন দিন উত্যাপিত হবে তা আগে থেকে অনেক সময় জানা যায় না।

হিজরি সন গোনা হয় সূর্য অস্ত থেকে পরবর্তী দিনের সূর্য অস্ত পর্যন্ত। অর্থাৎ হিজরি সন চান্দ্রমাসভিত্তিক। রমজান শুরু হয় হিজরি বর্ষের রমজান মাসে। এবার ঈদটা অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসেছে। গত দুই বছর সারা বিশ্বে কভিডের কারণে মানুষ কোনো ঈদ স্বাভাবিকভাবে করতে পারেনি।

সাধারণত সকালে ঈদের জামাত বা নামাজ উন্মুক্ত স্থানে অথবা মসজিদে আদায় করা হয়। যে তিনটি নামাজে আজান দিতে হয় না তার মধ্যে দুই ঈদের নামাজ ছাড়াও আছে জানাজা। অবশ্য জানাজা হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া। গত দুই বছর অনেকে ঈদের নামাজ বাড়িতেই পড়েছেন। রমজানের সময় প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষ সৌদি আরবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন উমরাহ পালন করতে। এই দুই বছর সীমিতসংখ্যক মানুষ তা পালন করতে পেরেছেন। অন্য দেশ থেকে উমরাহ বা হজ পালনও নিষিদ্ধ ছিল। আর্থিক দিক দিয়ে দেশটি বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এখন তা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

গত দুই বছরে শুধু যে কভিডের কারণে বিশ্বের ক্ষতি হয়েছে তা নয়, এই সময়ে যুদ্ধ বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার কারণেও বিশ্বের শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে এই সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপের কারণে তা বিস্তার লাভ করতে পারেনি। এই মুহূর্তে ভারতের কোনো কোনো শহরে বা রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের উসকানিতে এই সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এমন ঘটতেই থাকলে তা তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

কোনো ধর্মই হিংসা-বিদ্বেষ সমর্থন করে না। কিন্তু যুগে যুগে এই ধর্মকে ব্যবহার করে দেশে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ঈদের শুরু কখন হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও এটি মোটামুটি জানা যায় হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে (তখন থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু হয়)। ইসলামের রাসুল দেখতে পান সেখানকার বাসিন্দারা নানা সময়ে নানা ধরনের উৎসব উদযাপন বা পালন করে। এই সময় মদিনায় জনসংখ্যার বেশির ভাগই ছিল অমুসলিম। মুসলমানের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। আর সমাজ ছিল গোত্র বিভাজিত। গোত্রে গোত্রে সংঘাত লেগেই থাকত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় আসার পর তিনি প্রথমে যে বিষয়টির ওপর নজর দিলেন তা হলো মদিনার বাসিন্দাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি স্থাপন করা। রচিত হলো মদিনা সনদ, যাকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান, যাতে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে মদিনার সব বাসিন্দার মধ্যে শান্তি স্থাপনের কথা বলা হয়।

বিশ্বায়নের যুগে সব ধর্মের পালাপার্বণে পরিবর্তন এসেছে। ঈদও তার বাইরে নয়। একসময় যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ছিল, ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার খপ্পরে পড়ে তা এখন অনেকটা হারিয়ে গেছে। একসময় এই বাংলাদেশে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মের পালাপার্বণের ধর্মীয় বিষয়গুলো বাদ দিলে বাকি বিষয়গুলো যেমন সর্বজনীন চিত্র ছিল, তা আর তেমনটা নেই বললেই চলে। ছোটবেলায় ঈদের নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে মুরব্বিদের সালাম করে চার আনা, আট আনা ঈদের সালামি নিতে যাওয়া সবার জন্য অনেকটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তেমনটা বর্তমান সময়ে আর দেখা যায় না। এখন মানুষের হাতে কাঁচা টাকা এসেছে ঠিকই, কিন্তু বিরাটসংখ্যক মানুষের ঈদের আনন্দের অর্থ অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। এখন ঈদের সময় মানুষ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়াটা তেমন একটা প্রয়োজন মনে করে না। এ বছর ঈদের ছুটি কাটাতে এই দেশের পাঁচ লাখ মানুষ ভারতে, বেশির ভাগই কলকাতায় যাচ্ছে। দুই বছর তারা মহামারির কারণে কোথাও যেতে পারেনি। এবার তারা তা পুষিয়ে নিচ্ছে। লক্ষাধিক মানুষ ভারত থেকে ঈদের বাজার করে দেশে ফিরেছে। ভারতের অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশের গুরুত্ব কতটুকু তা বোঝার জন্য বড় মাপের কোনো অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

একসময় এ দেশের মানুষ ৪০০-৫০০ টাকার বাজেটে ঈদের কেনাকাটা সেরে নিত। এখন আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা খরচ করে মানুষ ঈদের দিন কয়েক ঘণ্টা পরার জন্য শেরোয়ানি কেনে। ভারত থেকে আমদানি করা মেয়েদের লেহেঙ্গার দাম নাকি তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা। দ্রুত বদলে যাচ্ছে সমাজ আর মানুষের রুচি। কাঁচা টাকা বলে কথা। তেমনটা সব ধর্মের উৎসবকে কেন্দ্র করেই হচ্ছে। সব ধর্মের পালাপার্বণে জৌলুস এসেছে সত্য, কিন্তু প্রাণটা চলে গেছে অনেক আগে। আগে যারা ঈদ কার্ড পাঠিয়ে বন্ধু-বান্ধবকে শুভেচ্ছা জানাত, এখন তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুদে বার্তা বা ডিজিটাল ঈদ কার্ড পাঠিয়ে তা সেরে নিচ্ছে। ডিজিটাল যুগ বলে কথা!

কোনো ধর্মের কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আগে অশান্তি সৃষ্টির কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে মনে পড়ছে না। এখন বিভিন্ন দেশে এসব বিষয় নিয়ে সংঘাত বা অশান্তির ঘটনা ঘটার খবর বিচিত্র বা নতুন কিছু নয়। এই সেদিনও ঈদ এলে বাড়িতে অন্য ধর্মের বন্ধুরা যেভাবে বেড়াতে আসত, তাদের জন্য প্রয়োজনে বিশেষ খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা থাকত, তা তেমন একটা আর নেই। তাদের কয়েকজন এরই মধ্যে চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, কেউ কেউ নানা কারণে দেশান্তরিত হয়েছে। বন্ধু, সুশীল ও তার পরিবারের সদস্যরা ঈদের দিন বাড়িতে বেড়াতে এলে আগে থেকে বলে রাখত তাদের জন্য যেন ছোলা ভাজা হয়, যেমনটা আমরা ইফতারের সময় ভাজি। মা খুব যত্ন করে তা বানিয়ে রাখতেন। রণজিত্দার মোরগ-পোলাও খুব পছন্দ। মা জানতে চাইতেন রনজিত্দা এ বছর আসবেন তো? কয়েক বছর আগে তিনি ইহলোকের মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। সরকারদার সেমাই খুব পছন্দ। তিনি আর আসবেন না কোনো দিন।

সব ধর্ম শান্তির কথা বললেও বর্তমান সময়ে সেই ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের মধ্যে দেয়াল তৈরি করছে। চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদী মানুষ আশা করে এই দেয়াল দ্রুত ভাঙবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে দেশে তা আরো উঁচু হচ্ছে। সম্প্রীতি শক্ত হওয়ার পরিবর্তে ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। এটি সভ্যতার জন্য একটি অশনিসংকেত। অথচ বিগত মহামারিকালে সেই মানুষই আবার মানবতার অনেক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের কোনো একটি পাড়ায় কভিডে আক্রান্ত হয়ে একজন সনাতন ধর্মের মানুষ মারা গেলে তাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজ ধর্মের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। পাড়ার মুসলমান ছেলেরা মিলে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে মরদেহের শেষকৃত্য সেরেছে। ভারতের আসানসোলে একজন মুসলমান ছেলে একজন স্বজন ছাড়া বৃদ্ধের মুখাগ্নি করেছে। ভারতের বিখ্যাত দেওবন্দ মাদরাসা তাদের একটি বিশাল ভবন উন্মুক্ত করে দিয়েছিল কভিডকালে সবার জন্য হাসপাতাল বানাতে। এই একটি মহামারি প্রমাণ করেছে মানবিক হওয়ার বিষয়টি হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। সদিচ্ছা থাকাটাই জরুরি।

আমাদের জীবনে এমন একটি কঠিন সময় পার করার পর হয়তো আরেকটা ঈদ আসবে না। এবারের ঈদটা সব দেশেই মানুষে মানুষে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সম্প্রীতি সৃষ্টি করার ঈদ হোক, যেমনটি হয়েছিল ইসলামের প্রথম যুগে। পাঠকদের ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক