ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলসে লেবার পার্টির পরাজয়
পোস্ট ডেস্ক :

ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বড় পরাজয় হয়েছে। এর ফলে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। লেবার পার্টির কিছু এমপি তার পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার দাবি তুলেছেন। তবে আপাতত মন্ত্রিসভার মিত্ররা তাকে সমর্থন দিচ্ছেন। জবাবে স্যার কিয়ের স্টারমার জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেবেন না। ওয়েলসে ২৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা হারিয়েছে লেবার পার্টি। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি বা এসএনপি সবচেয়ে বড় দল হিসেবেই রয়ে গেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।ব্রেকিং নিউজ
ইংল্যান্ডে সবচেয়ে বিজয়ী হয়েছে রিফর্ম ইউকে। দলটি ১ হাজার ৪ শতাধিক আসনে জিতেছে। সেখানে এমনসব কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে লেবার ও কনজারভেটিভদের শক্ত ঘাঁটি ছিল।
বিবিসির প্রজেক্টেড ন্যাশনাল শেয়ার বা পিএনএস অনুযায়ী, যা ১ হাজারের বেশি ওয়ার্ডের ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এবং জাতীয় নির্বাচনে একই ধারা বজায় থাকলে সম্ভাব্য ফল কেমন হতে পারে তা অনুমান করে, তাতে রিফর্ম ইউকে ২৬ শতাংশ ভোট পেয়ে সবচেয়ে বড় দলে পরিণত হয়েছে। এই পিএনএস অনুযায়ী, গ্রিন পার্টি ১৮ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। লেবার ও কনজারভেটিভ উভয়েই ১৭ শতাংশ ভোট নিয়ে যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে। এতে বৃটেনের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের দুই প্রধান দলের আধিপত্যের অবসানের ইঙ্গিত মিলছে।
লেবার ইংল্যান্ডে ১ হাজার ১০০ এর বেশি কাউন্সিল আসন হারিয়েছে। যার মধ্যে উত্তর ইংল্যান্ড ও মিডল্যান্ডসের তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিগুলোও রয়েছে। ভোট গণনা চলতে থাকায় দলটি আরও খারাপ ফলের মুখোমুখি হতে পারে।
ওয়েলসে পরিস্থিতি লেবারের জন্য আরও হতাশাজনক। সেখানে প্লেইড কামরি এখন বিকেন্দ্রীভূত পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল। রিফর্ম ইউকে সেখানে প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডে এসএনপি সবচেয়ে বড় দল থাকলেও পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
একসময় এসএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার স্বপ্ন দেখা লেবার মাত্র ১৭টি আসন নিয়ে অনেক পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেছে। একই সংখ্যক আসন পেয়েছে রিফর্ম ইউকে, যারা স্কটল্যান্ডে প্রথম বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে।
নির্বাচনে লেবারের দুর্বল ফলাফল স্যার কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করেছে। চাপ সামাল দিতে স্যার কিয়ের শনিবারের দ্য গার্ডিয়ানে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি নিজের পথেই এগিয়ে যাওয়ার এবং ঐক্য গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন, ভোটাররা যে বার্তা দিয়েছেন, আমাদের অবশ্যই তার জবাব দিতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ডানে বা বামে ঝুঁকে পড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, এর অর্থ হলো একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা, আমাদের মূল্যবোধ নিয়ে দৃঢ় থাকা, দৃষ্টিভঙ্গিতে সাহসী হওয়া এবং মানুষের দাবির জবাব দেয়া। বিভাজনের বদলে ঐক্য গড়া।রাজনৈতিক সংবাদ
শুক্রবার রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, প্রধানমন্ত্রী সোমবার যে বক্তব্য দেবেন, সেখানে দলের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরবেন এবং সে ক্ষেত্রে তিনি পূর্ণ সমর্থন পাবেন। স্ট্রিটিং বলেন, সরকারকে লেবারের বড় পরাজয়ের দায় নিতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে তারা এখনও মানুষ যে পরিবর্তনের জন্য আকুল, তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দলকে একটি টিম হিসেবে কাজ করতে হবে।
বিবিসি যখন তাকে জিজ্ঞেস করে তিনি কি নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন, তখন স্ট্রিটিং বলেন, স্যার কিয়ের ২০১৯ সালের ভরাডুবির পর যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অসম্ভব মনে করা হয়েছিল, তা এনে দিয়েছেন। শুক্রবার রাত পর্যন্ত ২২ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ বা পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সমালোচনা দলটির বামপন্থী অংশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক পরিবহনমন্ত্রী লুইস হেই বলেন, জনগণের মধ্যে স্যার কিয়েরের অজনপ্রিয়তার বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারে সামনে এসেছে। তবে তার মতে, এখনই তাকে সরানোর সময় নয়। তিনি বলেন, আমরা দায়িত্বজ্ঞানহীন, বিশৃঙ্খল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে নামতে পারি না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি নিজের ধরণ না বদলান, তাহলে তিনি আরেকটি নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না।
লেবারের তথাকথিত ‘সফট লেফট’ গোষ্ঠীতে হেই একজন প্রভাবশালী কণ্ঠ। এই গোষ্ঠীতে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের সমর্থকরাও রয়েছেন। বার্নহামকে স্যার কিয়েরের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়। চলতি বছরের শুরুতে তাকে এমপি পদে দাঁড়াতে বাধা দিয়েছিলেন স্টারমার। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, কিছু এমপি অপেক্ষা করছেন তিনি ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে এসে নেতৃত্বের লড়াই শুরু করবেন।
শুক্রবার সকালে ইংল্যান্ডের প্রাথমিক ফল প্রকাশের সময় দেয়া বক্তৃতায় স্যার কিয়ের স্বীকার করেন, এটি কঠিন নির্বাচন ছিল। তবে তিনি বলেন, আমি সরে দাঁড়িয়ে দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেব না। নির্বাচনের ধাক্কা সামলে আগামী সপ্তাহে নিজের প্রধানমন্ত্রিত্ব নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করছেন তিনি। শুক্রবার সন্ধ্যায় এক্সে দেয়া একাধিক পোস্টে মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যই প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান। চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস বলেন, স্যার কিয়ের দেশ পরিবর্তনের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে কাজ চালিয়ে যেতে হবে এবং দেখাতে হবে রাজনীতি কীভাবে মানুষের জীবনকে ভালো করতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন প্রধানমন্ত্রী এখনও পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারবেন। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার ফলাফলের পর হঠকারী প্রতিক্রিয়া না দেখানোর আহ্বান জানান। জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড, যিনি সফট লেফটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা, শেষের দিকের সমর্থন বার্তাগুলোর একটিতে লিখেছেন, এগুলো লেবারের জন্য ভয়াবহ ফলাফল। তিনি আরও বলেন, কিয়ের যেমন বলেছেন, ২০২৪ সালে লেবার যে পরিবর্তনের ম্যান্ডেট পেয়েছিল, তা বাস্তবায়নে আমাদের আরও এগোতে হবে এবং দেখাতে হবে কীভাবে আমরা দেশের পরিবর্তনের দাবির জবাব দেব।
কিছু ট্রেড ইউনিয়ন নেতা স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। ইউনাইট ইউনিয়নের নেতা শ্যারন গ্রাহাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সরকারের জন্য দেয়ালে লেখা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে লেবারের চার সাবেক সাধারণ সম্পাদক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন নেতৃত্বের বিতর্কে না জড়িয়ে দেশ পরিবর্তনের পরিকল্পনায় মনোযোগ দেয়। লেবারকে আর্থিকভাবে সমর্থন দেয়া ইউনিয়নগুলো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এই বিপর্যয়কর নির্বাচনী ফলাফল লেবার সরকার ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে গভীর বিচ্ছিন্নতা প্রকাশ করেছে।




