পবিত্র ঈদুল আজহা: কুরবানী, পশুর জবাই, গোশত বণ্টন ও ঈদের আমল

Published: 26 May 2026

ডাঃ এম এ ছালাম


১. কোরবানী করার ইতিকথা (সংক্ষেপ)
কোরবানীর ইতিহাস মানবজাতির ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। তবে বর্তমান কোরবানীর মূল ভিত্তি হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) এর মহান ত্যাগ।
• প্রথম কোরবানী:পৃথিবীর প্রথম কোরবানী করেছিলেন আদম (আঃ) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল। আল্লাহ হাবিলের কোরবানী কবুল করেছিলেন।মূল ইতিকথা:আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-কে স্বপ্নে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানী করার নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আঃ)-কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জবেহ করতে উদ্যত হন।চূড়ান্ত পরীক্ষা:পিতা ও পুত্র উভয়েই আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করেন। ইব্রাহিম (আঃ) যখন পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছিলেন, তখন আল্লাহর কুদরতে ইসমাইল (আঃ)-এর স্থলে একটি দুম্বা চলে আসে।কবুলিয়াত:আল্লাহ ইব্রাহিম (আঃ)-এর এই মহান ত্যাগ কবুল করেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর জিলহজ মাসে মুসলিম উম্মাহ কুরবানী করে থাকে। (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২-১০৭)
২. ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক পশু জবাইয়ের নিয়ম
পশু জবাই করার সময় দয়া, ইহসান এবং সুন্নাহর প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি। হাদিসের আলোকে নিয়মগুলো নিচে দেওয়া হলো:
• ধারালো ছুরি: জবাইয়ের অস্ত্র বা ছুরি অত্যন্ত ধারালো হতে হবে, যেন পশু কষ্ট না পায়। পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া নিষেধ। (সহীহ মুসলিম)
• শান্তভাবে নেওয়া: পশুকে টেনে-হিঁচড়ে কষ্ট দিয়ে জবাইয়ের স্থানে নেওয়া যাবে না। এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা মকরুহ।
• কিবলামুখী করা:পশুকে বাম কাতে শুইয়ে মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পাগুলো পশ্চিম দিকে রেখে কিবলামুখী করতে হবে।
• তসমীয়া বা দোয়া পড়া: জবাইয়ের সময় মুখে স্পষ্ট স্বরে”বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার”বলতে হবে। ইচ্ছা করে এটি বাদ দিলে পশু হারাম হয়ে যায়।
• চারটি রগ কাটা: জবাইয়ের সময় পশুর গলার চারটি প্রধান রগ (শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং দুপাশের দুটি রক্তনালী) কাটতে হবে। কমপক্ষে তিনটি কাটা জরুরি।ধৈর্য ধরা:রক্ত পুরোপুরি বের হওয়া এবং পশুর প্রাণ সম্পূর্ণভাবে চলে যাওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা পা কাটা যাবে না।
৩. কোরবানীর গোশত বণ্টনের শরয়ী নিয়ম
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,”তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ, অভাবী ও তৃপ্তদের আহার করাও।”(সূরা হজ, আয়াত: ২৮, ৩৬)। এই নির্দেশনার আলোকে ওলামায়ে কেরাম গোশত বণ্টনকে তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব (উত্তম) বলেছেন:
• প্রথম ভাগ:১/৩ অংশ (তিন ভাগের এক ভাগ) নিজের পরিবারের জন্য রাখা।দ্বিতীয় ভাগ:১/৩ অংশ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের উপহার দেওয়া।তৃতীয় ভাগ:১/৩ অংশ দরিদ্র, মিসকিন ও অভাবী মানুষের মাঝে বণ্টন করা।বিশেষ দ্রষ্টব্য:কুরবানীর পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করা যায়। তবে বিক্রি করলে তার সম্পূর্ণ টাকা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দিতে হবে। কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানীর গোশত বা চামড়া দেওয়া জায়েজ নয়।
৪. ঈদুল আজহার দিন করণীয় ও সুন্নাহসমূহ:
ঈদের দিনটি ইবাদত এবং আনন্দের দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী এই দিনের প্রধান করণীয়গুলো হলো:
• তাড়াতাড়ি ওঠা: ঈদের দিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠা।
• মিছওয়াক ও গোসল: সুন্নাহ অনুযায়ী মিছওয়াক করা এবং পবিত্রতার জন্য গোসল করা।
• উত্তম পোশাক: নিজের সংগ্রহে থাকা সবচেয়ে পরিষ্কার বা নতুন পোশাক পরিধান করা।
• সুগন্ধি ব্যবহার: পুরুষদের জন্য আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা।
• না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া: ঈদুল ফিতরে খেয়ে যেতে হয়, তবে ঈদুল আজহায় কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। কুরবানীর গোশত দিয়ে দিনের প্রথম খাবার গ্রহণ করা উত্তম। (তিরমিজি)পায়ে হেঁটে যাওয়া: সম্ভব হলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা
• ভিন্ন পথে ফেরা: যে পথে ঈদগাহে যাবেন, ফেরার সময় অন্য পথ ব্যবহার করা। (সহীহ বুখারী)
• তাকবীরে তাশরীক পড়া: জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর উচ্চস্বরে (নারীরা মনে মনে) এই তাকবীর পড়া ওয়াজিব:”আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।”ঈদের সালাত:ঈদগাহে গিয়ে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব সালাত আদায় করা এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা।কোরবানী করা: ঈদের সালাত শেষ হওয়ার পর নিজের পশু কুরবানী করা। সালাতের আগে কুরবানী করলে তা সাধারণ জবাই হবে, কোরবানী হবে না। (সহীহ বুখারী)
১. জবেহ করার ঠিক আগের দোয়া (পশু কিবলামুখী করার পর)
পশুকে কাত করে কিবলামুখী করে শোয়ানোর পর জবেহ করার ঠিক আগে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত:
আরবী:
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ
বাংলা উচ্চারণ:
ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাওঁ ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না সালাতী ওয়া নুশুকী ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা শারীকা লাহু ওয়া বিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।
অর্থ:
“নিশ্চয়ই আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে আমার মুখমণ্ডল সেই মহান সত্তার দিকে ফেরালাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার সালাত (নামাজ), আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছুই সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই, আমি এই নির্দেশই পেয়েছি এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলিমদের) একজন। হে আল্লাহ! এটি আপনার পক্ষ থেকেই প্রাপ্ত এবং আপনার জন্যই উৎসর্গীকৃত।”
২. জবেহ করার মূল মুহূর্তের তাকবীর (বাধ্যতামূলক)
ছুরি চালানোর ঠিক মুহূর্তটিতে এই তাকবীরটি পড়া বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব)। এটি না পড়লে বা ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলে পশু হারাম হয়ে যাবে:
আরবী:
بِسْمِ اللهِ اَللهُ اَكْبَرُ
বাংলা উচ্চারণ:
বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।
অর্থ:
“আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
৩. জবেহ করার পরের দোয়া
পশু জবেহ করা শেষ হলে আল্লাহর দরবারে কুরবানী কবুল হওয়ার জন্য এই দোয়াটি পড়তে হয়:
আরবী:
اَللَّهُمَّ تَقَبَّلْهُ مِنِّى كَمَا تَقَبَّلْتَ مِنْ حَبِيْبِكَ مُحَمَّدٍ وَخَلِيْلِكَ اِبْرَاهِيْمَ عَلَيْهِمَا الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ
বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নী (অন্যের কুরবানী হলে: মিন…) কামা তাকাব্বালতা মিন হাবীবিকা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া খালীলিকা ইবরাহীমা আলাইহিমাস সালাতু ওয়াস সালাম।
অর্থ:
“হে আল্লাহ! আপনি আমার পক্ষ থেকে এই কুরবানী কবুল করুন, যেভাবে কবুল করেছিলেন আপনার প্রিয় বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং আপনার বন্ধু হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পক্ষ থেকে।”
দ্রষ্টব্য: আপনি যদি নিজের কুরবানী নিজে জবেহ করেন, তবে বলবেন ‘মিন্নী’ (আমার পক্ষ থেকে)। আর যদি অন্য কারও কুরবানী জবেহ করেন, তবে বলবেন ‘মিন’ বলে সেই ব্যক্তির নাম বা নামগুলো উল্লেখ করবেন।
───ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী কুরবানী সহীহ হওয়ার জন্য পশুর নির্দিষ্ট বয়স এবং কিছু গুণাবলী বা শারীরিক সুস্থতা থাকা আবশ্যক। নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে পশুর বয়স ও গুণাবলীর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. কুরবানীর পশুর বয়স (Age of the Animal)
শরিয়ত অনুযায়ী কুরবানীর পশুর সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারিত রয়েছে। বয়স এর চেয়ে কম হলে কুরবানী জায়েজ হবে না, তবে বেশি হলে কোনো সমস্যা নেই:
• গরু, মহিষ: ন্যূনতম ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।উট: ন্যূনতম ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।ছাগল, ভেড়া, দুম্বা: ন্যূনতম ১ বছর পূর্ণ হতে হবে।বিশেষ ছাড় (ভেড়া ও দুম্বা): যদি কোনো ভেড়া বা দুম্বার বয়স ১ বছর পূর্ণ না হয়, কিন্তু দেখতে ৬ মাসের (বা তার বেশি) এবং এত পুষ্ট হয় যে ১ বছর বয়সী ভেড়ার চাক্ষুষ সমান মনে হয়, তবে তা দিয়ে কুরবানী করা জায়েজ। কিন্তু ছাগলের ক্ষেত্রে ১ বছর পূর্ণ হতেই হবে, কোনো ছাড় নেই।
২. কুরবানীর পশুর গুণাবলী ও শারীরিক সুস্থতা (Qualities)
কুরবানীর পশু হতে হবে সুস্থ, সবল এবং ত্রুটিমুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরবানীর পশুর নিখুঁত হওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রধান গুণাবলীগুলো নিচে দেওয়া হলো:
• নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন: পশুটি দেখতে সুন্দর, মোটা-তাজা এবং সুস্থ হওয়া উত্তম।শিং: শিং থাকলে ভালো, তবে শিং ভাঙা পশু দিয়েও কুরবানী করা যাবে—যদি না শিংটি একদম গোড়া বা মগজ থেকে ভেঙে যায়। জন্মগতভাবে শিং না থাকলে কোনো সমস্যা নেই।দাঁত: সাধারণত বয়স নির্ধারণের জন্য পশুর মুখের নিচের সারির দাঁত (দাঁত ওঠা) দেখা হয়। তবে বয়স নিশ্চিত হলে দাঁত না উঠলেও কুরবানী জায়েজ।
৩. যেসব ত্রুটির কারণে কুরবানী জায়েজ হবে না
হাদিসে স্পষ্ট করে চার ধরনের ত্রুটিযুক্ত পশুর কুরবানী করতে নিষেধ করা হয়েছে (সুনানে তিরমিজি):
• স্পষ্ট অন্ধ: যে পশুর এক বা দুই চোখ পুরোপুরি অন্ধ বা নষ্ট।তীব্র অসুস্থ: যে পশু স্পষ্টভাবেই রোগাক্রান্ত এবং জবেহ করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার শক্তি রাখে না।স্পষ্ট খোঁড়া: যে পশু তিন পায়ে হাঁটে এবং চতুর্থ পা মাটিতে রাখতেই পারে না বা খোঁড়ামির কারণে পালের সাথে চলতে পারে না।অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ: যে পশু এত রোগা বা দুর্বল যে তার হাড্ডিতে কোনো মজ্জা বা মগজ অবশিষ্ট নেই।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি (যা বর্জনীয়):
• কান বা লেজ কাটা: পশুর কান বা লেজের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ ভাগ) বা তার বেশি অংশ যদি কাটা থাকে, তবে তা দিয়ে কুরবানী হবে না।
• দাঁত না থাকা: পশুর যদি বেশির ভাগ দাঁত পড়ে গিয়ে থাকে এবং সে ঘাস-খড় চিবিয়ে খেতে না পারে, তবে তা কুরবানী করা যাবে না।
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বড় পশুর ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বে বা ভাগে কুরবানী করা সম্পূর্ণ জায়েজ। নিচে পবিত্র হাদিস ও ফিকহের আলোকে ভাগে কুরবানী করার প্রধান নিয়মগুলো দেওয়া হলো:
১. পশুর প্রকারভেদ ও সর্বোচ্চ অংশীদার (ভাগীদার)
• বড় পশু (গরু, মহিষ, উট): এই পশুগুলোতে সর্বোচ্চ ৭ জন বা ৭টি ভাগে কুরবানী করা জায়েজ। সাতের অধিক ব্যক্তি বা ভাগে শরিক হওয়া যাবে না। ১ থেকে শুরু করে ৭ জনের মধ্যে যেকোনো সংখ্যায় (যেমন: ২, ৩, ৪, ৫, ৬ বা ৭ জন) শরিক হওয়া যাবে। (সহীহ মুসলিম)ছোট পশু (ছাগল, ভেড়া, দুম্বা): এগুলো কেবল ১ জনের পক্ষ থেকেই উৎসর্গ করা যায়। ছোট পশুতে কোনো ভাগাভাগি বা অংশীদারিত্ব চলে না।
২. নিয়ত এবং উদ্দেশ্য শুদ্ধ হওয়া (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
• ভাগে কুরবানী করার মূল শর্ত হলো—সকল অংশীদারের নিয়ত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হতে হবে।যদি ৭ জনের মধ্যে এমন একজনও থাকে যার উদ্দেশ্য কেবল লোক দেখানো বা শুধু গোশত খাওয়া (আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়), তবে বাকি ৬ জনের কুরবানীও আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।
৩. সমতা এবং ক্রয়ের নিয়ম
• টাকা বা ব্যয়ের সমতা: ভাগে কুরবানী করার সময় পশুর দাম এবং আনুষঙ্গিক খরচ (যেমন পশুর হাট, কসাইয়ের খরচ) ভাগের অনুপাত অনুযায়ী সমানভাবে বণ্টন করতে হবে।অংশ সমান হওয়া: যদি কেউ বেশি টাকা দেয়, তবে তার অংশ বা গোশতের পরিমাণও সেই অনুপাতে নির্দিষ্ট থাকতে হবে। কোনো ভাগের অংশ অন্য ভাগের চেয়ে সাত ভাগের এক ভাগের (১/৭) কম হতে পারবে না।
৪. গোশত বণ্টনের নিয়ম (ওজন করা বাধ্যতামূলক)
• ভাগে কুরবানী করার পর পশুর গোশত, চর্বি, কলিজা ইত্যাদি অংশীদারদের মাঝে বণ্টনের সময় অবশ্যই পাল্লা-পাথর দিয়ে মেপে সমানভাগে ভাগ করতে হবে।আনুমানিক বা চোখ মেপে গোশত ভাগ করা শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষেধ। এতে কম-বেশি হলে তা ‘রিবাল ফাদল’ বা সুদের গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।তবে সমানভাবে মেপে নিজ নিজ অংশ বুঝে নেওয়ার পর, কোনো অংশীদার যদি নিজের ভাগ থেকে অন্য অংশীদারকে খুশি হয়ে কিছু গোশত উপহার দিতে চায়, তবে তা জায়েজ।
৫. কুরবানীর পর আকীকা বা মৃত ব্যক্তির নাম শামিল করা:
• কুরবানীর গরুর ৭ ভাগের মধ্যে কেউ চাইলে নিজের সন্তানের আকীকার নিয়ত শামিল করতে পারেন। ওলামায়ে কেরামের মতে এটি জায়েজ।একইভাবে, জীবিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কোনো ভাগে মৃত ব্যক্তির নামে (যেমন পিতামাতার মাগফিরাতের জন্য) কুরবানী দেওয়া জায়েজ।
*****কুরবানীর চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলোর পক্ষ থেকে চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে। এর ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
নিচে এই পরিস্থিতি, বর্জন ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মাদ্রাসা-এতিমখানা চামড়া সংগ্রহ না করলে সৃষ্ট পরিস্থিতি:
মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো বাংলাদেশে কুরবানীর চামড়া সংগ্রহের প্রধান চালিকাশক্তি। উনারা চামড়া সংগ্রহ বর্জন করলে দেশে মূলত ৩টি বড় সংকট তৈরি হবে:
• জাতীয় সম্পদের অপচয় ও শতকোটি টাকার ক্ষতি: প্রতি বছর কুরবানীর চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে দেশের লাখ লাখ এতিম, অনাত ও মাদ্রাসার গরিব শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ চলে। চামড়া সংগ্রহ না হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক সংকটে পড়বে এবং দেশের কাঁচামালের একটি প্রধান উৎস ধ্বংস হয়ে চামড়া শিল্প (Leather Industry) স্থবির হয়ে পড়বে।ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ: লাখ লাখ পশুর চামড়া যদি সময়মতো সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাত করা না হয়, তবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা পচতে শুরু করবে। মানুষ উপায় না পেয়ে চামড়া রাস্তায়, ডাস্টবিনে বা নদী-নালায় ফেলে দেবে। এর ফলে তীব্র দুর্গন্ধ, মাছি ও ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটবে, যা ডেঙ্গু বা অন্যান্য মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।লবণ সংকটের অপচয়: চামড়া সংরক্ষণের জন্য যে পরিমাণ লবণ ও জনবল অগ্রিম প্রস্তুত রাখা হয়, তা সম্পূর্ণ লোকসানের মুখে পড়বে।
২. বর্জ্য ও চামড়া অপসারণ ব্যবস্থার গুরুত্ব
কুরবানীর পর দ্রুত পশুর রক্ত, ভুঁড়ি, গোবরের মতো বর্জ্য এবং পরিত্যক্ত চামড়া অপসারণ করা নাগরিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
• জীবাণু ছড়ানো রোধ: পশুর রক্ত ও মাংসের টুকরো দ্রুত পচে বাতাসে অ্যানথ্রাক্স, সালমোনেলাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়।পানি ও মাটির দূষণ: বৃষ্টির পানিতে পশুর রক্ত ধুয়ে জলাশয়ে বা ড্রেনে গেলে পানি দূষিত হয় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে কৃত্রিম বন্যা তৈরি হয়।শহরের সৌন্দর্য রক্ষা: একটি পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ সমাজ নিশ্চিত করতে ঈদের পরবর্তী ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শতভাগ বর্জ্য অপসারণ করা জরুরি।
৩. বৈজ্ঞানিক উপায়ে বর্জ্য ও পরিত্যক্ত চামড়া অপসারণ/ব্যবস্থাপনা:
যদি চামড়া অবিক্রিত থেকে যায় বা বর্জ্য অপসারণ করতে হয়, তবে সাধারণ উপায়ে যেখানে-সেখানে না ফেলে নিচের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে হবে:
ক) পরিত্যক্ত চামড়ার বৈজ্ঞানিক ব্যবহার (যদি বিক্রি না হয়)
• লবণ দিয়ে সাময়িক সংরক্ষণ (Salting): চামড়া সংগ্রহকারী না থাকলেও চামড়াটি নষ্ট না করে তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাধারণ লবণ (পশুর ওজনের ১৫-২০%) মেখে ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে ৩-৪ দিন রাখা যায়। এতে চামড়ার পানি শুকিয়ে যায় এবং এটি সহজে পচে না। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব।অর্গানিক সার তৈরি (Composting): চামড়া যদি একেবারেই ফেলে দিতে হয়, তবে তা ডাস্টবিনে না ফেলে মাটির নিচে পুঁতে কম্পোস্ট বা জৈব সার বানানো যায়। চামড়ায় প্রচুর নাইট্রোজেন ও প্রোটিন থাকে, যা মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
খ) পশুর রক্ত ও অভ্যন্তরীণ বর্জ্য অপসারণ
• গভীর গর্তে পুতে ফেলা (Deep Burial): লোকালয় থেকে দূরে অন্তত ৪-৫ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে পশুর ভুঁড়ির বর্জ্য, গোবর ও পরিত্যক্ত অংশ ঢাকতে হবে। মাটি চাপা দেওয়ার আগে গর্তের ভেতর ব্লিচিং পাউডার বা চুন ছিটিয়ে দিতে হবে। এটি ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং দুর্গন্ধ ছড়াতে দেয় না।রক্তাক্ত স্থান জীবাণুমুক্তকরণ: পশু জবাইয়ের স্থানটি প্রচুর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। ধোয়ার পর সেখানে ক্লোরিনযুক্ত পানি (ব্লিচিং পাউডারের মিশ্রণ) অথবা স্যাভলন স্প্রে করতে হবে।বায়োগ্যাস উৎপাদন: গ্রামীণ বা আধা-শহুরে এলাকায় পশুর গোবর ও ভুঁড়ির বর্জ্য সরাসরি বায়োগ্যাস প্লান্টে দিয়ে চমৎকার জ্বালানি ও উন্নতমানের জৈব সার তৈরি করা সম্ভব।
গ) পরিবেশবান্ধব এনজাইম ও ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার:
• আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটিরিয়াল কালচার বা এনজাইম স্প্রে করা হয়, যা পশুর বর্জ্যকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গন্ধহীনভাবে গলিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসন এই আধুনিক স্প্রে ব্যবহার করতে পারে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই বছর স্থানীয় প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন এবং সাধারণ জনগণকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে। চামড়া সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারিভাবে সরাসরি চামড়া কিনে লবণ দিয়ে মজুত করার উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
কুরবানীর পর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও রোগমুক্ত রাখা ধর্মীয় ও নাগরিক—উভয় দিক থেকেই আমাদের অন্যতম বড় দায়িত্ব। ঢাকার মতো জনবহুল শহর বা গ্রামাঞ্চলে সরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে, নিজস্ব উদ্যোগে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করা জরুরি।
নিচে বর্জ্য অপসারণে ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে নিজ দায়িত্ব পালনের উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. জবাইয়ের আগে ও জবাইয়ের মুহূর্তের প্রস্তুতি:
• নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচন: যেখানে-সেখানে পশু জবাই না করে বাড়ির সামনে বা গ্যারেজে এমন একটি স্থান বেছে নিন যা সহজে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা যায়। সম্ভব হলে মাটির ওপর জবাই না করে ঢালাই করা পাকা মেঝেতে জবাই করুন।রক্তের জন্য গর্ত করা: পশু যেখানে শোয়ানো হবে, তার ঠিক নিচেই একটি ছোট গর্ত বা ড্রেনের ব্যবস্থা রাখুন, যেন রক্ত ছড়িয়ে না পড়ে সরাসরি এক জায়গায় জমা হয়।
২. বর্জ্য সংগ্রহ ও প্যাক করার সঠিক নিয়ম
• ভারী প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার: পশু কাটার সময় চামড়ার উচ্ছিষ্ট, চর্বি, ও ভুঁড়ির ভেতরের বর্জ্য সরাসরি মাটিতে না ফেলে বড় ও মজবুত প্লাস্টিকের ব্যাগে (Garbage Bag) সংগ্রহ করুন।ব্যাগ শক্ত করে বাঁধা: ব্যাগ ভর্তি হয়ে গেলে সেটির মুখ ভালো করে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিন। মুখ খোলা রাখলে কাক, কুকুর বা বিড়াল সেই বর্জ্য টেনে বের করে রাস্তাঘাট নোংরা করবে।নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলা: নিজ দায়িত্বে সেই বর্জ্যের ব্যাগটি সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারিত কন্টেইনার বা ডাস্টবিনে রেখে আসুন। ঘরের সামনে বা ড্রেনের পাশে ফেলে রাখবেন না।
৩. স্থানটি পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার বৈজ্ঞানিক উপায়:
পশু কাটার কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে স্থানটি পরিষ্কার করতে হবে। রক্ত শুকিয়ে গেলে তা দূর করা এবং দুর্গন্ধ দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
• প্রচুর পানি দিয়ে ধোয়া: প্রথমে রক্ত ও ময়লা পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ড্রেনে পাঠিয়ে দিন।ব্লিচিং পাউডার ও চুন ব্যবহার: ধোয়া শেষ হলে ভেজা জায়গার ওপর পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্লিচিং পাউডার অথবা কলিচুন (Slaked lime) ছিটিয়ে দিন। চুন ও ব্লিচিং পাউডার ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং দুর্গন্ধ হওয়া দ্রুত বন্ধ করে।অ্যান্টিসেপ্টিক স্প্রে: একটি বালতিতে পানি নিয়ে তাতে তরল ডেটল বা স্যাভলন মিশিয়ে পুরো জায়গায় স্প্রে বা ঝাড়ু দিয়ে দিন। এতে মাছি বা মশা বসবে না।
বিশেষ ঘোষনা: লন্ডন রোডের পেশ ইমাম জনাব মৌলানা মিস জামান গতবার শুক্রবারে জানিয়ে দিয়েছেন আর এলাকার একটু মাদ্রাসার জন্য তিনি কুরবানী পশুর চামড়া সংগ্রহ করবেন। আমার কোরবানির পশুর চামড়া উনার মাদ্রাসার জন্য সদকা করিব। আশা করি আমার প্রতিবেশী ও বানর হাউজে বসবাসকারীরা ও এ কিভাবে হুজুরের মাদ্রাসার চামড়া সদকা করিবেন। সকলকে অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা।