ছিনতাইকারী থেকে হাজার কোটির মালিক কে এই মিশু ?

Published: 5 August 2021

বিশেষ সংবাদদাতা :


শারফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান। দেড় যুগ আগের সেই ছিঁচকে ছিনতাইকারীই বনে গেছেন হাজার কোটি টাকার মালিক। তাঁর উত্থানের পরতে পরতে নাটকীয় কাহিনি। ছিনতাই থেকে শুরু করে মাদক কারবার, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আখড়া হিসেবে পরিচিত পার্টির আয়োজন, দেশে-বিদেশে নারী সরবরাহসহ ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল এবং অবৈধ গাড়ি আমদানি—হেন অপকর্ম নেই যা করেননি। দুই হাতে টাকা কামিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। দেশে-বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। সম্প্রতি আলোচিত মডেল পিয়াসা ও মৌ গ্রেপ্তার হলে এই সিন্ডিকেটের পুরোভাগে উঠে আসে মিশুর নাম।

অনুসন্ধান বলছে, ২০০৩ সালে মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছিলেন এই মিশু হাসান। ছিঁচকে ছিনতাইকারী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি ছিল। সেই মিশুই হাল আমলের অভিনব কায়দার চোরাকারবারি। ডেইরি সান নামের ফার্মে বিদেশি গরু লালন-পালনের আড়ালে চলত মিশুর ইয়াবা বাণিজ্য। বিদেশ থেকে আমদানির সময় গরুর পেটে করে আনা হয় হীরা ও স্বর্ণের চালান। গরুর পেটে করে ইয়াবার চালানও আনা হয়। এ জন্য মাঝে মাঝে টেকনাফ থেকেও গরুর চালান আনা হতো। অবশেষে র্যাবের জালে ধরা পড়েছেন তিনি। বিতর্কিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার পার্টনার হিসেবে নাম আসার পর গত মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে ১৫ কোটি টাকার ফেরারি ব্র্যান্ডের গাড়ি, বিপুল পরিমাণ মাদক, জাল নোট, অস্ত্র, গুলিসহ তাঁকে আটক করা হয়।

সূত্র জানায়, মিশু লেটেস্ট মডেলের কথা বলে বিদেশ থেকে আমদানি করেন পুরনো মডেলের গাড়ি। তারপর নিজের মালিকানাধীন ইউরো কার ওয়ার্কশপে নিয়ে সেই গাড়িকে মডিফিকেশনের মাধ্যমে নতুন মডেলে রূপান্তর করেন। এভাবে জালিয়াতি করে কম দামের গাড়ি অধিক মূল্যে ধরিয়ে দেন গ্রাহকদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিশুর এই অপকর্ম এখনো অব্যাহত রয়েছে। কারণ, তাঁর গাড়ির ব্যবসা দেখভাল করেন তাঁরই এক অংশীদার আশীষ কুমার ও ছোট ভাই স্যাম।

অনুসন্ধান বলছে, ২০১৬ সালে শুল্ক গোয়েন্দা সদস্যরা কমপক্ষে ৭০টি অবৈধ গাড়ির খোঁজ পান। গোয়েন্দা তদন্তে বারবার উঠে আসে মিশু হাসানের নাম। শুল্কগোয়েন্দা বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ডিউটি ফ্রি গাড়ি আমদানিসহ বেশি সিসির গাড়িকে কম সিসি দেখিয়ে অভিনব ব্যবসা শুরু করেন মিশু। মূলত কারনেটের মাধ্যমে গাড়ি আমদানি করে সরকারের শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার মাধ্যমে মিশু হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুদর্শন ও স্মার্টনেসের সুযোগ নিয়ে মিশু ২০০৭ সালে সমালোচিত ডিজে জামিল-নাতাশাকে দিয়ে শুরু করেন ডিজে ব্যবসা। এর অন্তরালে শুরু করেন মাদক ও ব্ল্যাকমেইলের রমরমা ব্যবসা। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে নারী সরবরাহ করে শুরু করেন ব্ল্যাকমেইলের মতো ভয়ানক অপরাধ। গুলশানের পিংক সিটির পাশে একটি শিশা বারও খুলেছিলেন।

র্যাবও জানিয়েছে, মিশুর এই চক্রে রয়েছে ১০ থেকে ১২ জন। তারা রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বিশেষ করে গুলশান, বারিধারা, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজে পার্টির নামে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করে থাকে। এসব পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের কৌশলে ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিত। এ ছাড়া বিদেশেও প্লেজার ট্রিপের আয়োজন করত। উচ্চবিত্ত প্রবাসীদের জন্য দুবাই, ইউরোপ ও আমেরিকায়ও এ ধরনের পার্টির আয়োজন করা ছিল তাঁদের নিত্যকর্ম।

যেভাবে উত্থান মিশুর : মিশুর অতীত অনুসন্ধানে নেমে জানা যায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোড এলাকায় বেড়ে ওঠেন তিনি। এলাকায় ‘ছোট মিশু’ নামে তাঁর ছিল ব্যাপক পরিচিতি। একসময় টাউনহল ও জেনেভা ক্যাম্প ছিল ওই অঞ্চলের ‘অপরাধ জোন’। ২০০৩ সালের দিকে ওই এলাকায় ছিনতাই করে বেড়ানো ছিল এই গ্যাংয়ের অন্যতম কাজ। তত্কালীন সংসদ সদস্য প্রয়াত মকবুল হোসেনের নাম ভাঙিয়ে তটস্থ রাখতেন এলাকাবাসীকে। ছিনতাইয়ের অভিযোগে ধরা পড়ে একবার জেলও খাটেন মিশু। সরেজমিন ঘুরে এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৪ সালে ছাড়া পেয়ে কোনো এক মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান মিশু। তবে বছরখানেকের মধ্যেই তিনি ফিরে আসেন। ফিরে এলেও তাঁকে আর মোহাম্মদপুরের দিকে খুব একটা দেখা যেত না।