দেশে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা
পোস্ট ডেস্ক :
তিন মাসের ব্যবধানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার আবার বেড়েছে। ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা এবং বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বরং মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বা ৩২.৬২ শতাংশ। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক। সেজন্য আগের খেলাপি ঋণের সুদ যোগ হয়ে মোট পরিমাণ ও হার দুটোই বেড়েছে।
এর আগে ঋণ আদায় ও পুনঃতফসিল সুবিধার কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নবায়ন হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বেরে হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।
এর তিন মাস আগে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মোট ঋণের মধ্যে খেলাপির হার ছিল ৩৫.৭৩ শতাংশ। ওই সময় খেলাপির পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। মোট ঋণ স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা।
দেশের ইতিহাসে ২০১৯ সালের মার্চেই প্রথমবারের মত খেলাপি ঋণ লাখের ঘর পেরিয়ে এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা হয়। এর পর থেকে বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬ ভিত্তিক শ্রেণিকৃত ঋণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণ। অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এখন সমস্যাগ্রস্ত।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এক বছর আগে ২০২৫ সালের মার্চে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ২৪.১৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে এই হার বেড়েছে ৮.১৩ শতাংশ পয়েন্ট।
বর্তমান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে ৩২ টাকার বেশি এখন শ্রেণিকৃত। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ফেরত পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু ব্যাংকগুলোর জন্য নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের সতর্ক সংকেত। কারণ ব্যাংকিং খাতের প্রধান কাজ হলো আমানত সংগ্রহ করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেওয়া। কিন্তু ঋণের বড় অংশ আটকে গেলে নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা কমে যায়।
ব্যাংকারদের মতে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক বড় ঋণ আদায়যোগ্য অবস্থায় নেই। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ সুদের হার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতির কারণে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়ছেন। তৃতীয়ত, অতীতে দেয়া পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক ঋণ আবার খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়েছে। চতুর্থত, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এখনও উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা রয়েছে।




