যুক্তরাজ্যে ‘আমরা গাজীপুরবাসী’ সংগঠনের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান
‘স্বাধীনতার অতন্ত্র প্রহরী ভাস্কর্যের শহর গাজীপুর’

নিলুফা ইয়াসমীন হাসান, লন্ডন: যুক্তরাজ্যে বসবাসরত গাজীপুরবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ‘আমরা গাজীপুরবাসী ইউকে’-এর উদ্যোগে ২৫শে অক্টোবর রবিবার লন্ডনের মরপেথ স্কুলে এক বর্ণাঢ্য মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী এ আয়োজনে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত প্রায় আড়াইশত গাজীপুরবাসী তাঁদের পরিবার-পরিজনসহ অংশগ্রহণ করেন। প্রবাসে একখণ্ড গাজীপুরের আবহ সৃষ্টি করে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় আনন্দ, উৎসব ও এক প্রাণের মেলায়।
প্রধান সংগঠক ব্যারিস্টার মাহারুন আহমেদ মালার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও
পরিচালনায় আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন এমদাদ তালুকদার এমবিই, মাহফুজা রহমান, মো. ইসমাইল হোসেন, মাজহারুল হক বাবু, ইঞ্জিনিয়ার সাকির আহমেদ, মিছবাহ খান, মুজিবুর রহমান সরকার, হাসিব সম্রাট, ব্যারিস্টার খোরশেদ আলম, ড. তুষার চৌধুরী, নাজমুল হক খান, ব্যারিস্টার মো. জাহিদুল আবেদীন, মিহির মোঃ মুহিবুজ্জামান, সৈয়দ আফজাল হোসেন, খালেদা জামান পূর্ণি ও রুহুল আমিন বিলাল।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর প্রধান সংগঠক ব্যারিস্টার মাহারুন আহমেদ মালা স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের উদ্দেশ্য, গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি প্রবাসে বসবাসরত গাজীপুরবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সৌহার্দ্য ও ঐক্য বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিকড়ের পরিচয় তুলে ধরার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এমদাদ তালুকদার এমবিই। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মো. ইসমাইল হোসেন ও মিছবাহ খান। বক্তারা সংগঠনকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য এবং সকলের মাঝে ঐক্য অটুট রাখার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। গাজীপুরের উন্নয়নে কি পদক্ষেপ নেয়া যায় এবং শিক্ষাখাতে কি ভূমিকা রাখা যায় সে ব্যাপারে পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন এমদাদ তালুকদার এমবিই।
মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন নতুন প্রজন্মকে ইউকের মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আহবান জানান। ‘আজকের আয়োজন শেকড়ের প্রতি ভালবাসা’ – বক্তব্যে উল্লেখ করেন মিছবাহ খান।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সিনিয়র সাংবাদিক আবু মুসা হাসান। গাজীপুর সম্পর্কে তিনি স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য রাখেন। বিশেষ করে তাঁর বক্তব্যে মহান মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুর তথা জয়দেবপুরের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৯শে মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ লড়াই শুরু হয়। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের জন্মও এই জেলায়।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন সত্যবাণীর বার্তা সম্পাদক নিলুফা ইয়াসমীন হাসান।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিশিষ্ট জনদের লেখাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য যা গাজীপুরে অবস্থিত সেই ‘স্বাধীনতার অতন্ত্র প্রহরী’ ভাস্কর্য দিয়ে একটি চমৎকার প্রচ্ছদসহ স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়েছে। স্মরণিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বিশিষ্ট কবি মাহফুজা রহমান। স্মরণিকার পরিকল্পনা ও প্রকাশনা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এমদাদ তালুকদার এমবিই, ব্যারিস্টার মাহারুন আহমেদ মালা, মো. ইসমাইল হোসেন ও ইঞ্জিনিয়ার সাকির আহমেদ।
এ ছাড়া সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ মাজহারুল হক বাবু অনুষ্ঠান পরিচালনায় আয়-ব্যয়ের হিসাব ও ইঞ্জিনিয়ার সাকির আহমেদ অনুষ্ঠানস্থল ও ভেন্যু ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন।
মিলনমেলা উপলক্ষে এমডি মুজিবুর রহমান সরকারের নেতৃত্বে শিশু-কিশোর ও উপস্থিত সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিশেষ কেক কাটা ও ফটো সেশনের আয়োজন করা হয়। এ পর্বে সহযোগিতা করেন মিছবাহ খান, নাজমুল হক খান, রুহুল আমিন বিলাল ও হাসিব সম্রাট।
কেক কাটা উপলক্ষে নজমুল হক খানের রচিত ও সুর করা ‘শুভ শুভ দিন আজ, প্রাণের গাজীপুর, আজকের দিন আনন্দের দিন, দেশ থেকে দূরে, তবু হৃদয়ে বাংলাদেশ আছে সবার মনে’ গানটি পরিবেশন করা হয় যা কেক কাটা পর্বটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
শিশু-কিশোরদের জন্যও ছিল বিশেষ আনন্দ আয়োজন। ব্যারিস্টার খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে শিশুদের পর্ব পরিচালিত হয়। এ কাজে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার মো. জাহিদুল আবেদীন, সৈয়দ আফজাল হোসেন ও নাজমুল হক খান। শিশুদের জন্য বিভিন্ন বিনোদনমূলক ও অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। এতে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
সাংস্কৃতিক পর্ব ছিল উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। খালেদা জামান পূর্ণির চমৎকার সঞ্চালনায় ও মাহফুজা রহমান, তৌকি জাওয়াদ ও ড. তুষার চৌধুরীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও পরিচালনা করা হয়।
রুবাইয়াৎ শারমিন ঝরার পরিচালনায় ‘বাফা ইউকের’ পরিবেশনায় ‘বাঙালি আমরা বাঙালি’, ‘ও আমার বাংলাদেশ’, বর্নমালা ও প্রিয় বর্নমালা সইতে পারিনা তোমার অপমান’ এবং মাহফুজা রহমানের লেখা ‘নতুন এক বৈরাগী আমি’ গানের সাথে মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন করেন রাজিয়া আখতার পাপড়ি, মনিরুল ইসলাম মুকুল, সুপতি পল, রুবিনাক আলভী রাইসা কথা এবং রাবেয়া রহমান ঝিলিক।
সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন তৌকি জাওয়াদ, মুস্তফা কামাল মিলন, ব্যারিস্টার অলিভা হোসাইন ও খালেদা জামান পূর্ণি।
প্রবাসের মাটিতে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এমন পরিবেশনা উপস্থিত
সবার মধ্যে আনন্দ ও আবেগের সঞ্চার করে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণীয় পর্ব ছিল র্যাফেল ড্র ও পুরস্কার বিতরণ। হাসিব সম্রাটের নেতৃত্বে এ পর্ব পরিচালিত হয়। তাঁকে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার খোরশেদ আলম, ব্যারিস্টার মো. জাহিদুল আবেদীন, মুজিবুর রহমান সরকার ও নাজমুল হক খান।
ব্যারিস্টার মাহারুন আহমেদ মালা, সৈয়দ আফজাল হোসেন, নাজমুল হক খান ও রুহুল আমিন বিলাল প্রাণবন্ত পরিচালনায় শেকড়ের সন্ধানে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি বিনিময়ের সুযোগ পান। পরিচয় পর্বে বক্তব্য রাখেন, কেমিস্ট খন্দকার আব্দুর রহমান, ফজলে রাব্বানী সাজ্জাদ, এম. এ. কাশেম চৌধুরী এবং অ্যাডভোকেট এম. খানসহ অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অতিথিদের আপ্যায়ন ও মধ্যাহ্নভোজের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সুশৃঙ্খলভাবে খাবার পরিবেশনের নেতৃত্ব দেন কোষাধ্যক্ষ মাজহারুল হক বাবু এবং তাঁকে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার মো. জাহিদুল আবেদীন, মিছবাহ খান, সৈয়দ আফজাল হোসেন ও রুহুল আমিন বিলাল।
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত গাজীপুরবাসীদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আনন্দ, আড্ডা, স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের শিকড়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার এক অনন্য প্রয়াস হিসেবে
অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে ‘আমরা গাজীপুরবাসী’র মিলনমেলা।

উল্লেখ্য, গাজীপুর জেলা এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল, যার রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সিটি কর্পোরেশন। গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ তুলা গবেষণা ইন্সটিটিউট অবস্থিত। এতদ্ব্যতীত বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানাও গাজীপুর জেলায় অবস্থিত, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কারাগার কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারও গাজীপুরে অবস্থিত।
১৭৩৩ সালে পর্তুগিজ পাদ্রিরা এ অঞ্চলেই প্রথম বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, অভিধান এবং গদ্যের বই রচনা ও মুদ্রণ করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালিরা প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
জেলা প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ তৎকালীন জয়দেবপুর মহকুমাকে উন্নীত করে ‘গাজীপুর’ নামে পূর্ণাঙ্গ জেলা ঘোষণা করা হয়। এর আগের প্রাচীন নাম ছিল ‘জয়দেবপুর’।
কাপাসিয়ার তিব্বাদী গ্রামে বিশ্বখ্যাত অতি সূক্ষ্ম ‘মসলিন’ কাপড় উৎপাদিত হতো, যা এককালে সারা বিশ্বে সমাদৃত ছিল। বর্তমান সময়ে গাজীপুর দেশের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) শিল্পকেন্দ্র।
বিশ্ব ইজতেমা: টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জমায়েত।
ঐতিহাসিক স্থাপনা ও রাজবাড়ি: ব্রিটিশ আমলের ভাওয়াল জমিদার বংশের ভাওয়াল রাজবাড়ি, বলধার জমিদার বাড়ি, এবং বলিয়াদী জমিদার বাড়ি এই জেলার ঐতিহ্য বহন করে।
দর্শনীয় স্থান: ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক।





