যেসব ‘ফ্যাক্টর’ বদলে দিতে পারে মমতা-শুভেন্দুর ভাগ্য

Published: 3 May 2026

পোস্ট ডেস্ক :


পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হবে আগামীকাল। ফলাফল ঘোষণা আগেই তৃণমূল কংগ্রেস-বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুরো বাংলায় দুই দফার ভোটে উপস্থিতি নিয়ে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত সব রাজ্য নির্বাচনের ভোটের হারের পরিসংখ্যানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

কড়া নিরাপত্তায় রাজ্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মাঠে ছিলেন। দুই দফার ভোটে কোনো প্রাণহানিও ঘটেনি। ইতিমধ্যেই ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। মোটকথা, ছাব্বিশের ভোট একতরফা জয়ের নির্বাচন হচ্ছে না।

একদিকে তৃণমূলের পালে হাওয়া তুলতে গ্রামীণ বাংলার জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও গ্রামীণ শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে। অন্যদিকে প্রবল প্রতিষ্ঠান বিরোধী ক্ষোভ, নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন এবং বেকারত্বের ইস্যু। এসব ফ্যাক্টরগুলো বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি শুভেন্দু অধিকারী? জনতার রায় কার দিকে যায়; তাই দেখার এখন বিষয় বলে জানান বিশ্লেষকরা।
কলকাতাভিত্তিক টেলিভিশন টিভি নাইন বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার ভোটদানে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখেছে পশ্চিমবঙ্গ।

স্বাধীনতার পর সারা দেশে যা রেকর্ড। এর আগে ২০১১ সালে ৮৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮২.৬৬ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৮১.৫৬ শতাংশ ভোট পড়ে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে সেসব পরিসংখ্যান উল্টে গিয়েছে। এবার ভোটদানের হার ৯২ শতাংশেরও বেশি বলে ধরা হয়েছে। বেশির ভাগ জায়গার ভোটের জরিপ হয়েছে সবগুলোর গ্রাফ ওপরের দিকে ছিল।
প্রথম দফার ১৫২টি আসনে ২০২১ সালের তুলনায় এবার প্রায় ২১ লাখ ১১ হাজার বেশি ভোট পড়েছে (প্রতি বিধানসভায় গড়ে ১৩,৮০০ ভোট বেশি)। দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোট বেড়েছে ৯ লাখ ৮ হাজার, যা প্রতি আসনে গড়ে ছয় হাজার ৪০০ বেশি। বিপুলসংখ্যক ভোট বৃদ্ধির নেপথ্যে ছিল রাজ্য বা বিদেশে কাজ করা ভোটারের অংশগ্রহণ। এটিকেই রেকর্ড ভোট পড়ার ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হিসেবে দেখেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

জনসংখ্যার আনুপাতিক পরিবর্তন

প্রথম দফার ১৫২ আসনে গ্রামীণ ভোটার ৮১ শতাংশ, যেখানে মুসলিম ২৯ শতাংশ, তফসিলি জাতি ২৪ শতাংশ এবং উপজাতি অংশ নিয়েছে ৯ শতাংশ। অন্যদিকে দ্বিতীয় দফার ১৪২ আসনে গ্রামীণ ভোটার মাত্র ৫৩ শতাংশ হলেও শহরে হার বেশি ছিল। সেখানে আবার মুসলিম ২৫ শতাংশ, তফসিলি জাতি ২৩ শতাংশ এবং উপজাতি ২.৫ শতাংশ।
এই জনসংখ্যার আনুপাতিক পরিবর্তন প্রধান জোড়াফুল ও গেরুয়া ভোটের ফলে প্রভাব কতটা পড়ে সেটাই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ-হুমায়ুনের দলও ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব রাখে।

ভোটার টানতে যেসবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বিজেপির

রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী দল হিসেবে ক্ষমতাসীন জোড়া ফুলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে ভোটাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। যেখানে ছিল ১৫ বছর ক্ষমতার একচ্ছত্র ব্যবহার ভোটের পালে হাওয়া জুগিয়েছে। এ ছাড়া আরজি কর, কসবাল কলেজের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে জনরোষ ব্যাপক চাপে রাখে। একই সঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অল্প অল্প দুর্নীতির ইস্যু, ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ জুগিয়েছে। এতেই শহরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা তৃণমূল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে কাজ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আলু চাষিদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। রাজ্যের ২৬টি আসনের ‘আলু গোলায়’ ২০২১ সালে তৃণমূল ১৮টি এবং বিজেপি ৮টি আসনে এগিয়ে থাকলেও, ২০২৪-এর লোকসভায় তৃণমূল কমে ১৬ এবং বিজেপি বেড়ে ১০-এ দাঁড়িয়েছে। এটি বিজেপির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত।

এ ছাড়া মুর্শিদাবাদের সহিংসতা, ওয়াকফ ইস্যু এবং বেলডাঙার ঘটনায় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটাতে পারে। যা বিজেপির ভোট ব্যাংকে শক্ত করবে বলে মনে করেন অনেকে।

যেসব জায়গায় ক্ষমতাসীন তৃণমূলের অ্যাডভান্টেজ

একটানা ১৫ বছর ক্ষমতার জেরে কিছু নেতিবাচক প্রচার বাড়লেও তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কিছু ভালো কাজও ছিল। যা এই নির্বাচনে দলটিকে বড় অ্যাডভান্টেজ দেবে বলে মত দিয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তৃণমূলে জোড়াফুলের সাংগঠনিক দৃঢ়তা সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভোটারদের ভোট ঘরে রাখতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা নারীদের ভোট তৃণমূলের পক্ষে ধরে রাখার পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো একের পর এক জনমুখী প্রকল্প তো রয়েছে।

অনেকেই বলছেন, এবার ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনে’র (এসআইআর) প্রভাব রাজ্যের মুসলিম ভোট আরো বেশি করে তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছে। পাশাপাশি, এই এসআইআরের তালিকা থেকে বাদ পড়া মতুয়া সম্প্রদায়ের অসন্তোষও ক্ষমতাসীনদের পক্ষে গিয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের হিসাব বলছে জঙ্গলমহলে তৃণমূল তাদের হারানো জমি অনেকটাই ফিরে পেয়েছে, যা এবারের ভোটে তাদের বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

এবার ভোটে নির্ণায়ক কারা?

তৃণমূল ও বিজেপির সরাসরি লড়াইয়ের বাইরে যেসব ইস্যু সরাসরি প্রভাব ফেলবে তার মধ্যে এসআইআর থেকে ২৭ লাখ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা। যা ভোটের মাঠে বড় নির্ণায়ক হয়ে দাড়াবে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্ষোভের ছাপও ভোটের বাক্সে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে মহিলাদের মন জয় করতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা হিসেবে বিজেপির ‘মাসে ৩ হাজার টাকা’ দেওয়ার আশ্বাস কতটা প্রভাব ফেলবে, তা দেখার বিষয়। পাশাপাশি বেকার ভাতা, দ্রুত নিয়োগের প্রতিশ্রুতি, ডিএ-র মতো বিষয়গুলি রাজ্যের তরুণ প্রজন্ম এবং চাকরিপ্রার্থী, সরকারি কর্মীদের অনেকাংশেই প্রভাবিত করবে।

পাশাপাশি এবারের ভোটে তৃতীয় শক্তির ভূমিকাও ভালোয় থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাম, আইএসএফ এবং কংগ্রেসের জোটবদ্ধ বা আলাদা লড়াই কতটা ভোট নিজেদের দিকে টানতে পারবে, তার ওপর অনেক আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে। অনেক আসনেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোটে ভাগ বসালে বিজেপির ক্ষতি, আবার সংখ্যালঘু বা টেনে নিলে তৃণমূলের ক্ষতি।