ডাক্তার-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের বিবাদ : অস্বাভাবিক কিছু কি?

Published: 21 April 2021, 10:20 AM

।। রাউফুন নাহার।।

রাস্তায় ডাক্তার, পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট মিলে ঝগড়াঝাঁটি করছেন, ব্যাপারটিকে আমার কাছে অবাক হওয়ার মতো কিছু মনে হয়নি। হাসিও পায়নি। তাঁদের ব্যাপারে সমালোচনামূলক কিছুও আসলে মাথায় আসেনি, বা নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয় দিয়ে তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন তেমনটাও মনে হয়নি। তাঁরা যদি সত্যিই ক্ষমতার অপব্যবহারে আগ্রহী হতেন তাহলে এই মহামারির সময়ে ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ডিউটি ফাঁকি দিতেন, ঘরের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকতেন। কিন্তু তাঁরা তা করেননি। রমজানের তপ্ত দিনে ডাবল মাস্ক এবং ইউনিফর্ম পরিধান করে তাঁদের তিনজনের একজন ডিউটি শেষে ঘরে ফিরছিলেন, বাকি দুজন ডিউটি করছিলেন। সময়টা এমন যে কথিত কোনো ক্ষমতাই আমাদেরকে চলমান অস্তিত্বের সংকট থেকে রেহাই দিতে পারছে না।

এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দুটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, বা দুটি পয়েন্টের ভিত্তিতে আমরা তাঁদের সমালোচনা করছি- ১. গাড়িতে পেশাগত পরিচয় সম্বলিত স্টিকার এবং অ্যাপ্রনে নাম-পরিচয় ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট কেন ডাক্তারকে আটকাল? ২. যাই ঘটুক, ডাক্তার কেন অত মেজাজ দেখিয়ে তুইতোকারি করল?

আমি অনুমান এবং পেশাগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই ‘কেন’ দুটির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। অনুমান বলছি, কারণ তাঁদের তিনজনের কারো সাথেই আমার দেখা বা কথা হয়নি কিংবা আমি এ নিয়ে গবেষণাও করিনি। উত্তরে আসা যাক-

১। কঠিন পরিস্থিতিতে যৌক্তিকভাবে চিন্তা করা এবং প্রত্যাশিত আচরণ করা বেশ কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতিকে আমরা এই তিনজনের জন্য কেবল কঠিনই নয় বরং যুদ্ধের ময়দানও বলতে পারি। তাঁরা মূলত সম্মুখযোদ্ধা।

২। কঠিন পরিস্থিতিতে কিভাবে মেজাজ ঠিক রাখা যায়, যৌক্তিকভাবে চিন্তা করা যায়, পরস্পরকে সহযোগিতা করা যায়, সমস্যা সমাধান করা যায়, সংঘাত নিরসন করা যায়- তা উন্নত বা আদর্শ রাষ্ট্রে প্যারেন্টিং, সোশালাইজেশন এবং একাডেমিক কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও আমাদের মতো দেশগুলোতে তেমনটা হয় না। ফলে আমাদের গোলমেলে জীবন, শিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের ছাপ আমাদের পেশাগত জীবনকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। যে ঘটনা এলিফ্যান্ট রোডে ঘটেছে, সেই একই রকম ঘটনা অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, হাসপাতাল, দোকানপাটসহ সবখানেই ঘটছে; তার থেকেও বড় কথা এই ঘটনাগুলো আমরা বাড়িতেই দেখতে দেখতে বড় হই। পার্থক্য এই যে সবগুলোর ভিডিও আমরা সোশাল মিডিয়ায় পাই না।

৩। আমাদের সমাজ কাঠামোটাই এমন যে আমরা বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, পেশা, ধর্ম ইত্যাদি নানাকিছুর ভিত্তিতে ক্ষমতার বিভাজন দেখে বড় হই এবং সেই ক্ষমতা বা শ্রেণিবিভাজনের জালে আটকে যাই। ফলে দেখা যায় সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে আমরা সেই ধরনের মাইন্ডসেট বা মানসিকতা থেকেই প্রতিক্রিয়া করি, ভেবেচিন্তে কিছু করি না।

এবারে উত্তরণের বিষয়ে কিছু কথা। কনফ্লিক্ট বা সংঘাত আমাদের জীবনেরই অংশ। প্রত্যেক সমাজেই সংঘাত বা ঝগড়াঝাঁটি থাকে, এর চেহারা বা ধরনগুলো কেবল আলাদা। তাই ‘ঝগড়া করা উচিত নয়’ এই ভেবে যদি আমরা সংঘাতকে মনের ভেতরে লুকিয়ে রাখি আর বাইরে ‘ভালো মানুষ’ ভাব নিয়ে চলি তাহলে ভবিষ্যতে আরো বড় সংঘাত তৈরি হবার রাস্তা পাকাপোক্ত হতে থাকে। তাই সংঘাত না এড়িয়ে যোগাযোগের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বা তৃতীয় কোনো পক্ষের সহযোগিতা নিয়ে কি করে তা নিরোসন করতে হয় তা জানা দরকার। শৈশব-কৈশোরে আমরা জীবনের দক্ষতাগুলো যেমন- আবেগ সামলানো, আন্তরিক যোগাযোগ, আন্তরিক নেতৃত্ব, নিজের এবং অন্যের প্রতি মমতা ও সম্মান প্রদর্শন, সংঘাত নিরোসন ইত্যাদি হাতে কলমে না শিখলেও যেকোনো বয়সে আমরা তা শিখতে এবং চর্চা করতে শুরু করতে পারি। প্রয়োজনে পেশাগত কাউন্সিলর এবং মেডিয়েটরের (মধ্যস্থতাকারী) সহযোগিতা নিতে পারি। আমরা এসবের চর্চা যে একদমই করছি না তা অবশ্য নয়। তাই চর্চা করতে গিয়ে কোথায় কোথায় অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি তা খুঁজে বের করে নিজেকে বিকশিত করতে পারি। ‘নিজেকে’ শব্দটি বলছি কারণ পরিবর্তন শুরু করতে হয় নিজেকে দিয়েই। অনেকজন ‘আমি’ মিলেই তো ‘আমরা’! তা না হলে দেখা যায় সবাই অন্যের দিকে আঙুল তুলছি, কিন্তু নিজেকে বা নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোকে পরিবর্তন করছি না বলে কোনো সমাধানে পৌঁছানো যাচ্ছে না। যদি মনে করি অন্যদেরকে পরিবর্তনে সহযোগিতা করবো তাহলে আন্তরিক ফিডব্যাক দিতে পারি বা গঠনমূলক আলোচনা করতে পারি। কঠোর সমালোচনা বা ঘৃণা ছড়ানো কখনোই সমস্যার সমাধান নয়।

আরেকটি কথা, বিকাশের সংজ্ঞাকে আমরা শারীরিক বিকাশ এবং মেধার বিকাশের মধ্যেই যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই সেটিও সার্বিক বিকাশের পথে একটি বড় বাধা। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয়, বুদ্ধিগত, আত্মিক এই সবকিছু মিলিয়েই আমাদের বিকাশ এবং প্রত্যেক ধরনের বিকাশের জন্য নিজেকে সময় দিতে হয়।

আমাদের বিকাশ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য সমাজ কাঠামোতেও অনেকগুলো পরিবর্তন প্রয়োজন। সমাজ কাঠামো পরিবর্তনের আলোচনাটি আসলে আলাদা এবং আরো ব্যাপকভাবে হওয়া প্রয়োজন।

সবশেষে বলতে চাই, বিকাশ একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই যে আমি পেশাগত পরিচয়ের বলে এত কথা বলছি, তার মানে এই নয় যে আমি ভুল বা অপ্রত্যাশিত আচরণ করি না। চলার পথে ভুল আমাদের হতেই পারে। আসুন, ভুলগুলোর জন্য আমরা নিজের এবং অন্যের প্রতি কঠোর না হয়ে ক্ষমার চোখে দেখি। পরিবর্তনের জন্য, যার যার যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরস্পরের পাশে থাকি, পরস্পরকে সহযোগিতা করি। এই পৃথিবীর বুকে আমরা প্রত্যেকে মূল্যবান, আমাদের প্রত্যেকের অনুভূতিই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : শিক্ষক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share