তালেবানদের আমন্ত্রণ করে সমালোচনার মুখে ইইউ

Published: 23 June 2026

পোস্ট ডেস্ক :


ব্রাসেলসে তালেবান প্রতিনিধিদের আতিথেয়তা দেয়ার পরিকল্পনা করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। অধিকারকর্মী ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা সতর্ক করে বলেছেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে স্বাভাবিক স্বীকৃতি দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে যারা জনজীবন থেকে নারীদের সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছে এবং ষষ্ঠ শ্রেণীর পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।

এছাড়া এই প্রতিনিধিদলের মধ্যে এমন দুজন নেতা রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্রাসেলসে একটি বৈঠকে যোগ দিতে তালেবান প্রতিনিধিদলকে একদিনের জন্য পাঁচটি ভিসা দেয়া হয়েছে। সূত্রমতে, এই বৈঠকটি দ্রুতই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন গত জানুয়ারি থেকে আফগান অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া জোরদার করার বিষয়ে তালেবানের সাথে আলোচনা চালিয়ে আসছে বলে নিশ্চিত করার কয়েক সপ্তাহ পরই এই বৈঠকের খবর সামনে এল। তালেবান ২০২৪ সালে ঘরের বাইরে নারীদের কথা বলা ও মুখ দেখানো নিষিদ্ধ করেছে। তাদের সাথে ইইউ কর্মকর্তাদের এই সহযোগিতার মনোভাব ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত।

সোশ্যালিস্ট এমইপি হুয়ান ফার্নান্দো লোপেজ আগুইলার গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি অত্যন্ত জঘন্য একটি বিষয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশ্বাসযোগ্যতার চরম অবক্ষয়। তারা এভাবে দ্বিমুখী নীতি দেখাতে পারে না। তালেবানের দুজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছে। ইইউও এই শাসনের সাথে জড়িত বেশ কয়েকজন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। গত মে মাসে ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র জানান, ২০টি সদস্য রাষ্ট্র আইনি অনুমতিহীন বা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আফগানদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সুনির্দিষ্ট পথ তৈরির আহ্বান জানানোর পর, সুইডেনের সাথে সমন্বয় করে তালেবানের সাথে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। যারা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাদের কীভাবে ফেরত পাঠানো যায় তা নিয়েই এই আলোচনা হবে। তবে এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে লোপেজ আগুইলার অভিযোগ করেন, অভিবাসন নিয়ে উগ্র ডানপন্থীদের তৈরি করা এজেন্ডার কাছে ইউইউ নতি স্বীকার করছে।

তিনি বলেন, আমরা একসঙ্গে ৪৫ কোটি মানুষ। কিছু অভিবাসী যখন হতাশা বা সুযোগের অভাবে পালিয়ে আসে, তখন আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। নিপীড়নের শিকার হয়ে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা চাওয়া তাদের অধিকার। অভিবাসন কোনো হুমকি বা সংকট নয়, এটি মানব ইতিহাসের একটি অবিচ্ছিন্ন অংশ। ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর লাখ লাখ আফগান ইউরোপে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছে। পুরো মহাদেশ জুড়ে অভিবাসন নিয়ে কট্টর মনোভাব তৈরি হওয়ায় তাদের জীবন দিন দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির (আইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ ক্ষুধার্ত। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বাধার সম্মুখীন হওয়ায় নারীদের পরিস্থিতি সেখানে সবচেয়ে বেশি নাজুক। সংস্থাটির আফগানিস্তান বিষয়ক পরিচালক লিসা ওয়েন বলেন, যে দেশের অর্ধেক মানুষ নিজেদের খাবার জোগাড় করতে পারে না, সেখানে আফগানদের জোর করে ফেরত পাঠানো কোনো অভিবাসন নীতি হতে পারে না। এটি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার মতো একটি সিদ্ধান্ত। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে ৮৩টি আফগান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ইইউর কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান বর্তমানে নারীদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক স্থান। জোরপূর্বক ফেরত পাঠালে অনেকেই সহিংসতা, নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হবেন। সেন্টার ফর ইউরোপীয় পলিসি স্টাডিজের শাগোফাহ গাফোরি মনে করেন, খারাপ কিছু ঘটছে, যা হলো এই শাসনকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেয়া। তিনি বলেন, স্বাভাবিকীকরণের জন্য কোনো চুক্তির প্রয়োজন হয় না। এটি ধাপে ধাপে ঘটে ভিসা দেয়া, বৈঠকের কক্ষ বরাদ্দ করা এবং নীতির বদলে স্বার্থের চুক্তি করার মাধ্যমে। জাতিসংঘের গত বছরের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাকিস্তান ও ইরান থেকে যেসব আফগানকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, তারা সেখানে গিয়ে নির্বিচার গ্রেপ্তার, আটক ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গাফোরি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে জার্মানি থেকে কাতার হয়ে ২৮ জন আফগান নাগরিককে চার্টার্ড ফ্লাইটে ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে এই ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং অন্তত একজনকে পরবর্তীতে হত্যা করা হয়েছে।

ইইউ যদি এই নীতিতে আগায়, তবে জেনেবুঝেই তারা মানুষকে নির্যাতন সেল বা গণকবরের দিকে ঠেলে দেবে। আগস্ট ২০২৪ থেকে জার্মানি এ পর্যন্ত ১০০ এর বেশি আফগানকে ফেরত পাঠিয়েছে এবং অস্ট্রিয়াও এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। জার্মান গ্রিন পার্টির এমইপি হান্নাহ নিউম্যান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, এই পদক্ষেপ কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, এটি একটি কৌশলগত ভুলও বটে। তিনি বলেন, ইউরোপ যদি তরুণ আফগান পুরুষদের দারিদ্র্য ও চরম নিরাশার মধ্যে ফেরত পাঠায়, তবে তাদের টিকে থাকার জন্য শেষ পর্যন্ত তালেবান নেটওয়ার্ক ও মাদ্রাসার ওপরই নির্ভর করতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেককে ফেরত পাঠানো মানে তালেবানের হাতকে শক্তিশালী করা। স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কেবল সহিংসতার মাধ্যমে নয়, বরং নির্ভরশীলতা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টিকে থাকে। মানুষকে হতাশার মুখে ঠেলে দিয়ে আমরা তালেবানকে দুর্বল করছি না, বরং তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার ঝুঁকি নিচ্ছি।