বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৪ দেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা ভয়াবহভাবে খর্ব

Published: 31 December 2020, 7:28 AM

পোস্ট ডেস্ক : করোনা মহামারি দক্ষিণ এশিয়ায় মিডিয়ার স্বাধীনতাকে ভয়াবহভাবে খর্ব করেছে। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের ‘কোভিড-১৯ প্রেস ফ্রিডম ট্র্যাকার’ অনুযায়ী, মহামারির সঙ্গে সম্প্রর্কিত প্রায় ২০০ নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে।

এর মধ্যে ১০৭টি ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল- দক্ষিণ এশিয়ার এই চারটি দেশে। অনলাইন আইফেক্স প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, মিডিয়ার ওপর অনাকাঙ্খিত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে কোভিড-১৯। একই সঙ্গে মিডিয়াকে ঠেলে দিয়েছে ‘আনচার্টেড টেরিটোরিতে’। এতে আরো বলা হয়, সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাস ইস্যুতে সরকারি ভাষ্য নিয়ন্ত্রণ করতে এবং তাদের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য সরকারগুলো সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। মহামারি নিয়ে তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনবিতর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে কর্তৃপক্ষ মিডিয়ার ওপর দমনপীড়ন চালিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) আরো বলেছে, অনেক স্থানে জরুরি বিধিবিধান চালু করা হয়েছে। আবার অনেক স্থানে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ভুয়া খবর সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনকে ব্যবহার করা হয়েছে স্বাধীন মিডিয়ার গলা টিপে ধরতে। বেশ কিছু দেশে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রেস ব্রিফিংয়ে যেতে দেয়া হয়নি, সরকারি তথ্য ছিল মারাত্মকভাবে সীমিত। আইন করে অনেক দেশে সরকার প্রদত্ত তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য করা হয়েছে মিডিয়াকে।

আইপিআই তার ‘কোভিড-১৯ প্রেস ফ্রিডম ট্র্যাকারে বলেছে, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে যে ২০০ নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ১০৭টিই দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশে। এসব দেশ হলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল। এ সময়ে এসব দেশে করোনা মহামারি ও তার পরিণাত নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত হয়েছেন ৭১ জন সাংবাদিক। এ ছাড়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকারের ঘটনা ঘটেছে ৩২টি। এমন নিয়ম লঙ্ঘনের ৮৪টি ঘটনা ঘটেছে এ অঞ্চলে ভারতে। ফলে নিয়ম লঙ্ঘনের দিক দিয়ে এ অঞ্চলে ভারত শীর্ষে। বিভিন্ন আইনের অধীনে ৫৬ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার অথবা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৩ জন সাংবাদিক। সরকারের সমালোচনা এবং করোনা মহামারি নিয়ে রিপোর্ট করা থেকে নিরপেক্ষ মিডিয়াকে বিরত রাখতে ভারত সরকার নানারকম কৌশল অবলম্বন করেছে। মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের গলা টিপে ধরার নগ্ন প্রচেষ্টা নেয়া হয় ৩১ শে মার্চ। এদিন সরকার ঘোষণা করেনি, কোভিড-১৯ সম্পর্কে এমন তথ্য প্রচারে মিডিয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা দিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে সরকার। কিন্তু এতে তারা বিফল হয়। এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানান কোর্ট। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি তথ্য প্রকাশের বা সেটা উদ্ধৃত করার জন্য মিডিয়ার প্রতি নির্দেশনা দেয়া হয়।
আইপিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক বারবারা ট্রিওনফি বলেছেন, ২০২০ সালে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালে নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় আক্রমণ পর্যবেক্ষণ করেছে আইপিআই। এসব অঞ্চল এমনিতেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়েছে। মহামারির মধ্যে জনগণের জন্য নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এক্ষেত্রে মিডিয়ায় খবর প্রচার এবং তার প্রেক্ষিতে জনগণের প্রস্তুতি নেয়ার বিষয় সরকার নিয়ন্ত্রণ করলে সেটা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। ফলে এটাকে জনগণের স্বার্থের মারাত্মক লঙ্ঘন বলে দেখা যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, আমরা যখন ২০২১ সালের দিকে দৃষ্টি দিই তখন দেখতে পাই, মহামারির ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যম এবং এ অঞ্চলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করা হতে পারে একটি মূল লক্ষ্য ও কৌশল। অন্যথায় এ অঞ্চলে গণতন্ত্রের প্রভূত ক্ষতি হবে।

আইপিআইয়ের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মহামারি নিয়ে ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে সাংবাদিকদের টার্গেট করেছেন কর্মকর্তারা। আকস্মিকভাবে সরকার লকডাউন দেয়ার ফলে হিমাচল প্রদেশে আটকে পড়েন অভিবাসী শ্রমিকরা। এ সময়ে তারা অনশন করতে থাকেন। তাদের অনশন নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে এবং খাদ্য বিতরণে স্থানীয় প্রশাসনের ঘাটতি থাকায় সমালোচনা করার কারণে হিমাচল প্রদেশের ৬ জন সাংবাদিদের বিরুদ্ধে ১০টি মামলা করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ এবং রিপোর্ট করার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় রাজনীতিকরা।

পুলিশি অ্যাকশনের নিন্দা জানিয়েছে এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া। তারা সংবাদ মাধ্যমকে হয়রান করতে আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। গুজরাটি ভাষার নিউজ পোর্টাল ‘ফেস অব নেশন’-এর মালিক ও সম্পাদক ধবল প্যাটেলকে গ্রেপ্তারের পর এমন বিবৃতি দেয়া হয়। গুজরাটে নেতৃত্বের সম্ভাব্য পরিবর্তন বিষয়ে একটি আর্টিকেল লেখার কারণে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে এবং অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। উল্লেখ্য গুজরাট হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্য।

অন্যদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে সাংবাদিক ও একজন কার্টুনিস্টসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মহামারিকালে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার। এর মধ্যে মাত্র দু’জনকে হেফাজতে নেয়া হয়েছে। অন্যরা অবস্থান করছেন বিদেশে। গ্রেপ্তারের সময় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ধারাবাহিক কার্টুন নিয়ে কাজ করছিলেন। এসব কার্টুনে তিনি স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন করছিলেন। সজল ভুইয়া নামে আরেকজন সাংবাদিক ও তার সমর্থকদের অপদস্ত করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। মহামারিকালে চালের সঙ্কট নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন।

নেপালে কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে ১০টি। এর মধ্যে সাংবাদিকদের ওপর হামলায় মামলা হয়েছে ৬টি। গ্রেপ্তার করা হয়েছে চারজনকে। রেডিও ধাঙ্গাড়ি’র এক রিপোর্টার নবরাজ ধানুককের ওপর হামলা চালিয়েছে স্থানীয় এক রাজনীতিকের সমর্থকরা। তাকে তারা রেডিও স্টেশন থেকে তুলে নিয়ে যায়। এর কারণ, ওই রাজনীতিকের আত্মসাতের বিষয়ে খরব প্রচার করা হয়েছিল। এ ছাড়া কমপক্ষে চারজন সাংবাদিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। অভিযোগ, তারা লকডাউনের সময় রিপোর্ট করেছিলেন। যদিও সরকার ঘোষণা করেছে মিডিয়া হলো অত্যাবশ্যকীয় একটি সেবাখাত।

আফগান সীমান্তে একটি কোয়ারেন্টিন সেন্টারে গাদাগাদি করে রাখা মানুষকে নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে পাকিস্তানের আধা সামরিক বাহিনী দু’জন সাংবাদিককে নির্যাতন করেছে। এটা ভয়াবহ এক নির্যাতনের ঘটনা। সাঈদ আলী আচাকজাই এবং আবদুল মতিন আচাকজাই অভিযোগ করেছেন, তাদেরকে ডেকে পাঠানো হয় ফ্রন্টিয়ার কোরের কমান্ড সেন্টার থেকে। সেখান থেকে তাদেরকে তুলে দেয়া হয় সন্ত্রাস বিরোধী টাস্কফোর্সের হাতে। এরপর তাদেরকে জেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। কালায়ে আবদুল্লাহ জেলার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ভুয়া খবর প্রকাশ করে জনশৃংখলা বিঘিœত করার জন্য সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

এ ছাড়া এ অঞ্চলে ২০২০ সালে টার্গেট করে হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮ জন সাংবাদিক। ভারতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য কমপক্ষে ৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানে অজ্ঞাত অস্ত্রধারীরা হত্যা করেছে দু’জন সাংবাদিককে। বাংলাদেশে মাদক ও অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য একজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •