আমলাবাবুর বিদেশভ্রমণ, লাগে টাকা দেবে জনগণ

Published: 7 December 2020

।। গৌতম হোড় ।।


পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় ‘নবান্ন’আজব একখানা কল বানিয়েছিল বটে বিলিতি শাসকেরা৷ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা৷ এককথায় সিস্টেম৷ সেই সিস্টেমে সবই চলে৷ দিল্লিতে একটা চালু কথা আছে, ভারত শাসন করা হয় মূলত রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে দুই দিকে ছড়ানো সাউথ ও নর্থ ব্লক থেকে৷ কারণ, সাউথ ব্লকে বসেন প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী৷ আর নর্থ ব্লকে স্বরাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রী৷ এই দুই ভবনে ছড়ানো তাঁদের মন্ত্রণালয়৷ রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বৃত্তাকার দুই কিলোমিটারের মধ্যেই বাকি সব মন্ত্রণালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অফিস৷ সব মিলিয়ে ভারত সরকারের মূল কেন্দ্র৷ তবে ক্ষমতার প্রধান করিডর হলো সাউথ ও নর্থ ব্লক৷ আর এখানে কান পাতলেই শোনা যাবে একটা ইংরাজি শব্দ, সিস্টেম৷ সরকার চলে সিস্টেমে৷ ব্রিটিশরা চলে গেলে কী হবে, তাঁরা যে জবরদস্ত সিস্টেম দিয়ে গিয়েছে, তার মাহাত্ম্য ৭৩ বছর পরেও একচুল কমেনি৷ যাঁরা এই সিস্টেম ভাঙতে যান, তাঁদের কপালে বিপত্তি ছাড়া আর কিছু জোটে না৷ আর এই সিস্টেমে মন্ত্রীরা অস্থায়ী, বছর পাঁচেক বা তার আগেই তাঁরা বদলে যান৷ স্থায়ী হচ্ছেন বাবুরা মানে সরকারি আমলা৷ সঙ্গে আছেন কেরানীকুল৷ আছেন নীচুতলার কর্মীরা৷ সিস্টেমের জগদ্দল পাথর বয়ে চলেছেন তাঁরাই৷

সেই সিস্টেমের পরতে পরতে আছে সরকারি আমলাদের সুবিধা পাওয়ার গল্প৷ কম কাজ করে বা যে কাজ করলে সুবিধা পাওয়া যায়, সেই কাজ করে দেয়ার কাহিনি৷ বিনিময়ে তাঁদের বিদেশ সফর বাঁধা৷ আবার অনেক সময় কিছু সৎ ও গোঁয়ার অফিসার থাকেন, যাঁরা উপরওয়ালার মৌখিক নির্দেশ মেনে কোনো সংস্থা বা ব্যক্তিকে সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন না৷ তাদেরও কপালে জুটে যায় বিদেশে যাওয়ার সুযোগ৷ তিনি বিদেশে গেলেন, তার জায়গায় যিনি দায়িত্ব পালন করবেন, তিনি তখন সহজেই কাজটা করে দেবেন৷ সিস্টেমে কী না হয়৷

বিদেশে যাওয়ার সুযোগেরও কোনো কমতি নেই৷ কলম্বো প্ল্যান অনুযায়ী ব্রিটেনের বাথ ইউনিভার্সিটিতে তিন মাসের জন্য গিয়ে গবেষণার কাজ করতে পারেন সরকারি বাবুরা৷ কেউ যেতে পারেন হার্ভার্ডের মতো জায়গায়৷ অনেক দেশের সঙ্গেই আমলাদের বিনিময় ব্যবস্থা থাকে৷ তা সেরকমই এক ব্যবস্থায় বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন পরিচিত এক আমলা৷ কিন্তু তিনি আবেদন করেননি, উপরওয়ালাকে ধরেননি, মন্ত্রীর কাছে দরবারও নয়৷ তা হলে তিনি কেন ওই সুযোগ পেয়েছিলেন? কারণ, ওই অফিসার ওপরওয়ালার কথা না শুনে একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছিলেন৷ তাই তাঁকে সরিয়ে দিয়ে ‘উপযুক্ত’ সিদ্ধান্ত নেয়ার দরকার হয়ে পড়েছিল৷ কিন্তু ওই অফিসার সবিনয়ে জানিয়ে দেন, পারিবারিক কারণে তিনি বিদেশে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ নিতে পারবেন না৷ তারপর অবশ্য তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল৷ তবে সেটা অন্য গল্প৷ তিনি না চাইতেই বিদেশে গিয়ে তিন মাস কাটিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন৷

সরকারি আমলারা কীভাবে বিদেশে যেতে পারেন? সাধারণত চারটি উপায়ে৷ সরকারি মিটিং, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এবং গবেষণা বা পড়াশুনো করার জন্য৷ এর মধ্যে সরকারি বৈঠক অধিকাংশ সময়ই খুব জরুরি ও টেকনিক্যাল৷ সেখানে দক্ষ অফিসারদের পাঠানো হয়, যাদের বিষয়টির উপর দখল আছে৷ যাঁরা ভারতের কথা ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেন৷ এই ধরনের সিরিয়াস বৈঠকে যোগ দিতে বিদেশ যাওয়ার মধ্যে স্বজনপোষণের গল্প খুব বেশি থাকে না৷ কিন্তু বাকি তিনটি ক্ষেত্রে? সেখানে অনেক ফাঁক৷ সেই ফাঁকে হাতি তো ছেলেমানুষ, ম্যামথ এলেও গলে যাবে৷ সিস্টেমের সেটাই তো মাহাত্ম্য৷

 

প্রশিক্ষণের কথাই ধরা যাক৷ আরেক পরিচিত আমলার অভিজ্ঞতা হলো, তিনি জাপান গিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য৷ ঘটনা হলো, যে জাপানি বিশেষজ্ঞ তাদের কাজ শেখালেন, তিনি প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে এসেছিলেন৷ প্রশিক্ষণের প্রথম দিনেই খুব অবাক হয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ওই অফিসার কী ভারতে আর নেই? থাকলে তোমরা আমার কাছে এসেছ কেন? আমি তো যা শিখেছি, সবই ওই অফিসারের কাছে৷ বুঝুন কাণ্ডখানা৷ গুচ্ছের টাকা খরচ হলো৷ আমলারা জাপানের মতো জায়গায় গিয়ে সাত-দশদিন ধরে এমন প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেন, যা কি না দেশে বসেই তারা বিনা পয়সায় পেতে পারতেন৷ জনগণের টাকা গচ্ছা যেত না৷

তবে এর থেকেও মজার ও অবাক করা গল্প আছে৷ ধরা যাক, বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের এক অফিসার বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে গেলেন৷ অবশ্যই বস্ত্র সংক্রান্ত বিষয়ে৷ মাস দেড়েক প্রশিক্ষণ নিলেন৷ ফিরে এলেন৷ দেখলেন, তাকে বদলি করে দেয়া হয়েছে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে৷ তখন তিনি প্রশিক্ষণের বিদ্যা কাজে লাগাবেন কী করে? আহা, নাই বা লাগানো গেল৷ শিক্ষাটা তো হলো৷ সেটাই তো বড় কথা৷ পরে কখনো সুযোগ পেলে তিনি সেটা কাজে লাগাতে পারবেন বই কি৷ অবশ্য ততদিনে যদি শিক্ষা ভুলে গিয়ে না থাকেন৷

যোজনা কমিশনের সাবেক উচ্চপদস্থ আমলা অমিতাভ রায়ের অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি মন্ত্রণালয়ে চেয়ার কখনো খালি থাকে না৷ ফলে প্রশিক্ষণ নিতে গেলে ফিরে এসে আবার পুরনো চেয়ার অফিসারটি ফিরে পাবেন কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ যদি পুরনো মন্ত্রকে ফিরতে না পারেন, তা হলে প্রশিক্ষণ জলে গেলো৷ তা এই ভাবে কত প্রশিক্ষণ যমুনার জল বেয়ে গঙ্গায় মিশে শেষে সাগরে বিসর্জন হয়েছে, তার হিসাব কে রাখে! তবে সিরিয়াস কাজ কি হয় না? হয়৷ অমিতাভই যেমন এক বছর ধরে আফগানিস্তানে গিয়ে পরিকল্পনা কী করে করতে হয়, পরিকল্পনা কমিশনের গঠন কীভাবে হয়, দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য কী দরকার, তা শিখিয়ে এসেছিলেন আফগানদের৷ তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকজন আফগানিস্তানে কাজ করছেন৷ অনেকে বিদেশে চলে গেছেন৷

প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যাওয়াও দুই রকমের হয়৷ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদলের সদস্য হলে প্রচুর কাজ করতে হয় বিদেশে গিয়ে৷ তার জন্য প্রস্তুতি লাগে, পড়াশুনো করতে হয়৷ আর অন্যটা হলো জাঙ্কেড৷ মানে কাজটা মুখ্য নয়৷ যৎসামান্য কাজ, অঢেল বেড়ানো, শপিং-এর সুবিধা৷ এই জাঙ্কেডের জন্য মারামারি খুবই বেশি৷ দুর্জনেরা বলেন, জাঙ্কেড পেতে হলে অনেক সময়ই কিছু করে দেখাতে হয়৷ অর্থাৎ, ওপরওয়ালাদের কাজ৷ রাজনীতিবিদদের কাজ৷ ক্ষমতাধর সংস্থার কাজ৷ সিস্টেমে ওরকম একটু আধটু হয়৷ অত সব ধরলে চলে না৷ জনগণের টাকা খরচ হয় তো কী হয়ছে৷ এতবড় সিস্টেম চালাতে গেলে টাকা লাগে৷ কিপটেমি করা যায় না৷ এই আমলারাই তো সময়ে কত কাজে লাগে৷ তাই তাদের একটু বিদেশে ঘুরিয়ে আনলে অন্য লোকের কেন যে এত গাত্রদাহ হয় কে জানে! তাদেরই বা আমলা হতে কে বারণ করেছে? তাই অক্ষম হিংসুটেদের সমালোচনা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না সরকারের কর্তাব্যক্তিরা৷ আরে বাবা, সিস্টেমটা তো চালাতে হবে!

কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান সুমিত দত্ত মজুমদার জিএসটি, কাস্টমস, পরোক্ষ কর বিষয়ে অথরিটি৷ তাই তাকে অনেকবারই মিটিংয়ে বিদেশ যেতে হয়েছে৷ তিনি মনে করেন, বিদেশে সেমিনারে যোগ দিতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়া উচিত৷ মিটিংয়ে অবশ্যই যেতে হবে৷ কারণ, সেখানে ভারতের হয়ে কথা বলতে হয়, ভারতের জন্য সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে হয়৷ ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়৷ কিন্তু প্রশিক্ষণে পাঠাবার আগে খুব ভালো করে দেখতে হবে, সেটা আদৌ দরকারে লাগবে কি না৷ দরকারে না লাগলে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার কোনো দরকার নেই৷ জাঙ্কেড তো অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার
কিন্তু তা বললে কি হয়? ট্রেনিং না হলে যে পিছিয়ে পড়তে হয়৷ একটা রাজ্যের কথা মনে পড়ছে৷ সেখানে নদীর ধার কী করে সুন্দর করতে হয়, তা দেখার ও শেখার জন্য প্রতিনিধিদল বিদেশে গিয়েছিলেন৷ এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ তো আর ফেলে রাখা যায় না৷ আর আমাদের এমনই কপাল যে বিদেশে না গেলে তো এ সব শেখা যায় না৷

আরেক আমলার কাহিনি দিয়ে লেখা শেষ করব৷ তিনি অ্যামেরিকায় একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রথমে মনোনীত হয়েছিলেন৷ তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতেই এই মনোনয়ন পান৷ কিন্তু আরেক আমলা রাজনৈতিক সোর্স লাগিয়ে আগের আমলার নাম কাটিয়ে নিজের নাম ঢুকিয়ে দেন৷ তারপর বন্ধুবান্ধব, শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে বোঝান, আরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অর্থ কী? তিন মাস পর পেপার লিখতে হবে৷ তোমার তো পড়াশুনোর সঙ্গে যোগই নেই৷ লোক হাসাবে না কি? ভয় পেয়ে শেষ সময়ে তিনি অজুহাত দেখিয়ে নিজেও যাননি৷ কিন্তু যোগ্য আমলার যাত্রাভঙ্গ আগেই করে দিয়েছিলেন৷

সিস্টেমে সবই হয়৷ আদান-প্রদান চলতে থাকে৷ বিনিময়-বাণিজ্য চলতে থাকে৷ সিস্টেমের সব চেয়ে বড় আপ্তবাক্য হলো, ‘‘একটু দেখবেন স্যার৷’’ পারস্পরিক দেখাশোনার ভিত্তিতেই তো সিস্টেম চলে৷ একে অন্যকে দেখতে দেখতেই অবসরের বয়স এসে যায়৷ তখন একবার পাসপোর্ট চেক করতে হয় আমলাদের৷ অনেকেরই বিদেশ সফরের ভুরি ভুরি নিদর্শন থাকে সেই ছোট নীল রঙা বইতে৷

এই সিস্টেম চলছে, চলবে৷ জনগণ? আরে তাঁদের সেবা করতেই তো বিদেশে যাওয়া৷ দেশের দূষণে ভরা বাতাসে তো সবসময় মাথা খোলে না৷ একটু দূষণমুক্ত পরিবেশও তো দরকার৷ নিজের স্বার্থেই তো সেই খরচ বহন করা দরকার জনগণের৷ যে ভাবে তারা আমলাদের চাকরি জীবনের বাড়ি, গাড়ি, চাপরাশি, রক্ষী, মালি, শেফ সহ বিবিধ খরচ যোগাচ্ছেন, তার সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার সামান্য খরচ যোগ করলে কী ই বা আর এলো গেলো? সমুদ্র থেকে এক ঘটি জল তুললে কি সাগরের জল কমে? জনগণ হলো প্রকৃত দাতা৷ ফলের আশা না করে, তাঁরা শুধু দিয়েই যাবেন৷ তা নিয়ে হই চই করার কী আছে!

সূত্রঃ ডয়েচে ভেলে