ইসহাক আলীকে স্মরণ

Published: 16 June 2026

আনসার আহমদ উল্লাহ, লন্ডন, জুন ২০২৬:
১৯৭৮ সালে আলতাব আলীর বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ড পূর্ব লন্ডনের বাঙালি সম্প্রদায়ের জন্য নিঃসন্দেহে একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা ছিল। ১৯৭৮ সালে তরুণ বাঙালিরা, দীর্ঘদিনের ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক হামলা এবং এমনকি হত্যাকাণ্ডের পর ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এনএফ)-এর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এসব হামলার মধ্যে পূর্ব লন্ডনের রাস্তায় এক তরুণ বাঙালি শ্রমিক আলতাব আলীর হত্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে, অনেকে মনে করেন যে বাঙালি সম্প্রদায়ের ক্ষোভ শুধু আলতাব আলীর হত্যার কারণে নয়, বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই ঘটনার প্রতি যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, তার প্রতিও ছিল।

আলতাব আলীর হত্যার আগে, বাঙালি সম্প্রদায় নীরবে বর্ণবাদের শিকার হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৭৮ সাল পূর্ব লন্ডনের সমগ্র বাঙালি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বাধ্য করে। আর চুপ করে থাকা বা কিছু না করা তখন আর কোনো বিকল্প ছিল না। এশীয় সম্প্রদায় ধারাবাহিক আক্রমণের শিকার হচ্ছিল, এবং তারা ঘরে বসে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেনি।

বর্ণবাদী সহিংসতা এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ফলে ব্রিক লেন এলাকায় ব্যাপক পুলিশি উপস্থিতি দেখা যায়। রেস টুডে পত্রিকা রিপোর্ট করে, “উত্তর আয়ারল্যান্ডের পর, লন্ডনের ইস্ট এন্ড, বিশেষত ব্রিক লেনকে ঘিরে স্পিটালফিল্ডস এলাকা, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বেশি পুলিশি নজরদারির অধীন অঞ্চল। ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ সদস্যরা জোড়ায় জোড়ায়, প্রতি ৫০ গজ অন্তর, বেথনাল গ্রিন রোডের মোড় থেকে অল্ডগেটের মোড় পর্যন্ত পুরো ব্রিক লেন জুড়ে টহল দেয়।

১৯৭৮ সালে আলতাব আলীর হত্যাকাণ্ডই একমাত্র বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ড ছিল না। জুন মাসে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, স্থানীয় বাঙালিদের ওপর আরও সহিংস হামলা সংঘটিত হয়। এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী হ্যাকনিতে ৪৫ বছর বয়সী বাঙালি ইসহাক আলীর হত্যাকাণ্ডও ছিল। এসব ঘটনার ফলে পুরো গ্রীষ্মজুড়ে প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক সংগঠনের ঢেউ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাঙালি সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট গঠন করে ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে।

হ্যাকনি হামলা

২৫ জুন ১৯৭৮ সালে, ইসহাক আলীর ওপর হ্যাকনিতে নির্মম হামলা চালানো হয়। হামলায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং পরবর্তীতে সেই আঘাতের কারণে সৃষ্ট হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

২৫ জুন ১৯৭৮ সালের ভোররাত, আনুমানিক রাত ২টা ৩০ মিনিটে, ৪৫ বছর বয়সী ইসহাক আলী এবং তাঁর ২০ বছর বয়সী শ্যালক ফারুক উদ্দিনের ওপর ইসহাক আলীর বাড়ির কাছাকাছি উরসউইক রোডে তিনজন শ্বেতাঙ্গ যুবক হামলা চালায়। ইসহাক আলী নিকটবর্তী কুপারসেল রোডের ৬৫ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতেন।

সেদিন রাতে ইসহাক আলী হ্যাকনির ক্ল্যাপটন রোডে অবস্থিত পারিবারিক টেকঅ্যাওয়ে দোকানে ছিলেন। রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় তাঁর আত্মীয়, বড় ছেলে ফারুক উদ্দিনকে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সঙ্গে পাঠান।

হামলাকারীদের বয়স আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ছিল। তাদেরকে সাধারণ পোশাক পরিহিত এবং মাঝারি গড়নের, প্রায় ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি থেকে ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার শ্বেতাঙ্গ যুবক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রথমে একজন যুবক তাদের কাছে এসে সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার চায়, পরে টাকা দাবি করে। ইসহাক আলী ও ফারুক উদ্দিন তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই যুবক ইসহাক আলীকে লাথি মারে। অল্পক্ষণের মধ্যেই আরও দুইজন শ্বেতাঙ্গ যুবক তার সঙ্গে যোগ দেয় এবং তারা দুই বাঙালি ব্যক্তির ওপর হামলা চালায়।

ইসহাক আলী ও ফারুক উদ্দিনকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। একটি বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করতে জুতার ফিতা ব্যবহার করা হয়েছিল। পাঁচ সন্তানের জনক ইসহাক আলী হামলার পর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও, রাত ৩টা ৩২ মিনিটের দিকে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যু পূর্ব লন্ডনে বাঙালি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত বর্ণবাদী সহিংসতার এক মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

ইসহাক আলী

ইসহাক আলী ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে আসেন। তিনি পেশায় একজন টেইলার ছিলেন এবং পাশাপাশি ব্রিক লেনে একটি ফ্যাক্টরির মালিকও ছিলেন।

তাঁর জন্ম বাংলাদেশের সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার ফেনগ্রাম। ইসহাক আলীর স্ত্রী লতিফা আক্তার এবং তাঁর পাঁচটি ছোট সন্তান ছিল, শামিম, কবির, বাবর, জুবের এবং সোহেল । এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তানটির বয়স ছিল মাত্র নয় মাস, যখন তিনি নিহত হন।

তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি গভীর শোক ও সংকটে পড়ে। ১৯৭৮ সালের আগস্টে তাঁর মরদেহ নিজ গ্রাম, সিলেট, বাংলাদেশে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়।

ইসহাক আলীর কবর

ইসহাক আলী ছিলেন একজন উদ্যোক্তা। তাঁর ঢাকার গাউসিয়া মার্কেটে একটি পোশাকের দোকান, বিয়ানীবাজারে একটি শাড়ির দোকান ছিল এবং তিনি চট্টগ্রামেও কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজন, বিশেষ করে কাজিন ও ভাগ্নেদের, যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ইসহাক আলীর জন্ম ১৯৩৩ সালে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার ফেনগ্রামে। তিনি ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট; তাঁর একজন বড় ভাই এবং পাঁচজন বড় বোন ছিলেন।

বিবাহের পর তিনি প্রথমবার ১৯৬৫ সালে, ৩২ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে আসেন। শুরুতে তিনি ব্রিক লেনে একজন মেশিনিস্ট হিসেবে কাজ করেন এবং পরে নিজস্ব একটি লেদার ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেন। হ্যাকনিতে একটি বাড়ি কেনার পর তিনি ১৯৭৫ সালে তাঁর স্ত্রী ও তিন ছেলেকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তাঁদের আরও দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে।

তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ, যিনি পরিবারের উন্নতি ও সাফল্যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি বহু আত্মীয়কে স্পনসর করে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসেন এবং তাঁদের তাঁর ফ্যাক্টরিতে কাজের সুযোগ দেন। তিনি ছিলেন ফুটবলের প্রতি আগ্রহী একজন ব্যক্তি এবং বন্ধু ও পরিবারের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তাঁকে জানতেন এমন লোকেরা তাঁর ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ় সংকল্পের কথা উল্লেখ করতেন। অনেকেই মনে করতেন তিনি জীবনে বড় সাফল্যের জন্যই জন্মেছিলেন, তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে।

ইসহাক আলী (বায়ে ) তার পরিবারের সদস্যদের সাথে

দুঃখজনকভাবে, ইসহাক আলীর মৃত্যু পরিবারটির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। ১৯৮৪/৮৫ সালে তাঁর স্ত্রী লতিফা আক্তার স্ট্রোক করেন। চিকিৎসকেরা শুরুতে তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র কয়েক মাস বলে জানালেও তিনি অসাধারণ দৃঢ়তা ও ধৈর্যের মাধ্যমে বেঁচে থাকেন। তবে স্ট্রোকের কারণে তাঁর শরীরের ডান পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই কঠিন সময়ে লতিফা আক্তার-এর দুই বোন পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেন। তারা দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা , সন্তানদের বড় করা এবং অসুস্থ বোনের যত্ন নেওয়ার কাজে সহায়তা করেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে লতিফা আক্তার-এর মা তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর খানসহ বাংলাদেশ থেকে হ্যাকনিতে এসে পরিবারের সঙ্গে কয়েক বছর বসবাস করেন। লতিফা আক্তার ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

এই লেখকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সোহেল আহমেদ পরিবারের সম্পর্কে বলেন,
“আমার সব ভাইয়েরই বিয়ে হয়েছে এবং তাদের সন্তান আছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করি। আমার মনে হয়, এতে করে আমরা কিছুটা শান্তি খুঁজে পেয়েছি।”

লতিফা আক্তার তার পাঁচ ছেলের সাথে

পুলিশের প্রতিক্রিয়া

ইসহাক আলীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তের নেতৃত্বে থাকা ডিটেকটিভ চিফ সুপারিনটেনডেন্ট জর্জ অ্যাটারউইল টাইমস পত্রিকাকে বলেন যে, “এখানে উদ্দেশ্য ছিল চুরি,” অর্থাৎ এটি বর্ণবাদী ঘটনা নয় বলে ইঙ্গিত দেন। তবে পরিবারসহ অন্য অনেকেই এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত ছিলেন না। নিহত ইসহাক আলীর চাচাতো ভাই সফর উদ্দিন হ্যাকনি গ্যাজেটকে বলেন, “তার গায়ের রঙের কারণেই তাকে আক্রমণ করা হয়েছিল। এখানে কোনো টাকা-পয়সা নেওয়া হয়নি। ইস্ট এন্ডে এটা নিয়মিত ঘটছে।”

সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার পার্টির আলোক বিশ্বাস, যিনি পরিবারটিকে জানতেন, বলেন যে ফারুক, যিনি গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তাঁকে জানিয়েছিলেন যে শ্বেতাঙ্গ যুবকেরা দুই বাঙালিকে “পাকি বাস্টার্ড ” এবং “স্টিনকিং ব্ল্যাকস ” বলে গালাগাল করেছিল। আক্রমণকারীরা তখনই সরে যায়, যখন পাশ দিয়ে যাওয়া একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে এসে তাদের সাহায্য করেন। তাঁর হস্তক্ষেপ না থাকলে ফারুকও নিহত হতে পারতেন।

আলোক বিশ্বাস আরও উল্লেখ করেন যে ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকের পুলিশি বাস্তবতা ও সামাজিক পরিবেশ বিবেচনা করলে বর্ণবাদের ভূমিকা অস্বীকার করা কঠিন। তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে হ্যাকনিতে বসবাসকারী বাঙালিরা ধারাবাহিকভাবে বর্ণবাদী হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছিলেন, এবং কিছু হামলাকারী টাওয়ার হ্যামলেটস থেকে হ্যাকনিতে এসে আক্রমণ চালাচ্ছিল।

এর মাত্র এক মাস আগে, মে মাসে, আরেকটি বর্ণবাদী হামলায় আলতাব আলী নিহত হন, সেন্ট মেরি চার্চইয়ার্ডে। পরবর্তীতে (১৯৯৮) এই স্থানটির নামকরণ করা হয় আলতাব আলী পার্ক ।

এর দুই সপ্তাহ পর, হ্যাকনি গেজেটে প্রথম পাতায় “স্টেট অফ সিজ ফর আস – প্রটেস্ট এশিয়ান্স ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয় যে বোও এলাকায় তিনটি গাড়ি করে আসা যুবকদের দ্বারা আটজন বাঙালি পুরুষকে বিনা উস্কানিতে আক্রমণ করা হয়েছিল।

একই সময়ে, ন্যাশনাল ফ্রন্ট ব্রিক লেনে প্রতি সপ্তাহান্তে ব্যাপকভাবে সংবাদপত্র বিক্রি করে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছিল, যা স্থানীয় সম্প্রদায়কে ভয়ভীতি ও উস্কানির মুখে ফেলেছিল।

হ্যাকনি গেজেট

হ্যাকনি কাউন্সিল ফর রেশিয়াল ইকুয়ালিটির প্যাট্রিক কদিকারা হ্যাকনি গেজেটকে জানান যে সংখ্যালঘু জাতিগত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পুলিশের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতার প্রতি আস্থা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছিল। এর প্রেক্ষিতে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় প্রস্তাব করে যে একটি গঠনমূলক সমাধান হিসেবে বেশি সংখ্যায় কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা উচিত। পরবর্তী একটি সম্পাদকীয় এই অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।

অন্যদিকে, হ্যাকনি সাউথ অ্যান্ড শোরডিচ লেবার পার্টির রয় হিসকক এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেন যে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়কে রক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্যকে এমন মন্তব্যকারীরা খাটো করে দেখাচ্ছেন, যারা নিজেরা এই ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতা থেকে দূরে অবস্থান করেন। এদিকে কনজারভেটিভ প্রার্থী টিম মিলার সমাধান হিসেবে পুলিশের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং কঠোর শাস্তি প্রদানের পক্ষে মত দেন।

এই সব রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে, বাস্তবে কমিউনিটির অনেক সদস্যই নিজ উদ্যোগে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বেছে নেন।

শেষ পর্যন্ত এই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজন তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা অভিযোগ আনা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন জেমস মিচেল (১৭ বছর বয়স), যিনি ক্যামডেনের কেন্টিশ টাউন রোডের একজন ক্যাবিনেট মেকার ছিলেন, এবং হোমারটন এলাকার আরও দুইজন ১৬ বছর বয়সী কিশোর।

১৯৭৮ সালের ৩০ জুন ওল্ড স্ট্রিট কোর্টে তাদের জামিন দেওয়া হয়। জামিনের শর্ত হিসেবে তাদেরকে লন্ডনের বাইরে বসবাস করতে বলা হয়, এবং পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয় ৬ সেপ্টেম্বর।

পরবর্তীতে, ১৯৭৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে। তবে তারা হত্যা অভিযোগে নয়, বরং “এসোল্ট উইথ ইনটেন্ট টু হার্ম ” এবং “অ্যাকচুয়াল বডিলি হার্ম ”–এর জন্য দোষী প্রমাণিত হয়। প্রত্যেক অপরাধের জন্য তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা একই সাথে কার্যকর হয়।

টাইমস, ১ জুলাই ১৯৭৮

কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া

৩০ জুন তারিখে প্রায় ৩০০ জন মানুষ কালো পতাকা ও কালো আর্মব্যান্ড পরে ইসহাক আলীর ওপর হামলার স্থান থেকে হ্যাকনি পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত মিছিল করেন। এই প্রতিবাদ মিছিলটি সংগঠিত করে হ্যাকনি অ্যান্ড টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি। এই সংগঠন পরবর্তীতে ১৭ জুলাই একটি “ডে অফ একশন ” ঘোষণা করে।

১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে ইসহাক আলীর হত্যাকাণ্ডের পর হ্যাকনি টাওয়ার হ্যামলেটস প্রতিরক্ষা কমিটি গঠিত হয়েছিল। ছবি © হমার সাইকস

হ্যাকনি টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি

ইসহাক আলীর মৃত্যুর পর, ১৯৭৮ সালের পরবর্তী মাসে হ্যাকনির কর্মী ও টাওয়ার হ্যামলেটসের কর্মীরা একত্রিত হয়ে “হ্যাকনি ও টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি” গঠন করেন।

এই কমিটি গঠিত হয়েছিল হ্যাকনি কমিটি এগেইনস্ট রেসিজম এবং টাওয়ার হ্যামলেটস মুভমেন্ট এগেইনস্ট রেসিজম অ্যান্ড ফ্যাসিজম, এই দুই সংগঠনের একীভূত রূপ হিসেবে। এর নেতৃত্বে ছিলেন রেভারেন্ড কেন লিচ। এই উদ্যোগটি পূর্ব লন্ডনের বাঙালি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী সহিংসতা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৬ জুলাই ছিল দুই দিনের একটি কর্মসূচির সূচনা, যা সংগঠিত করেছিল হ্যাকনি অ্যান্ড টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি, হ্যাকনি ও টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিল ফর রেশিয়াল ইকুয়ালিটি এবং এন্টি নাজি লীগ । এই দিনে বর্ণবাদবিরোধীরা সকাল ১০টা ৩০ থেকে ব্রিক লেনে একটি সিট-ডাউন প্রতিবাদ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ন্যাশনাল ফ্রন্টকে তাদের সংবাদপত্র বিক্রি করতে বাধা দেওয়া।

পরদিন, ১৭ জুলাই, বাঙালি শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ধর্মঘট করেন। এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সমাবেশে বক্তারা প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ স্থানীয় শ্রমিকের বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য রাখেন, যা “ব্ল্যাক সলিডারিটি ডে ” হিসেবে বর্ণবাদী সহিংসতার বিরুদ্ধে এক যৌথ প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই ধর্মঘটে গ্রুনউইক এশিয়ান মহিলা ধর্মঘটকারী শ্রমিকরা, ফোর্ড ডাগেনহাম প্ল্যান্টের শ্রমিকরা এবং স্কুল শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। এটি পূর্ব লন্ডনে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের একটি বড় ও ঐক্যবদ্ধ প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

সেই দিনে হ্যাকনির প্রায় ৭০ শতাংশ এশীয় দোকান বন্ধ ছিল এবং অনেক শিশু স্কুলে যায়নি। ক্ল্যাপটন স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থী হ্যাকনি টাউন হলে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অংশ নেয়।

দিনটির শেষাংশে বেথনাল গ্রিন পুলিশ স্টেশনের বাইরে তিন ঘণ্টাব্যাপী একটি সিট-ডাউন – রাস্তায় অবস্থান – প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। এই বিক্ষোভ চলাকালে তিনজন প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ধর্মঘটের কারণে কার্যত ব্রিক লেন ও স্পিটালফিল্ডসের প্রায় পুরো এলাকা বন্ধ হয়ে যায়। হ্যাকনি অ্যান্ড টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটির প্যাট্রিক কদিকারা জানান, সংহতির অংশ হিসেবে প্রায় ৮০ শতাংশ এশীয় ও ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান দোকান বন্ধ ছিল।

১৯৭৮ সালের ২০ আগস্ট, হ্যাকনি অ্যান্ড টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি, আন্টি নাজি লীগ এবং বাঙালি যুব সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রায় ৫,০০০ মানুষের একটি বিশাল মিছিল সংগঠিত হয়। এই মিছিল পূর্ব লন্ডনের ইস্ট এন্ড জুড়ে ব্রিক লেন থেকে শুরু হয়ে সেন্ট মেরিস চার্চইয়ার্ড পর্যন্ত যায়—যা পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে আলতাব আলী পার্ক নামে নামকরণ করা হয়।

হ্যাকনি এক্টিভিস্টস

লাউডস্পিকার হাতে ভজন চ্যাটার্জী এবং একেবারে ডানদিকে হাততালি দিচ্ছেন অলোক বিশ্বাস। ছবি © পল ট্রেভর

হ্যাকনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মী ছিলেন আলোক বিশ্বাস, যিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একজন বাঙালি ছিলেন। তিনি হ্যাকনি অ্যান্ড টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন এবং একই সঙ্গে সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি এবং হ্যাকনি এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

আরেকজন কর্মী ছিলেন ভজন চট্টোপাধ্যায়, যিনি বাঙালি বংশোদ্ভূত এবং আলোক বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তিনি ১৯৮৫ সালে হ্যাকনি ব্ল্যাক ইউনাইটেড ফ্রন্টের অংশ ছিলেন। এছাড়াও তিনি হ্যাকনি এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন/এশিয়ান সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বিশেষ করে ১৯৮৩–১৯৮৫ সময়কালে, যখন ডালস্টন লেনে ওই কেন্দ্রটি চালু হয়।

লাউডস্পিকার হাতে অলোক বিশ্বাস এবং তাঁর বাঁদিকে চশমা পরে দাঁড়িয়ে আছেন প্যাট্রিক কডিকারা। ছবি © পল ট্রেভর

১৯৭৮ সালে হ্যাকনির আরেকজন কর্মী ছিলেন প্যাট্রিক কদিকারা, যিনি শ্রীলঙ্কার একজন নাগরিক ছিলেন। তিনি উত্তর হ্যাকনির নিউ রিভার ওয়ার্ডের লেবার কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি একই সঙ্গে হ্যাকনি কাউন্সিল ফর রেশিয়াল ইকুয়ালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং হ্যাকনি এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও হ্যাকনি ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট রেসিজম-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

হ্যাকনিতে বর্ণবাদীরা

প্রায় ১৯৭৮ সালের দিকে, চরম ডানপন্থী ও বর্ণবাদী ন্যাশনাল ফ্রন্ট হ্যাকনির কয়েকটি ওয়ার্ডে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশক জুড়ে যুক্তরাজ্যের বাঙালি সম্প্রদায়, বিশেষ করে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে বসবাসকারী মানুষরা, ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং তাদের স্কিনহেড গ্যাংদের দ্বারা সংগঠিত সহিংস বর্ণবাদী হামলার শিকার হন।

১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ন্যাশনাল ফ্রন্ট ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের সদর দপ্তর শোরডিচের ৭৩ গ্রেট ইস্টার্ন স্ট্রিটে স্থানান্তর করে, যার উদ্দেশ্য ছিল ইস্ট এন্ডে উত্তেজনা সৃষ্টি করা। প্রতি রবিবার তারা ব্রিক লেনের উত্তর প্রান্তে একটি স্টল বসাত, যেখানে তারা সংবাদপত্র বিক্রি করত, লিফলেট বিতরণ করত, সদস্য সংগ্রহ করত এবং বাঙালি বাসিন্দাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করত।

এর ফলে ১৯৭৮ জুড়ে লন্ডনের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে হ্যাকনি, থেকে বর্ণবাদবিরোধী কর্মীরা ব্রিক লেনে জড়ো হয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ফলে ব্রিক লেন নিয়মিত সংঘর্ষের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়।

একই সঙ্গে ন্যাশনাল ফ্রন্ট -এর হ্যাকনিতে সদর দপ্তর স্থানান্তরের বিরুদ্ধেও বর্ণবাদবিরোধী কর্মীদের শক্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

ন্যাশনাল ফ্রন্ট বাঙালি সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে কাজ করছিল। ব্রিক লেনে তাদের নিয়মিত রবিবারের উপস্থিতি এবং বর্ণবিদ্বেষ উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টার ফলে একটি ভয় ও শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তাদের প্রচারণা ও উগ্র বক্তব্য এলাকায় উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এবং কিছু স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দার মধ্যে বাঙালি জনগণের প্রতি বিরূপ মনোভাবকে আরও উসকে দেয়, যার ফলে বাঙালিরা ক্রমেই বৈষম্য ও সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়ে।

এই সাপ্তাহিক সমাবেশগুলো স্পষ্টভাবে ভয় দেখানো ও শত্রুতা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হতো। হয়রানি, ভাঙচুর এবং সহিংসতার মাধ্যমে ন্যাশনাল ফ্রন্ট বাঙালি পরিবারগুলোর মধ্যে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। যদিও স্থানীয় সব শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দা ন্যাশনাল ফ্রন্ট -কে সমর্থন করতেন না, তবে কিছু লোক তাদের অভিবাসীবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো এলাকায় ন্যাশনাল ফ্রন্ট বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করতে না পারলেও, তারা ব্রিক লেনের মতো স্থানে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি দৃশ্যমান উপস্থিতি বজায় রাখে—কখনও কখনও স্থানীয় বর্ণবাদী সহানুভূতিশীলদের সহায়তায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকায় ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যায়। এক পর্যায়ে তারা রবিবারের বাজারে আর উপস্থিত থাকেনি এবং হ্যাকনি কাউন্সিলের সঙ্গে গ্রেট ইস্টার্ন স্ট্রিটে তাদের সদর দপ্তর নিয়ে একটি আইনি বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৯ সালে হ্যাকনি কাউন্সিল NF-কে ওই ভবন ছাড়ার নোটিশ দেয়, কারণ এটি পরিকল্পনা অনুমোদনের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পরে ১৯৮০ সালের ১৩ মে, হ্যাকনি কাউন্সিল আদালতে এই লড়াইয়ে জয়ী হয় এবং ন্যাশনাল ফ্রন্ট -কে ৭৩ গ্রেট ইস্টার্ন স্ট্রিটকে তাদের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা হয়।

এর ফলস্বরূপ, ১৯৮১ সালের মধ্যে ন্যাশনাল ফ্রন্ট তাদের সদর দপ্তর স্ট্রেথামে স্থানান্তর করে।

মাইকেল ফেরেরার হত্যাকাণ্ড

১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে, স্টোক নিউইংটনে মাইকেল ফেরেরা নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে একজন কথিত ন্যাশনাল ফ্রন্ট সমর্থক প্রাণঘাতীভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পুলিশের উদাসীনতার কারণে, তাঁর আঘাত আরও গুরুতর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করা হয়।

১৯৭৮ সালের ১০ ডিসেম্বর, রবিবার ভোর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে, ১৯ বছর বয়সী ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান (গায়ানিজ) মেকানিক মাইকেল ফেরেরা হ্যাকনির স্টোক নিউইংটন হাই স্ট্রিটে তিনজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষের হাতে নিহত হন। মাইকেলের বন্ধুরা তাকে স্টোক নিউইংটন পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়, যা কাছেই ছিল। তারা রাত ২টার দিকে সেখানে পৌঁছায়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে পুলিশ তখন সাহায্যের পরিবর্তে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তারা কেন ওই সময় বাইরে ছিল তা জানতে চায়, অথচ মাইকেলের গুরুতর অবস্থার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।

অ্যাম্বুলেন্স আসতে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় লাগে, যদিও শোরডিচ অ্যাম্বুলেন্স স্টেশন সেখান থেকে দশ মিনিটেরও কম দূরত্বে ছিল। পরে তাকে সেন্ট লিওনার্ডস হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু ভোর ৪টার দিকে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ জনিত কারণে তিনি মারা যান। মাইকেল ফেরেরা ১৯৫৯ সালে গায়ানার স্ট্যানলিটাউন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে আসেন তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকার জন্য। তিনি হ্যাকনের ডাউনসভিউ স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৬ বছর বয়সে মেকানিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন একজন কিশোর।

১৯৭৮ সালের ২১ ডিসেম্বর ১৫০-এরও বেশি মানুষ একটি সভায় অংশ নেন, যেখানে মাইকেল ফেরেরার মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়।

প্রেক্ষাপট

১৯৭৮ সাল ছিল পূর্ব লন্ডনের কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় সম্প্রদায়ের জন্য এক অন্ধকার সময়। বর্ণবাদী সহিংসতায় চারজন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আলতাব আলী ও ইসহাক আলীর হত্যার আগে, ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে নিউহ্যামে নিজের বাড়ির কাছেই ১০ বছর বয়সী শিখ শিশু কেনেথ সিং নিহত হন।

এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো সেই সময়ের বর্ণবাদী সহিংসতা ও ভয়াবহ সামাজিক পরিবেশকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

কেনেথ সিং

১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে, নিউহ্যামে নিজের বাড়ির কাছেই ১০ বছর বয়সী শিখ শিশু কেনেথ সিং বর্ণবাদী সহিংসতায় নিহত হন। তাঁর মৃত্যু পূর্ব লন্ডন এবং আশপাশের এলাকায় চলমান বর্ণবাদী আক্রমণের ধারাবাহিকতার একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়, যা সেই সময়ে বাঙালি, এশীয় এবং কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়কে বারবার লক্ষ্যবস্তু করেছিল।

এই সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন ছিল—যেখানে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো নিয়মিতভাবে ভয়ভীতি, আক্রমণ ও বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছিল।

তবুও এই ট্র্যাজেডিগুলো থেকেই ব্রিটেনের আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তৃণমূল পর্যায়ের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্ম হয়। পরবর্তী প্রতিবাদ, ধর্মঘট ও সংগঠিত কর্মসূচিগুলো জনমনে বর্ণবাদী সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয় ও প্রগতিশীল শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতি আরও শক্তিশালী করে।

আজ আলতাব আলীর নাম ব্যাপকভাবে পরিচিত হলেও ইসহাক আলীর গল্প তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তাঁর জীবন ও মৃত্যুকে স্মরণ করা যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রাম এবং পূর্ব লন্ডনের বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায় গড়ে তোলা ও রক্ষার জন্য মানুষের ত্যাগকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।