লন্ডনে আল্লামা দুবাগী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর ষষ্ঠ বার্ষিক ঈসালে সাওয়াব মাহফিল সম্পন্ন

Published: 15 July 2026

পোস্ট ডেস্ক :


আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ, পীরে কামিল হযরত আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী ছাহেব কিবলাহ রাহমতুল্লাহ আলাইহির ষষ্ঠ বার্ষিক ঈসালে সাওয়াব মাহফিল রোববারে, লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ব্রিকলেন জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে।


আল্লামা দুবাগী রাহমতুল্লাহ আলাইহি ঈসালে সাওয়াব মাহফিল কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন তাঁর বড় ছাহেবজাদা আল্লামা জিল্লুর রহমান চৌধুরী দুবাগী।

মাহফিলে দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত পীর-মাশায়িখ, আলিম-উলামা এবং যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে রেকর্ড ভাঙা তীব্র গরম উপেক্ষা করে আল্লামা দুবাগী রাহমতুল্লাহ আলাইহির মুরীদীন, মুহিব্বীন ও সর্বস্তরের জনসাধারণ উপস্থিত ছিলেন।
আল্লামা দুবাগী ছাহেবের আলোকিত জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন, মিনহাজুল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল লন্ডন এর ডাইরেক্টর আল্লামা সাদিক কোরেশী আল-আজহারী, মুহিউল ইসলাম মসজিদের খতীব আল্লামা শের আহমদ বারকাতি, সাবেক মন্ত্রী আলহাজ শফিকুর রহমান চৌধুরী, লন্ডন দারুল হাদিস লতিফিয়ার সাবেক প্রিন্সিপাল মুফতি ইলিয়াস হোসেন, রাখালগঞ্জ মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবিবুর রহমান চাতকী, ইউকে আঞ্জুমানে আল-ইসলাহর সাবেক সভাপতি শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল জলিল, লন্ডন নিউক্রস জামে মসজিদের খতিব মাওলানা অলিউর রহমান চৌধুরী ছাহেবজাদায়ে দুবাগী, মাওলানা মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ছোট ছাহেবজাদায়ে দুবাগী, আল-হীরা মসজিদের খতীব আল্লামা সানাউল্লাহ ছেটি, এডমন্টন মসজিদের খতিব আল্লামা ক্বারী তারিক মাহমুদ, যুক্তরাজ্য আঞ্জুমানে আল-ইসলাহর সভাপতি মাওলানা নজরুল ইসলাম, লন্ডন মাজাহিরুল উলুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা এমদাদুর রহমান আল-মাদানী; লন্ডন বায়তুল আমান মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল মালিক, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা শফিকুর রহমান বিপ্লবী, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল কাদির সালেহ; লেস্টার দারুস সালাম মসজিদের খতিব হাফিজ মাওলানা আব্দুল জলিল, উলামা পরিষদ বিয়ানীবাজারের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আমিনুল ইসলাম জলঢুপী, লতিফিয়া উলামা সোসাইটির সভাপতি মাওলানা শিহাব উদ্দিন, ব্রিকলেন মসজিদের ইমাম হাফিজ মাওলানা মারুফ আহমদ, বার্মিংহাম ডারলিস্টন সুন্নি জামে মসজিদের খতিব অ্যাডভোকেট মাওলানা সালেহ আহমদ মনছুরী, ওল্ডহাম শাহ পরান মসজিদের খতিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম, কিংস ক্রস মসজিদের সাবেক খতিব মুফতি এহসান আহমদ, বাংলাদেশি ইসলামিক সেন্টার, লজেলস, বার্মিংহাম এর ইমাম ও খতিব, মাওলানা হুসাম উদ্দিন আল-হুমাইদি; এনফিলড মসজিদের খতিব মাওলানা আলী আহমদ, আল-ইসলাহ টাওয়ার হ্যামলেটস্ শাখার সাবেক সভাপতি মাওলানা আজিজুর রহমান, লন্ডন আল-ইসলাহ ডিভিশনের সহ-সভাপতি মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস।

মাহফিলে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা নুরুল ইসলাম, মাওলানা মুহিউস-সুন্নাহ চৌধুরী আল-আজহারী, মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন, হাফিজ মাওলানা ওয়াহিদ উদ্দীন সিরাজী, মাওলানা মুস্তফা কামাল, হাফিজ মতিউল হক, হাফিজ সাজ্জাদুর রহমান, হাফিজ নাজিম উদ্দিন, ক্বারী গোলাম আজম, ক্বারী হারুন আহমদ, ক্বারী সুফিয়ান বিল্লাহ প্রমুখ।
বক্তারা বলেন আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী ছাহেব রাহমতুল্লাহ আলাইহি প্রবাসে ইসলামী জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ আলেম, বিজ্ঞ মুফতি, সুদক্ষ সংগঠক, সফল শিক্ষক, ইসলামী লেখক এবং আধ্যাত্বিক পথপ্রদর্শক। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিম সমাজের মধ্যে একাধারে সুদীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দী যাবৎ দ্বীনি শিক্ষা, ইসলামী সংস্কৃতি ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ইসলামের সেবায় নিবেদিত ছিল। জ্ঞানার্জন থেকে শুরু করে জ্ঞান বিতরণ, মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে মানবিক ও সামাজিক নেতৃত্ব সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব।

আল্লামা দুবাগী (রহ.) এর ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ব্যক্তি প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দ্যোগও অপরিহার্য। তিনি ছিলেন ইউকে আঞ্জুমানে আল-ইসলাহর প্রতিষ্ঠাতা ও লন্ডন দারুল হাদীস লাতিফিয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ইউকে উলামা সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে আলেম সমাজকে একটি সুসংগঠিত প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা, নম্রতা এবং ঐক্যের চেতনা। তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকল ওলামা-পীর-মাশায়েকগণের সাথে সুসম্পর্ক রাখতেন।

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাঁর ছাত্র। শায়খুল হাদীস আল্লামা দুবাগী রাহমতুল্লাহ আলাইহি হাজারো ছাত্র তৈরী করেছেন, যারা আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত।

উস্তাযুল উলামা ওয়াল মুহাদ্দিসীন আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.) এর পাঠদান পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গবেষণামূলক। তিনি শুধু বইয়ের ব্যাখা দিতেন না; বরং বিষয়গুলোর পটভূমি, দলিল, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব প্রয়োগও তুলে ধরতেন। ফলে তাঁর ছাত্ররা কেবল পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য নয়, বরং একজন প্রকৃত আলেম হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেতেন। মাহফিলে অনেক ছাত্র স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন যে তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল, ধৈর্যশীল এবং প্রজ্ঞাবান শিক্ষক ছিলেন। কঠিন বিষয়গুলোও তিনি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করতে পারতেন।

যুক্তরাজ্যে মুসলিম অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের প্ৰয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। এই বাস্তৱতা আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দিন চৌধুরী দুবাগী (রহ.) গুরুত্ব ভূমিকা পালন করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে প্রবাসী মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী পরিচয় রক্ষা, নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং সমাজকে নৈতিকভাবে সুসংগীত করা অত্যন্ত জরুরী। এই লক্ষ বাস্তবায়নের জন্য তিনি বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামী কেন্দ্র এবং সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সংম্পৃক্ত হন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বহু ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয় এবং অসংখ্য মানুষ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করে।

মুনাযীরে আযম, আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.) এর ওয়াজ ও বয়ান ছিল দলিলসমৃদ্ধ হৃদয়গ্রাহী এবং বাস্তবমুখী। তিনি ধর্মকে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখতেন না, বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ইমলামের প্রয়োগের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন।

বাহরুল উলুম হযরত আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.) এর জ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ছিল তাঁর লেখনী। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তাঁর রচনাগুলোতে দেখা যায় গভীর গবেষণা, দলিলভিত্তিক আলোচনা, সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা, সমসাময়িক সমস্যার বিশ্লেষণ, এবং আকীদা ও আমলের বিশুদ্ধতার প্রতি গুরুত্ব প্রদান।
মুফতি হিসেবে মুফতীয়ে আযম হযরত আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.)এর গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যাপক। ইসলামী আইন, সমসাময়িক সমস্যা এবং সামাজিক নানা প্রশ্নে তিনি কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে সমাধান প্রদান করতেন। বিশেষ করে প্রবাসী মুসলিম সমাজে ঊদৃভুত নতুন নতুন সমস্যার ক্ষেত্রে তাঁর ফতোয়াগুলো ছিল বাস্তবসম্মত এবং শরিয়তের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি জটিল বিষয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত দিতেন না। বরং গবেষণা, পর্যালোচনা পূর্বসূরী ফকিহদের মতামত অধ্যয়ণ করে সুচিন্তিত মতামত প্রদান করতেন। এ কারণে সাধারণ মানুষ ও আলেমসমাজ উভয়ের কাছেই তাঁর ফতোয়া সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

একজন আলেমের প্রকৃত সৌন্দর্য তাঁর চরিত্রে প্রকাশ পায়। পীরে কামিল হযরত আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.) ছিলেন বিনয়, তাকওয়া, ইখলাস এবং সুন্নাহর অনুসরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি সর্বদা আল্লাহভীতি, আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের উপর গুরুত্ব দিতেন। মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত নম্র ও আন্তরিক। তাঁর সহচরে যারা এসেছেন, তাঁর আন্তরিকতা, উদারতা এবং আধ্যাত্মিক প্রভাবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কেবল জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং সেই জ্ঞানকে চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমে ব্যবহার করাই প্রকৃত সফলতা। তাঁর তিনজন সুযোগ্য সাহেবজাদা রেখে গেছেন। প্রবাদ আছে, বৃক্ষ কি, ফলে পরিচয়। তাঁর সন্তানগণ ও অত্যন্ত বিনয়ী।
২০২০ সালের ১০ জুলাই তিনি যুক্তরাজ্যে ইনতিকাল করেন। তাঁর ইনতিকালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শোকের ছায়া নেমে আসে। অসংখ্য ছাত্র, শুভানুধ্যায়ী আলেম ও সাধারণ মুসলমান তাঁর গভীরভাবে মর্মাহত হন। তবে প্রকৃতপক্ষে একজন আলেম কখনও সম্পূর্ণ বিদায় নেন না। তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান, ছাত্র, প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থ এবং আদর্শ তাঁকে মানুষের হৃদয়ে জীবিত রাখে। আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দিন চৌধুরী দুবাগী (রহ.)-এর ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। আজও তাঁর ছাত্ররা তাঁর শিক্ষা ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো পাঠ করা হচ্ছে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন উদ্যোগ সমাজকে উপকৃত করছে।
পরিশেষে মিলাদ পাঠান্তে দোয়া পরিচালনা করেন দুবাগী ছাহেবের সুযোগ্য বড় ছাহেবজাদা আল্লামা জিল্লুর রহমান চৌধুরী দুবাগী।