মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন শুভেন্দু
পোস্ট ডেস্ক :

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার কিছু পর কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তাকে রাজ্যপাল আরএন রবি শপথ পড়ান। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করল বিজেপি। একই মঞ্চে শুভেন্দুর সঙ্গে শপথ নিয়েছেন রাজ্যের পাঁচজন মন্ত্রীও। এদিকে, একই দিন রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন রাজ্যের বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। বিজেপির বিরুদ্ধে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।
মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ভারতের বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শপথ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজনাথ সিং, শিবরাজ সিং চৌহান ও জেপি নাড্ডা। শপথ অনুষ্ঠানের পুরোটাজুড়ে বাঙালি আবহ দেখা গেছে। বিশ্বকবির জন্মদিনে শপথ মঞ্চসহ পুরো ময়দানে বাজানো হয় রবীন্দ্র আবহে। প্রধানমন্ত্রী মোদি মঞ্চে উঠেই কবিগুরুর ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শপথ শেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে অভিবাদন জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ, অন্ধপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু, মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফাডনবীশ, আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ত্রিপুরার মানিক সাহা, দিল্লির রেখা গুপ্ত, বিহারের সম্রাট চৌধুরী, উত্তরাখণ্ডের পুষ্কর সিং ধামি প্রমুখ। আরও ছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি, বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীসহ কেন্দ্র ও রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারা। কলকাতা আর দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে শপথ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। রাজ্যের সব জেলা থেকে বিজেপির নেতাকর্মীরাও এসেছেন।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বাঙালিয়ানার ছোঁয়ায় সেজে উঠে ব্রিগেড চত্বর। কীর্তন, ছৌ নাচ, বাউল গান, ধামসা-মাদলের তালে ভরে ওঠে ব্রিগেড। মঞ্চে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি। সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর, দুর্গার ছবির কোলাজ। জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে মুখরিত হয় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। ময়দানের ভিড়ে ছিল আদিবাসী, রায়বেশি, ছৌ নাচ। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সুর আর নাচে মাতিয়ে রাখেন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা শিল্পীরা। ছিল রসগোল্লা, লাড্ডু ও দইসহ বাংলার নানা মিষ্টিতে আপ্যায়ন। সঙ্গে ঝালমুড়ি।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় হয়। মুখ্যমন্ত্রী পদে মমতার স্থলাভিষিক্ত হন তারই এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বর্তমানে রাজ্য বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর শপথের পর মন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন বিজেপি বিধায়ক দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক ও ক্ষুদিরাম টুডু। তবে কে কোন দপ্তর সামলাবেন তা জানা যায়নি। অনুষ্ঠানে ক্ষুদিরাম টুডু সাঁওতালি ভাষায় শপথ পড়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীসহ বাকিরা বাংলায় শপথবাক্য পাঠ করেন।
বিকালে কালীঘাটের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জি বলেন, চারদিকে সন্ত্রাসের বজ্রাঘাত চলছে। এখন সময় এসেছে বিজেপিবিরোধী সব শক্তিকে একত্রিত হওয়ার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তৃণমূল নেত্রীর বার্তা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, এখন এটা ভাবার সময় নয় আমি কে, ও কে। রাজনৈতিকভাবে আমাদের প্রথম শত্রু বিজেপি। মমতা জানান, যে কোনো রাজনৈতিক দল চাইলে তার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে পারে। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত তিনি অফিসে থাকবেন এবং বিজেপিবিরোধী ঐক্যের প্রশ্নে আলোচনায় প্রস্তুত। কালীঘাটের অনুষ্ঠান থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলেন মমতা। তার দাবি, রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় অনুমতি দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর মমতার এ আহ্বান শুধু রাজ্যের রাজনীতির জন্য নয়, জাতীয় বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তবে রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে মমতার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন। বিজেপির উত্থানের মুখে সেই আবেগকে কেন্দ্র করেই তিনি নতুন রাজনৈতিক লড়াইয়ের ভিত গড়তে চাইছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
মমতার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথের লাইন উদ্ধৃত করে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো।’ যদিও বাম শিবির আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জোটের ইঙ্গিত দেয়নি। তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এ প্রতিক্রিয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক আলোচনার পথ খুলে দিয়েছে।




