কূটনীতিতে দেশের অসামান্য অর্জন

Published: 2 October 2020, 4:45 PM

।। রাশেদ মেহেদী।।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিশ্বনেতার সম্মান পেয়েছেন। শেখ হাসিনা এ সম্মান অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্ব সংকট মোকাবিলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় নেতৃত্বের ভূমিকা রেখে দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে।

বিশ্নেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল এবং ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ যেভাবে বিশ্বে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, সেটাই এ দেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন, অগ্রগতি, মানবিকতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের অনেক দেশের সামনেই রোল মডেল। এটি সম্ভব হয়েছে তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও দৃঢ় কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের পর বাংলাদেশের শাসনভার কাঁধে নিয়ে শান্তি ও প্রগতির রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন সামনে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- বিশ্ব শান্তির পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই অমোঘ নীতিই এখনও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। এ মূলমন্ত্রের ওপর ভর করে সব বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা, প্রতিটি পদে পদে রচিত হচ্ছে সফলতার ইতিহাস।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্যের ইতিহাসের ধারা তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই। সে সময় তার দৃঢ়তায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিই ছিল দেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় অর্জন। একই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পন্ন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। বিশ্বজুড়ে যখন দিকে দিকে জাতিগত সংঘাত প্রবল হয়ে উঠেছিল, সে সময়ে বাংলাদেশে এমন একটি শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

২০০৯ সালে পুনরায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে থাকা অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধানেও উদ্যোগী হন। তার দৃঢ়তায় বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়। বছরে পর বছর ছিটমহলের বাসিন্দা হয়ে থাকা হাজারো মানুষ রাষ্ট্রীয় ঠিকানা পান। বিশ্বে এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি বিতর্কেরও সমাধান হয়। মিয়ানমারের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে জিতে সমুদ্রসীমা জয় করার পর ভারতের সঙ্গেও সমুদ্রসীমা নিয়ে অমীমাংসিত অধ্যায়ের অবসান হয়। সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সমুদ্রভিত্তিক ব্লু-ইকোনমির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় দেশের সামনে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফল অর্থনৈতিক কূটনীতির কারণেই বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধির অনন্য অধ্যায়ে প্রবেশ করে। উন্নীত হয় নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের সামনে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ যেভাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে, তা বিশ্বসভায় প্রশংসিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় বক্তব্যও তাকে বিশ্বনেতার মর্যাদায় স্বীকৃত করেছে। সংঘাত বন্ধ করে শান্তির সপক্ষে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্চকিত কণ্ঠ তাকে বিশ্বজুড়ে নন্দিত নেতা হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্য সম্পর্কে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান  বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সদ্ভাব রেখে ভারসাম্যের কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এর সুফলও পাচ্ছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে চীন-ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া, চীন-জাপান এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব আর লুকোছাপার বিষয় নয়। বাংলাদেশ এ পাঁচ প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সংহত অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতার সম্পর্কও গড়ে তুলতে পেরেছে। এটি অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান ও দক্ষতার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতিতে উন্নত দেশে পরিণত হবে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, মূল্যস্ম্ফীতি কমেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসামান্য কূটনৈতিক সাফল্যে বাংলাদেশ এখন খাদ্য নিরাপত্তা, শান্তিচুক্তি, সমুদ্রবিজয়, নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে অনুকরণীয়।

ওয়ালিউর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত দশ বছরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, ন্যামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় করণীয় বিষয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। পদ্মা সেতু তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের পক্ষপাতদুষ্ট নীতির প্রতি নতিস্বীকার না করে বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্র ‘স্ট্র্যাটেজিক প্লেয়ার’ হিসেবে সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এ ছাড়া মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জন্য একটি আদর্শ হিসেবে উপনীত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকে এটিকে ব্যাহত করার প্রয়াস ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট আন্তর্জাতিক আইনের পরিমার্জন ও পরিবর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, কম কথায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসামান্য অর্জনের কথা বলা সম্ভব নয়। কারণ তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন একটা বিপুল সম্ভার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিশ্বনেতার সম্মান পেয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল এবং ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ যেভাবে বিশ্বে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দেশ ও জাতি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, সেটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে অর্জন।

তিনি বলেন, বিশ্বে যে মুহূর্তে বাণিজ্যিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতি জটিল আকার ধারণ করেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কূটনীতির কারণেই তখন বাংলাদেশ সব পক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফোরামের নেতৃত্বে এসেছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গাকে জরুরি আশ্রয় দিয়ে প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ধনী রাষ্ট্রগুলোর সমতুল্য নাও হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ মানবিকতায় অনেক এগিয়ে। এজন্য মানবিক কূটনীতির পথপ্রদর্শক হিসেবে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক পরিম লে স্বীকৃত হয়েছেন।