কিয়ার ষ্টার্মারের আসনে নির্বাচনকে ঘিরে কি জ্যাক পোলান্স্কির নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে?

Published: 8 October 2026

Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA

সংবাদ মাধ‍্যমগুলো যদিও সাধারণ নির্বাচনকে বেশী গুরুত্বের সাথে প্রচার করে, তবে বৃটিশ রাজনীতিতে উপ-নির্বাচন (By-election) হচ্ছে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা এবং দলের ভিত পরীক্ষা করার বড় মাপকাঠি। যখন কোনো প্রধানমন্ত্রী তাঁর পার্টির নিশ্চিত ও নিরাপদ আসনগুলো উপ-নির্বাচনে হারাতে শুরু করেন, তখন ব্যাকবেঞ্চ এমপি এবং দলের ভেতরে বিদ্রোহ শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করে। বৃটিশ রাজনীতির ইতিহাসে উপ-নির্বাচন বেশ কয়েকবার ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীদের পতনের চূড়ান্ত অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে Gorton & Denton উপ-নির্বাচনে ঐতিহ্যবাহী ‘লাল দুর্গ’ অর্থাৎ নিরাপদ আসনে গ্রীন পার্টির কাছে বিশাল ব্যবধানে পরাজয়ের পর লেবার দলের ভেতরে অসন্তোষের ফলে কিয়ার ষ্টার্মার তাঁর দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেন। সেই সাথে যোগ হয় স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবি । ফলস্বরূপ, ২০২৬-এর জুন মাসে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ২০২২ সালের জুন মাসে একই দিনে দু’টি উপ-নির্বাচনে (Tiverton & Honiton ও Wakefield) কনজারভেটিভ যথাক্রমে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের কাছে ও লেবার পার্টির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই জোড়া হার বরিস জনসনের নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতার ওপর বড় প্রশ্ন তোলে, সেইসাথে মন্ত্রীসভার গণপদত্যাগ ২০২২ এর জুলাইয়ে তাঁর চূড়ান্ত পদত্যাগের পথ তৈরি করে।

পদত‍্যাগ করা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার ষ্টার্মারের ছেড়ে যাওয়া সেন্ট্রাল লন্ডনের হোবোর্ণ অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্র‍্যাস (Holborn & St Pancras) আসনটিতে ৮ ই অক্টোবর উপ-নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই আসনে লেবার ক‍্যামডেন কাউন্সিলের

লিডার স্যাগাল আবদি-ওয়ালি, অন্যদিকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গ্রীন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আমি মনে করি, তিনটি কারণে ৮ তারিখের এই উপ-নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত: গ্রীন পার্টি এবং লেবার পার্টির মধ্যে এই প্রতিযোগিতাটি বহুলাংশে হবে এই দেশের বামপন্থী এবং মধ্য-বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যতের লড়াই। এমনকি বর্তমান বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নহামের উত্থানের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও লেবার দল যদি কোনো বড় শহরের মূল ঘাঁটিতে গ্রীন পার্টির চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে হিমশিম খায়, তবে এটি বুঝিয়ে দেবে যে, লেবার দলের মধ্যে বড় সমস্যা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পররাষ্ট্রনীতির ওপর এর এক বিশাল প্রভাব পড়বে। এন্ডি বার্ণহ‍াম প্রধানমন্ত্রী এবং এড মিলিব‍্যান্ড পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে আমরা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে, বিশেষ ক’রে পশ্চিম তীরে ঐতিহাসিক কিছু পরিবর্তন দেখেছি। কথা হচ্ছে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতিগত রদবদল হয়েছে বটে, কিন্তু মৌলিকভাবে পররাষ্ট্রনীতি খুব একটা বদলায়নি। বার্নহামকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিতে এবং সৌদি আরব সাম্রাজ্যকে সমর্থন জোগাতে দেখার পর আমরা সে কথা ভালোভাবেই বুঝতে পারছি।

তৃতীয়ত: লেবার দল যদি এখানে হোবোর্ণ অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্র‍্যাসে  বড় ব্যবধানে জয়ী হয়, তবে আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই একটি সাধারণ নির্বাচন দেখতে পারে বৃটিশ জনগণ।

এই আসনটি সেন্ট্রাল লন্ডনে অবস্থিত ও এটি  বেশ জটিল একটি আসন। সেন্ট্রাল লন্ডন হলো থ্যাচারইজম (Thatcherism) এবং ব্লেয়ারইজমের (Blairism) একেবারে আদর্শ উদাহরণ। এই এলাকার প্রধান সমস‍্যা হল পুঁজিবাদ বনাম সম্প্রদায় (capitalism vs conmunity)। এখানে রয়েছে নলেজ কোয়ার্টার ও এআই হাব। বায়োমেডিকাল গবেষণা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (যেমন DeepMind), ডেটা সাইন্স এবং টেকনোলজির জন্যে এলাকাটি আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, ইউরোপের সর্ববৃহৎ বায়োমেডিক‍্যাল ল‍্যাবরেটরি, গুগলের  ইউরোপীয় হেডকোয়ার্টার, ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টস – অনেক কিছুই এই এলাকায় অবস্থিত। তবে এই বারাকে প্রতিটি আবাসন এলাকায় (estate) মেরামত সংক্রান্ত বিশাল চাহিদা মেটানোর দিকে নজর না দিয়ে করপোরেট সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল হতে গেখা গেথে। বারার কাজের জন‍্যে তারা এখন বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর (global asset management companies) ওপর নির্ভর করছে। এই বারার  মডেলটি হলো একটি ‘ক্রস-সাবসিডি’ (cross-subsidy) মডেল, যেখানে কোনো একটি আবাসন এলাকা বা এস্টেট পুরো ভেঙে ফেলে নতুন ক’রে পুনর্নির্মাণ করা হয়, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই রাখা হয় ব্যক্তি মালিকানাধীন বা প্রাইভেট হাউসিং হিসেবে, যেটিকে অনেকে এক ধরণের ‘সামাজিক উচ্ছেদ’ বা ‘সোশ্যাল ক্লিনসিং’ বলে থাকেন।

এই উপ-নির্বাচনে লেবার পার্টির যিনি প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন, তিনি বারারই একজন কাউন্সিলার যিনি গত দু’বছর আবাসন খাতের দায়িত্বে ছিলেন যে সময়টিতে আবাসন  সংকট  আরও বেড়েছে । এছাড়া, গাজা সংকটের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে তিনি শুরু থেকেই গণহত্যার প্রতি কিয়ার স্টারমারের সমর্থনকে অন্ধভাবে সায় দিয়ে এসেছেন। অন‍্যদিকে গ্রীন পার্টির জ‍্যাক পোলান্স্কি  লন্ডন অ্যাসেম্বলির একজন সদস্য এবং গাজা ইস‍ু‍্যু ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তিনি বেশ সোচ্চার ভূমিকা রেখে আসছেন।

এখানে লেবার দলের প্রার্থী দিয়ে নীতি ঢাকার (The Face of the Action) চতুরতার কথা না বললেই নয়। সাগাল আবদি-ওয়ালিকে  লেবার দল মনোনয়ন দিল কেন? লেবার পার্টি তাদের মূল নব্য-উদারবাদী বা ডানপন্থী  নীতি অপরিবর্তিত রাখছে, কিন্তু জনগণ বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠী যাতে তাদের নীতির বিরোধিতা না করে, সেজন্য তারা ওই একই গোষ্ঠীর বা অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের (যেমন অশ্বেতাঙ্গ নারী, দাড়িওয়ালা মুসলিম) প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। লেবার পার্টি এদের সামনে রেখে তাদের নিজেদের ইমিগ্রেশন, সামাজিক বা পররাষ্ট্র নীতিগুলোকে এমনভাবে সাজায় যেন বাইরে থেকে মনে হয় এটি প্রগতিশীল বা অন্তর্ভুক্তিমূলক। লেবার পার্টি থেকে মনোনয়নপ্রাপ্ত সাগাল আবদি-ওয়ালির মত আরো একটি উদাহরণ শাবানা মাহমুদ। আমাদের মনে থাকার কথা, গিপটন অ্যান্ড হেয়ারহিলসে গ্রীন পার্টির প্রার্থী (যিনি একজন প্রাক্টিসিং মুসলিম) দাঁড়িয়ে যখন লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী এশিয়ান/মুসলিম ভোটব্যাংকে ধস নামিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান, তখন লেবার পার্টি নীতি না বদলে তাকে টেক্কা দেওয়ার জন‍্যে একই সংখ‍্যালঘু গোত্রের বাদামী ত্বকের দাড়ি আছে এমন আরেকজন  মুসলিম প্রার্থী নিয়ে আসে। অর্থাৎ, আসল নীতিগত সংস্কার না ক’রে কেবল “মুখচ্ছবি” হিসেবে অশ্বেতাঙ্গদের ব্যবহার করা লেবার পার্টির একটি ধান্ধাবাজ কৌশল।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, উপ-নির্বাচনের প্রচারণার সময় সাগাল  আবদি-ওয়ালি সাংবাদিকদের কাছে মুখ খুলতে অতিমাত্রায় সাবধানতা অবলম্বন করছেন। তাঁর আশেপাশের লোকজনই তাঁর হয়ে কথা বলছেন। তাঁকে হয়তো বেশী কিছু না বলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত সেই “মিং ভাস স্ট্র্যাটেজি” (Ming Vase Strategy) বা “মিং ফুলদানি কৌশল” অর্থাৎ সতর্ক থেকে কোনো ভুল বা বিতর্ক এড়িয়ে চলা যেন ফুলদানিটি ভেঙে না যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই আসনটি লেবার পার্টির একটি শক্ত ঘাঁটি, এটি জানার পরও গ্রীন পার্টির জ‍্যাক পলান্স্কি কেন এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন?  কারণ মূলত: দু’টো। প্রথমত: জ‍্যাক পোলানস্কি যদি উপ-নির্বাচনে হেরেও যান, তবুও একটি অত্যন্ত নিরাপদ লেবার আসনে লেবারের সাথে গ্রীনদের  ব্যবধান কমিয়ে আনাটাই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। দ্বিতীয়ত:  উপ-নির্বাচনের সময় হোবর্ণ অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্র‍্যাসে যে শক্তিশালী নির্বাচনী ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে, তাতে জ‍্যাক পোলানস্কি লন্ডনজুড়ে একটি শক্তিশালী নির্বাচনী পরিকাঠামো (campaign infrastructure), সক্রিয় কর্মী বাহিনী এবং বিপুল পরিমাণ ভোটারের ডেটাবেস তৈরি করতে পেরেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও কৌশলটি আগামী সাধারণ নির্বাচনে লন্ডনের হ্যাকনির মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে তাদের বড় ধরনের সুবিধা দেবে। এছাড়া জ‍্যাক পোলানস্কি নিজে এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক’রে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, কেবল হ্যাকনি নয়, মধ্য ও উত্তর লন্ডনের মতো হেভিওয়েট লেবার এলাকাতেও তারা মূল বিকল্প শক্তি হয়ে উঠেছে।

মজার বিষয় হলো, লেবার পার্টি অল্প ব্যবধানে জিতলে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এবং জ্যাক পোলানস্কি – উভয়ের জন্যই সুবিধে হবে।  আমরা লক্ষ‍্য করছি,, লেবার পার্টি এখনও অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দল হয়ে ওঠেনি। তিনি দলের নেতা এবং এড মিলিব্যান্ডের মতো ব্যক্তিরা নেতৃত্বে আসার ফলে কিছুটা ক্ষমতা পেয়েছেন সত্যি, কিন্তু দলীয় কাঠামোগত ব্যবস্থা (party machinery) এবং ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির (NEC) কথা বিবেচনা করলে, এটি এখনও মূলত কিয়ের স্টারমারের এরই লেবার পার্টিই রয়ে গেছে। একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ  লড়াইয়ের ফলাফল এন্ডি বার্নহামকে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার করার, কিংবা প্রার্থী বাছাইয়ের মতো বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে  লেবারের ডান ঘেঁষা অংশটির উপর প্রভাব  খাটাতে সাহায্য করবে। অন‍্যদিকে জ্যাক পোলানস্কি প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন এবং লন্ডনে একটি বেশ শক্তিশালী ক‍্যাম্পেইন দল গড়ে তুলছেন। এটি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে হ্যাকনিতে  তাঁর জন্য দারুণ সুবিধাজনক বা সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। কাজেই, লেবারের বিজয় যদি অল্প ব‍্যবধানে হয় তাহলে এন্ডি বার্নহ‍্যাম ও জ্যাক পোলোন্স্কি উভয়ের জন‍্যেই এই উপ-নির্বাচন একটি win win situation হতে পারে।

…………

লেখক Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার