মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন......২০২০
কে হচ্ছেন বিশ্বনেতা ট্রাম্প না বাইডেন ?

Published: 29 October 2020, 8:01 AM

স্টাফ রিপোর্টার : আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রতিদ্বন্ধি জো বাইডেন প্রচারণার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন।

দুই প্রার্থীই ভোটারদের মন আকৃষ্ট করতে নানা পন্থা অবলম্বন করছেন। এরই মধ্যে ডাক যোগে দুই প্রার্থীর পক্ষে অনেক ভোট পড়লেও প্রার্থীরা বাকী ভোটারদের মন জয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। তারা প্রচারণায় মাত্রায় নতুন নতুন বিষয় তুলে ধরছেন। তবে ভোটারগণ কাকে এবারের নির্বাচনে ভোটাধিকারের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু বুঝা যাচ্ছে না। তবে এবার ডাক যোগে ভোটদানের প্রথা অন্যান্য বারের তুলনায় বেশি। অনেকে বলেছেন, গেল ১’শ বছরের চেয়ে এই প্রথা এবার বেশি ব্যবহার করছেন ভোটারগণ। তাই ভোটের ফলাফল নিয়ে এখনো কেউ কিছু বলছেন না। অনলাইন ভিত্তিক জরিপ একেবার একেকজনের পক্ষে দিচ্ছে। তাই শেষ পর্যন্ত মার্কিন নির্বাচনে কে হচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প না জো বাইডেন তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ফলাফলের আগ পর্যন্ত।
৬ কোটি ৪০ লাখ ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ : মার্কিন নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগেই ৬ কোটি ৪০ লাখ ভোটার ইতিমধ্যে ভোট দিয়ে ফেলেছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ১২টিরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক রাজ্যের, যেগুলো শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে যে নির্বাচনে কে জিতবে। যুক্তরাষ্ট্রে এই রাজ্যগুলো পরিচিত ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট নামে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০১৬ সালে সালে অর্ধেকেরও বেশি ব্যাটলগ্রাউন্ডগুলোতে মোট যত ভোট পড়েছে, ইতিমধ্যে তার থেকেও বেশি ভোটার ইতিমধ্যে অগ্রিম ভোট দিয়েছেন। জাতীয়ভাবে ভোটাররা ২০১৬ সালের মোট ভোটের ৪৬ শতাংশ ভোট ইতিমধ্যে অগ্রিম দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ও ডেমোক্রাট দলীয় ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী কমলা হ্যারিস অগ্রিম ভোট দিয়েছেন। করোনা মহামারীর কারণে, অনেক রাজ্যই ভোটের নিয়ম পরিবর্তন হয়েছে। লাখ লাখ লোক প্রথমবারের মতো মেইলে ভোট দেয়ার সুযোগ নিয়েছে। অনেকেই নির্বাচনের দিন ভোটারদের প্রত্যাশিত চাপ এড়াতে প্রথম দিকে ব্যক্তিগতভাবে ভোট দিয়ে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষে ও বিপক্ষে ভোটারদের উৎসাহ সারা দেশে রেকর্ড-স্তরের অগ্রিম ভোট প্রদানে উৎসাহ দিয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা অগ্রিম ভোট দেয়ার বিষয়ে আরও আগ্রহী বলে দেখা যায়। পাঁচটি ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেটে নিবন্ধকরণের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনও পর্যন্ত রিপাবলিকানদের চেয়ে প্রায় ২০ লাখ বেশি নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট সমর্থক ভোট দিয়েছেন। পেনসিলভেনিয়ায় রাজ্যে, যেখানে ২০১৬ সালে ট্রাম্প জিতেছিলেন, সেখানেও রিপাবলিকানদের তুলনায় তিনগুণ বেশি ডেমোক্র্যাট সমর্থক ভোট দিয়েছেন। ফ্লোরিডা এবং উত্তর ক্যারোলিনাতেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। জনবহুল টেক্সাসের প্রারম্ভিক ভোট, যা রিপাবলিকানদের ঘাঁটি বলে পরিচিত, সেটিও ক্রমবর্ধমান অ-শেতাঙ্গ ভোটারের কারণে এ বছর প্রতিযোগিতামূলক হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে সেখানে ২০১৬ সালের মোট ভোটের ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আর অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, নেভাডা এবং উত্তর ক্যারোলাইনাতে ভোট চার বছর আগে মোট যত ভোট পড়েছিল তার ৬০ শতাংশের বেশি অগ্রিম ভোট পড়েছে।
আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি : মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি অ্যামি কোনে ব্যারেটের নিয়োগ চূড়ান্ত করলো সেনেট, যেটাকে নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৫২-৪৮ ভোটে রিপাবলিকানরা এই নতুন বিচারপতি নিয়োগ নিশ্চিত করেন। হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে বিচারক হিসেবে অ্যামি কোনে ব্যারেট তার শপথ নেন। এই নিয়োগ সামনের দিনগুলোতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হবে। তার এই নিয়োগের বিপক্ষে ভোট দেয়া একমাত্র রিপাবলিকান হচ্ছেন সেনেটর সুশান কলিন্স। মেইনের পুনঃনির্বাচনে তিনি কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে যাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোনয়ন দেয়া সুপ্রিম কোর্টের তৃতীয় বিচারপতি অ্যামি কোনে ব্যারেট। এর আগে ২০১৭ সালে নেই গোরসাচ এবং ২০১৮ সালে ব্রেট কাভানাকে মনোনয়ন দেন তিনি। গত মাসে ফেডারেল আপিল বিভাগের বিচারক রুথ ব্যাডার গিন্সবার্গ মারা যান বিচারপতিদের একটি পদ শূন্য হয়। ডেমোক্র্যাটরা দাবি করেন, ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যারা জিতবেন তারাই বাছাই করবেন নতুন বিচারক। সিনেটের ভোটাভুটির আগে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার বলেন তারা লড়াই থামাবেন না। কিন্তু তাদের কাছে এই নতুন বিচারক নিয়োগ থামানোর কোনো উপায় ছিল না।
পেনসিলভ্যানিয়ায় নির্বাচনী প্রচারনা থেকে ফিরেই বিচারক ব্যারেটের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ লনে আয়োজিত হয় এই শপথ অনুষ্ঠান। ঠিক এক মাস আগে প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিচারক হিসেবে অ্যামি কোনি ব্যারেটের নাম ঘোষণা করা হয়। যার পরপরই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমেরিকার জন্য একটা ঐতিহাসিক দিন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের জন্য ও সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ আইনের শাসনের জন্য এটা বিশেষ কিছু।’ তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন নিয়ে যারা পড়ালেখা করেছেন তাদের মধ্যে ব্যারেট সবচেয়ে মেধাবীদের একজন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তিনি দারুণ কাজ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস তার নতুন সহকর্মীর শপথ পাঠ করান।
আগামী দিনে বেশ কয়েকটি ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন বিচারপতি ব্যারেট। যার মধ্যে একটি অ্যাফর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট, যা ওবামার আমলের একটি স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত আইন। এটি ওবামাকেয়ার নামেও পরিচিত। এছাড়া ১৯৭৩ সালে পুরো আমেরিকায় গর্ভপাত সম্পর্কিত যে আইন পাশ হয়েছিল সেটাও বাতিল হতে পারে এই বিচারপতির আমলে। বিচারপতি ব্যারেটের আগের নানা লেখালেখি থেকে এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন লিবারেলরা। নর্থ ক্যারোলিনা ও পেনসিলভ্যানিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যালট ভরার সময়সীমা নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই নতুন বিচারপতিকে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট উইসকনসিন রাজ্যে নির্দিষ্ট সময়সীমার পরে ভোটগ্রহন বাতিল করেছে। এই রাজ্যও হোয়াইট হাউজে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা ওয়েবসাইট ‘হ্যাকড’: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গত দুই সপ্তাহ আগে বড় দুই প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান দেখা গিয়েছিল ক্রমেই তা কমে আসছে। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বদলে যাচ্ছে সব জরিপের ফল। গত দু’দিনেই কয়েক সপ্তাহের জরিপের বিরাট পরিবর্তন ঘটছে।
এদিকে ভোটের মাত্র এক সপ্তাহ আগে ‘অল্প সময়ের জন্য’ হ্যাকড হয়েছে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা ওয়েবসাইট। সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম।
বেহাত হওয়ার পর ফড়হধষফলঃৎঁসঢ়.পড়স সাইটটিতে একটি পপড ম্যাসেজে দেখা যায়, যেখানে লেখা ছিল- “এই সাইটটি জব্দ করা হয়েছে।” সেখানে আরও লেখা ছিল-প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্পের দ্বারা বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন যথেষ্ট ভুয়া খবর ছড়িয়েছে।”
ওয়েবসাইট হ্যাকড হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে ট্রাম্পের প্রচারণার মুখপাত্র টিম মুর্তোফ জানিয়েছেন, খুব দ্রুতই সাইটের নিয়ন্ত্রণ হাতে আনা হয়েছে এবং কোনো স্পর্শকাতর তথ্য বেহাত হয়নি।
ওয়েবসাইটটি মূলত ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার বিস্তারিত তথ্য ও তহবিল সংগ্রহ করার কাজে ব্যবহার করা হয়।
মুর্তোফ বলেন, “ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন ওয়েবসাইট ঢেকে গিয়েছিল। আক্রমণের উৎস তদন্ত করে দেখার জন্য আমরা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছি।”
ম্যাসেজে হ্যাকাররা আরও দাবি করেছে যে, তাদের হাতে ট্রাম্প ও তার আত্মীয়স্বজনের অনেক গোপন তথ্য আছে। এসব তথ্যের প্রকাশ চাইলে একটি ঠিকানায় ডিজিটাল মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠানোর আহ্বান জানানো হয় হ্যাকারদের পক্ষ থেকে।
জরিপে বাইডেনের কাছাকাছি ট্রাম্প : নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে, ততোই হিসাবও পাল্টে যাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহের জরিপেও পরিবর্তন ঘটছে। জর্জিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডায় বাইডেনের কাছাকাছি এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেনসিলভেনিয়ায় নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ঘনঘন সমাবেশ করছেন ট্রাম্প। মিশিগানেও ট্রাম্পের অবস্থান ক্রমান্বয়ে দৃঢ় হচ্ছে। সোমবার প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
জরিপকারি সংস্থাগুলো এখন আগাম ভোটের গতি-প্রকৃতি নজরে রেখেছে। কারণ, ২০১৬ সালের নির্বাচনে যত আগাম ভোট পড়েছিল তার চেয়ে ১৩৩% বেশী ভোট পড়েছে সোমবার পর্যন্ত। এ সংখ্যা ৬ কোটি ২৭ লাখ ভোট জমা হয়েছে ডাকযোগে এবং আগাম ভোট কেন্দ্রে। অথচ এখনও নির্বাচনের বাকি ৬ দিন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আতংকে প্রায় সকলেই আগাম ভোটকে নিরাপদ ভাবছেন।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডাকযোগে ভোট এবং আগাম ভোটের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-কারচুপির জিকির তুললেও তিনি নিজে যেমন আগাম ভোট দিয়েছেন, একইভাবে ডেমক্র্যাটদের সাথে পাল্লা দিয়ে রিপাবলিকানরাও লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে বলা হয়েছে, ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আগাম ভোট কেন্দ্রে যত মানুষ এসেছিলেন, সে সংখ্যা ২০১৬ সালের মোট সংখ্যার সমান। এরপর অতিবাহিত হলো আরো চারদিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ লাইনে ভোট দিচ্ছেন ডেমক্র্যাটদের স্টেট নিউইয়র্কেও। অনেক আগে সিটিজেনশিপ নেয়া সত্বেও যারা আগে ভোট কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী ছিলেন না তেমন বাংলাদেশী তথা দক্ষিণ এশিয়ানদেরকেও শতশত ভোটারের লাইনে দেখা যাচ্ছে নিউইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাসে। ট্রাম্পের অভিবাসন বিরোধী নানা পদক্ষেপে অতিষ্ঠ হয়ে সকলেই বাইডেনের পক্ষে মাঠে নেমেছেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিসকে রানিংমেট করায় ডেমক্র্যাটদের প্রতি এশিয়ানরাও ঝোকে পড়েছেন বলে সকলের ধারণা। আগাম ভোটের এ ধারা ৩৮ স্টেটেই ১ নভেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে ২০১৬ সালের মোট ভোট ১৩ কোটি ৯০ লাখকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে নির্বাচন-বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বাইডেনের কাছাকাছি উঠতে থাকায়। সোমবার পর্যন্ত টেক্সাসে বাইডেনকে ছাড়িয়ে গেছেন ট্রাম্প। জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, মিশিগানেও কাছাকাছি এসেছেন ট্রাম্প। পেনসিলভেনিয়ায় বাইডেনের চেয়ে বেশী ভোট পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প। এরফলে গত নির্বাচনের মত এবারের চূড়ান্ত নির্বাচনের পর সকল হিসাব পাল্টে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা প্রকাশ করছেন।
উল্লেখ্য, ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ১৩টি স্যুইয়িং স্টেটেই বাইডেন এগিয়ে ছিলেন। করোনায় বিপর্যস্ত আমেরিকানদের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ‘করোনা স্টিমুলাস বিল’ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ডেমক্র্যাটদের নানা বাহানায় অতিষ্ঠ স্বল্প আয়ের মানুষ আর ছোট ও মাঝারি তহবিলের ব্যবসায়ীরা। বেকার ভাতার পরিমাণ নিয়ে দর-কষাকষিতে ডেমক্র্যাটরা অনড় থাকায় এখন পর্যন্ত একটি পেনীও পেলেন না অসহায় মানুষেরা।
উল্লেখ্য, গত মার্চে করোনা রিলিফ বিল অনুযায়ী ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে একেকজন ৬০০ ডলার করে পেয়েছেন ফেডারেল তহবিল থেকে। সাথে যোগ হয়েছে স্টেট থেকে দেয়া অর্থ। অর্থাৎ একেকজন কমপক্ষে ৮০০ ডলার করে পেয়েছেন প্রতি সপ্তাহে। কিন্তু ডেমক্র্যাটরা আগস্ট থেকে পুনরায় একইহারে বেকার ভাতার বিল পাশ করেন প্রতিনিধি পরিষদে।
অপরদিকে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেট চাচ্ছিল সপ্তাহে সর্বোচ্চ সাড়ে চারশত ডলার। প্রথমে তারা তিনশত ডলারের প্রস্তাব দেয়। এরপর ডেমক্র্যাটদের সাথে দর-কষাকষির এক পর্যায়ে সাড়ে চারশত ডলারে সম্মত হয়েছিলেন। ডেমক্র্যাটরা অনড় থাকায় সে আলোচনা ভেস্তে গেছে। এর দায় বর্তাচ্ছে ডেমক্র্যাটদের ওপর। নির্বাচনে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। গত নির্বাচনে নারী হিসেবে আমেরিকানদের অধিকাংশই (ডেমক্র্যাটসহ) হিলারি ক্লিন্টনকে পছন্দ করেননি। আর এবার স্প্যানিশ আর কিউবান কৃষ্ণাঙ্গদের বড় একটি অংশ বাইডেনকে পছন্দ করছেন না। ওবামার সাথে টানা ৮ বছর ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকেও অবৈধ অভিবাসীদের জন্যে কার্যত: কিছুই করেননি বাইডেন-এ অভিযোগ ক্রমে চাঙ্গা হচ্ছে নির্বাচনের ময়দানে। সর্বশেষ বিতর্কে ট্রাম্পও একই ঘটনার অবতারণা করেছিলেন। যদিও করোনা মহামারিকে যথাযথভাবে মোকাবেলায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প-এ বিষয়টি ভোটারের মধ্যে সদা জাগ্রত রয়েছে।
ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা অবশ্য মনে করছেন হাউজের মত ইউএস সিনেটের কর্তৃত্ব এবার ডেমক্র্যাটদের কাছে যেতে পারে। এমন অবস্থা তৈরী হলে ট্রাম্পের পক্ষে নির্বাহী আদেশ জারি কিংবা সুপ্রিম কোর্টের মুখাপেক্ষী হয়েই কাজ করতে হবে। সর্বশেষ এ্যামি কোনি ব্যারেট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে শপথ নেয়ায় ট্রাম্পের অনুসারি বিচারকরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন।
এদিকে, করোনার কারণে আগাম ভোটের পরিধি এবার প্রসার করা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ইউনিভাসিটি অব ম্যারিল্যান্ড পরিচালিত জরিপে রেজিস্টার্ড ভোটারের ৬০% আগাম ভোটের পক্ষে কথা বলেছিলেন। একইসাথে, ইচ্ছা করলেই যে কেউ ডাকযোগেও ভোট দিতে পারছেন এবার। নিউ হ্যামশায়ার, উইসকনসিন, আরিজোনা, আইওয়া স্টেটও ডাকযোগে ভোটের প্রথা চালু করেছে এবার। এর ফলে নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণকারি স্টেটসমূহেও ইতিমধ্যেই ৩ কোটি ৪ লাখ ভোট জমা হয়েছে।
এদিকে, ভারত ও বাংলাদেশের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বিদ্যমান সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ানদের মধ্যে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে। অর্থাৎ বিজেপি এবং আওয়ামী লীগের অনুসারি মার্কিন নাগরিকেরা ডেমক্র্যাট হলেও রিপাবলিকান ট্রাম্পকে ভোটদানের কথা ভাবছেন বলে একাধিক জরিপে উদঘাটিত হয়েছে। এক্ষেত্রে কমলা হ্যারিসের ব্যাপারটি গৌণ হয়ে পড়ছে। তবে এ সংখ্যা প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণে কোন প্রভাব রাখবে বলে কেউ মনে করছেন না। কারণ, ভোটের সংখ্যায় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকানরা একেবারেই নগন্য।
টেক্সাসে বাইডেনের নাটকীয় উত্থান : শতাব্দীর সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে। মহাশূন্য থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ভোটে অংশগ্রহণ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। তবে সবার চোখ এখন দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে। ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও নর্থ ক্যারোলিনায় ভোটযুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি জো বাইডেন এগিয়ে আছেন- তা জানতে উদগ্রীব মানুষ। নতুন নতুন জরিপে কী আভাস মিলছে, তা নিয়ে ভোটারদের কৌতূহল কমছেই না। এই তিন রাজ্যের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে টেক্সাস রাজ্য। সেখানে জনমত জরিপে নাটকীয়ভাবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেন এগিয়ে গেছেন। এটি রিপাবলিকান অধ্যুষিত রাজ্য হিসেবেই খ্যাত।
দোদুল্যমান রাজ্যগুলো নিয়ে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড ট্র্যাকার’ জরিপ পরিচালনা করেছে সিবিএস নিউজ। প্রচারের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এ জরিপে দেখা যায়, ফ্লোরিডায় বাইডেন তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে দুই পয়েন্ট এগিয়ে আছেন। উত্তর ক্যারোলিনায় বাইডেন চার পয়েন্টে এবং জর্জিয়ায় দু’জনই সমানে সমান। নির্বাচনের আর বাকি মাত্র আট দিন।
এ জরিপে বৈচিত্র্যময় বিষয়ে ভোটারদের প্রশ্ন করা হয়েছে। তার মধ্যে করোনা, অর্থনীতি, নেতৃত্বের ধরন, প্রার্থীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বেশিরভাগ ট্রাম্প সমর্থক মনে করেন যে বাইডেন জিতলে দেশটি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার রূপ নেবে। আবার বাইডেনের সমর্থকরা আশঙ্কা করেন, ট্রাম্প আবার বিজয়ী হলে তিনি স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ পরিচালনা করবেন।
জরিপে দেখা যায়, বাইডেন করোনাভাইরাস প্রশ্নে দারুণভাবে এগিয়ে আছেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পে আস্থা রেখেছেন ৫০ শতাংশ মানুষ। সেখানে বাইডেনের পক্ষে আছেন ৪৩ শতাংশ। ফ্লোরিডায় ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চান ৪৮ শতাংশ ভোটার। বাইডেনকে চান ৫০ শতাংশ। জর্জিয়ায় সমান সমান। নর্থ ক্যারোলিনায় বাইডেন ৫১ এবং ট্রাম্প ৪৭।
২০১৬ সাল থেকে ভোটারদের মধ্যে কী বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে, তার বিশ্নেষণ করেছেন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক কাবির খান্না। তিনি জানান, ২০১৬ সালের তুলনায় বাইডেনের পক্ষে শ্বেতাঙ্গ ভোটার বেড়েছে। সেই সময় ট্রাম্প এই তিনটি রাজ্যেই দ্বিগুণ শ্বেতাঙ্গ ভোট পেয়েছিলেন। এখন বাইডেন উত্তর ক্যারোলিনায় এগিয়ে আছেন। ফ্লোরিডায় চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। জর্জিয়ায় ট্রাম্পের শ্বেতাঙ্গ ভোট নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাইডেন বর্তমানে ফ্লোরিডা এবং উত্তর ক্যারোলিনায় কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গ নারীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছেন। জর্জিয়ায় কলেজ ডিগ্রিবিহীন শ্বেতাঙ্গ ভোটার পুরুষ ও নারী উভয়েই ট্রাম্পকে পছন্দ করেন।
সিবিএস নিউজের সাংবাদিক এলেনা কক্স জানান, ফ্লোরিডায় কালো ভোটারদের মধ্যে বাইডেনের সমর্থন ৯২ শতাংশ। জর্জিয়া ও উত্তর ক্যারোলিনায় বাইডেনও পাচ্ছেন হিলারি ক্লিনটনের মতোই কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন। এলেনা কক্স জানান, এই রাজ্যেগুলোর শহুরে অঞ্চলগুলো বাইডেনের পক্ষে। অপেক্ষাকৃত গ্রামীণ অঞ্চলগুলো ট্রাম্পের পক্ষে। শহরতলির কম বয়সী এবং অশ্বেতাঙ্গরা বেশিরভাগ ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিচ্ছেন এবং প্রবীণ শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা আগের মতোই ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন।
নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রহমান শফিক বলেন, আগাম ভোট এবং ভোট রেজিস্ট্রেশনের সময় নানা প্রশ্ন বিশ্নেষণ করে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বিষয় নিয়েও মানুষের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। এবার প্রচুর আগাম ভোট পড়লেও অর্ধেকের মতো মানুষ এখনও ভোট দিতে যাননি। তাই এই জরিপের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত মনে করার কিছু নেই। তিনি মনে করেন, এবার যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন, তিনি খুব অল্প ব্যবধান নিয়ে হোয়াইট হাউসে যাবেন।
টেক্সাসেও নাটকীয়ভাবে এগিয়ে বাইডেন : টেক্সাসে ১৯৭৬ সালের পর এখন পর্যন্ত জয় পাননি কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। কিন্তু ভোটের মাত্র আট দিন আগে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, বাইডেন এখানে ট্রাম্পের চেয়ে তিন পয়েন্টে এগিয়ে গেছেন।
ডালাস মর্নিং নিউজ এবং ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস ও টাইলার পরিচালিত জনমত জরিপে দেখা গেছে, সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ বাইডেনকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিপরীতে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৪৫ শতাংশ। চলতি মাসের ১৩-২০ তারিখের মধ্যে পরিচালিত এ জরিপে অংশ নেন এক হাজার ১২ জন। জরিপে ভুলের হার ধরা হয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। বাইডেন জয়ী হলে টেক্সাসের ৩৮টি ইলেকটোরাল ভোট যাবে তার থলিতে। গত সেপ্টেম্বরেও এখানে দুই পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন ট্রাম্প।
প্রচারণায় মূল ইস্যু করোনা : আজকের দিন মিলিয়ে আর বাকি ঠিক এক সপ্তাহ বা ৬ দিন। এরপরই আগামী ৩রা নভেম্বর এ গ্রহে সবচেয়ে কঠিন নির্বাচনী রণ। সেই রণে যোদ্ধা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্রেট দলের জো বাইডেন। দিন যত সামনে এগোচ্ছে, ততই শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে শিহরণ। এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাইরের দেশগুলোর জন্যও তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কারণ, এই নির্বাচনের ওপর পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্ক নির্ভর করছে। এমন অবস্থায় করোনাভাইরাস নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রগতি করেছেন।
কিন্তু তা যেন ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন জো বাইডেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, করোনা মহামারির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন ট্রাম্প। এরই মধ্যে করোনা মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ২ লাখ ২৫ হাজার মানুষ মারা গেছেন। এমন পাল্টাপাল্টির মধ্যে তাদের নজর এখন সুইং স্টেটগুলোর দিকে। আগামী ৬ দিন সে সব রাজ্যেই তারা প্রচারণা কেন্দ্রীভূত রাখবেন বলে দৃশ্যত মনে হচ্ছে। এবার করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে এক বিরল পরিস্থিতিতে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ৩রা নভেম্বরে ভোটকেন্দ্রে বিপুল সংখ্যক ভোটারের ভিড় এড়িয়ে যেতে ভোটাররা নিজেরাই সচেতন হয়েছেন।