কেন আলঝেইমার্সে আক্রান্তদের দুই-তৃতীয়াংশই নারী?

Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA
আলঝেইমার্স রোগ হলো মস্তিষ্কের এমন একটি ক্রমবর্ধিষ্ণু রোগ, যা ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তা করার ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন সাধারণ কাজকর্ম করার সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। যদিও ডিমেনশিয়ার বিভিন্ন ধরন রয়েছে, তবে বেশীরভাগ ডিমেনশিয়াই আলঝেইমার্স রোগের কারণে হয়। এই স্নায়বিক রোগে (neurological disorder) পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশী (দুই তৃতীয়াংশ) আক্রান্ত হন। সহজ কথায়, আলঝেইমার্সে আক্রান্ত প্রতি ১ জন পুরুষের বিপরীতে ২ জন নারী এই রোগে ভুগে থাকেন। বহুদিন ধরে বলে আসা হচ্ছিল, নারীরা বেশী দিন বাঁচে বলেই তাঁরা আলঝেইমার্স রোগে ভোগেন বেশী। তবে আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করতে পেরেছে যে, এই ধারণাটি সঠিক নয় এবং নারীদের জন্যে এটি মূল কারণও নয় – বরং গবেষণায় দেখা গেছে যে, কেবল নারী হওয়াটাই আলঝেইমার্স রোগের ঝুঁকি (risk factor) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের গঠন ও বয়সের সাথে সাথে এর পরিবর্তন – এসব বিষয়ে আলোচনা করার আগে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়াটা জরুরী। অনেকেরই ধারণা, নারী দেহের হরমোন বিশেষ ক’রে ইষ্ট্রোজেন কেবল একটি সেক্স হরমোন, এটির কাজ প্রজনন বা সন্তান জন্মদান। কিন্তু, নারীদেহের এই হরমোন কেবল প্রজনন বা সন্তান জন্মদানের সাথেই জড়িত নয়, বরং এটি নারীর মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে।

ইস্ট্রোজেন কেবল প্রজননের জন্যই নয়, বরং কোষ পর্যায়ে মস্তিষ্কের শক্তি উৎপাদনের জন্যে অত্যন্ত জরুরী। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইস্ট্রোজেন হরমোন নিউরনগুলোকে গ্লুকোজ বা শক্তি সংগ্রহ করতে উদ্দীপ্ত ক’রে সরাসরি মস্তিষ্কে শক্তি বা জ্বালানি সরবরাহ করে। শুধু তা-ই নয়, ইস্ট্রোজেন হরমোনটি নারীর মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রাখা থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখা এবং মস্তিষ্কে নতুন কোষের বৃদ্ধিতে উদ্দীপনা জোগায়। মোদ্দা কথা, এটি একটি নিউরোপ্রোটেক্টিভ বা স্নায়ু-সুরক্ষাকারী হরমোন, যা নারীদের মস্তিষ্ককে বিভিন্ন ক্ষতি থেকে রক্ষা ক’রে ঢাল হয়ে আগলে রাখে। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকলে মস্তিষ্কের শক্তিও বেশি থাকে, ইস্ট্রোজেন কমে গেলে নিউরনগুলোর কাজের গতি ধীর হয়ে যায়। শুধু মস্তিষ্ক নয়, হাঁড়ের সুরক্ষায়ও এই female hormone এর ভূমিকা অপরিসীম । সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি, একজন নারীর জন্যে female hormone, সেক্স বা সন্তান জন্মদান ছাড়াও কত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
জন্মলগ্নে নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের মধ্যে কৃত্রিম কোনো মৌলিক পার্থক্য (যেমন: গোলাপি বনাম নীল রঙ) নেই ঠিকই, তবে নারীর মস্তিষ্ক বয়সের সাথে সাথে ভিন্নভাবে বার্ধক্যের দিকে যায়, যেখানে মেনোপোজ বা ঋতুবন্ধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্ত থাকে এবং বয়সের সাথে সাথে এটি এতটাই ধীরে ধীরে কমে আসে যে, এই অতি ধীর গতিতে টেষ্টোষ্টেরন কমে আসার কারণে পুরুষদের শরীরে এই পরিবর্তন আসে মোটামুটি উপসর্গহীনভাবে। উল্টোদিকে, নারীর শরীরে থাকা ইস্ট্রোজেন হরমোন মেনোপোজ বা পেরিমেনোপোজে (মেনোপোজ হওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে) হঠাৎ ক’রে এত দ্রুত কমতে শুরু করে যা মোটেও উপসর্গহীন কোনো প্রক্রিয়া নয়।
Female hormones এর দ্রুত গতিতে কমে যাওয়ার কারণে নারীর মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড প্লাক বা আলঝেইমার্স প্লাক তৈরি হতে পারে, যা আলঝেইমার্স রোগের মূল লক্ষণ। সমবয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না। কাজেই নারীদেহে এ হরমোন কেবল সন্তান ধারণের হরমোন নয়, এটি একটি ‘ব্রেইন হরমোন’ যা মস্তিষ্ককে বিভিন্ন ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এখানে বলে নেওয়া প্রয়োজন, সব নারীর মস্তিষ্কে এই প্লাক তৈরি হয় না এবং প্লাক থাকা মানেই যে ডিমেনশিয়া হবে তা নয়; এটি কেবল একটি ঝুঁকি বা risk factor মাত্র)।
আলঝেইমার্স রোগটিকে সাধারণত বার্ধক্যের রোগ মনে করা হলেও, রোগের লক্ষণ প্রকাশের বহু বছর বা এক দশক আগে থেকেই এর নেতিবাচক পরিবর্তনগুলো দেখা যায়। এই পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে এগোতে থাকে, এবং মানুষ যখন ৭০ এর কোঠায় পৌঁছায় তখন গিয়ে এর ক্লিনিক্যাল লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।
নারীর মস্তিষ্ক সাধারণ কালানুক্রমিক বয়সের চেয়ে হরমোনজনিত পরিবর্তনের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল থাকে। সে জন্যেই মেনোপোজের আগে অপারেশন করে জরায়ুর সাথে ovary ফেলে দিলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় । যদিও চিকিৎসার প্রয়োজনে এই অপারেশন জরুরী হতে পারে, তবে এর পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেওয়ার উপায় জানা অত্যন্ত জরুরি।
ভুলে গেলে চলবেনা, মস্তিষ্ক শরীরের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ব্ল্যাক বক্স নয়; এটি শরীরের অন্যান্য অংশের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করে। বিশেষ করে প্রজননতন্ত্রের সাথে মস্তিষ্কের যোগাযোগ অত্যন্ত গভীর, আর এই যোগাযোগটি নিয়ন্ত্রিত হয় হরমোনের মাধ্যমে। মস্তিষ্ক এবং ovary উভয়েই ‘নিউরোএন্ডোক্রাইন সিস্টেম’-এর অংশ। অনেকেই মেনোপোজের উপসর্গ যেমন: হট ফ্লাশ, রাতে ঘেমে যাওয়া, অনিদ্রা – মেনোপোজের এই লক্ষণগুলোকে ovary বা ডিম্বাশয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করেন। কিন্তু এই লক্ষণগুলো ovary থেকে শুরু হয় না, এগুলো সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন হয়। এগুলো আসলে একধরনের স্নায়বিক বা নিউরোলজিক্যাল লক্ষণ। যেমন: হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus): এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ইস্ট্রোজেন এখানে সঠিকভাবে কাজ না করলে মস্তিষ্ক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যার ফলে হট ফ্লাশ বা গরম লাগার অনুভূতি হয়। তেমনি, ব্রেনস্টেম (Brainstem) ঘুম এবং জেগে থাকা নিয়ন্ত্রণ করে। ইস্ট্রোজেনের অভাবে ব্রেনস্টেম সঠিকভাবে কাজ না করায় ঘুমে সমস্যা বা অনিদ্রা দেখা দেয়। অ্যামিগডালা ও হিপোক্যাম্পাস (Amygdala & Hippocampus) যথাক্রমে মস্তিষ্কের আবেগ এবং স্মৃতিশক্তি ও অনুভূতির কেন্দ্র। এসব অঞ্চলে ইস্ট্রোজেন কমে গেলে মুড সুইং বা মেজাজ পরিবর্তন এবং ভুলে যাওয়ার মতো সমস্যা শুরু হয়।

মেনোপোজে সব কিছুই যেনেতিবাচক ঘটে এমন নয়। মেনোপোজে নারীদের বুদ্ধিমত্তা বা জ্ঞানীয় পারফরম্যান্স (cognitive performance)-এর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে, পুরুষ ও নারীর মধ্যে মানসিক দক্ষতায় কোনো পার্থক্য হয়না। অর্থাৎ, মেনোপোজ বা পেরিমেনোপেজে নারীরা ক্লান্ত বোধ করতে পারেন, কিন্তু তারা মানসিকভাবে তীক্ষ্ণ ও মেধাবী থাকেন।
মেনোপজের কিছু উপসর্গ কমাতে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি সহায়ক হতে পারে, তবে ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের জন্যে বর্তমানে চিকিৎসকরা এটিকে সরাসরি পরামর্শ দেন না, কারণ, বিজ্ঞানীরা বর্তমানে বিভিন্ন ফর্মুলেশন, ডোজ এবং এটি প্রয়োগের সময় নিয়ে গবেষণা করছেন, যা অদূর ভবিষ্যতে হয়তো চিকিৎসাপদ্ধতিতে নতুন দিক নির্দেশনা আনতে পারে। এই হরমোন থেরাপি ঢালাওভাবে ব্যবহার না করে case by case পর্যালোচনা করে এবং এর সময় ও ডোজ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সেই সাথে বছরে অন্তত ৩/৪ বার ফলোআপ করাও জরুরী। সবার জন্যে এই থেরাপি উপযুক্ত না-ও হতে পারে।
ওষুধের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অভ্যাস পরিবর্তন করে প্রাকৃতিকভাবে হরমোন এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে সুরক্ষা দেওয়া অনেকটাই সম্ভব। আমাদের খাওয়া-দাওয়া, ব্যায়াম, ঘুম এবং মানসিক চাপ- এই প্রতিটি বিষয় হরমোনের ওপর ভালো বা খারাপ প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, মেডিটেরিয়ান ডায়েট নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই ডায়েটের একটি বড় সুবিধে হলো, এতে প্রচুর পরিমাণে ‘ফাইটোইস্ট্রোজেন’ বা উদ্ভিজ্জ ইস্ট্রোজেন থাকে, যা শরীরে মৃদু ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে। তিসি বা ফ্ল্যাক্সসিড, তিল, শুকনো অ্যাপ্রিকট, বিভিন্ন ধরনের ডাল, ফলমূল এবং এমনকি গাঢ় বা কালচে রঙের চকোলেটেও এই উপকারী ফাইটোইস্ট্রোজেন পাওয়া যায় ।
ইস্ট্রোজেনের বড় শত্রু হলো মানসিক চাপ বা স্ট্রেস। প্রধান স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ (cortisol) ইস্ট্রোজেনের বিপরীতে কাজ করে। কর্টিসল বাড়লে ইস্ট্রোজেন কমে যায়, আবার কর্টিসল কমলে ইস্ট্রোজেন বাড়ে। তাই মানসিক চাপ কমানো কেবল মনকে শান্ত রাখে না, বরং মস্তিষ্কের সুরক্ষায়ও দারুণ কাজ করে।
সবার আগে নারীর মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন আনা জরুরী। মেনোপোজ নিয়ে কুসংস্কার ও ট্যাবোগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। এজন্যে নারীর জীবনসঙ্গীরও এসব আলোচনায় যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। কেবল আলঝেইমার্স নয়, সামগ্রিকভাবে নারীদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করতে হবে, কারণ “মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যই হলো নারীদের স্বাস্থ্য” (Brain health is women’s health)।
……………………………………..
লেখক Dr Zaki Rezwana Anwar FRSA, MBBS, DTM&H, MS, & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।





