পাইলট নওশাদ এখনো সংজ্ঞাহীন

Published: 29 August 2021

বিশেষ সংবাদদাতা :


মাস্কাট থেকে যাত্রীবাহী ফ্লাইট নিয়ে ফেরার পথে ভারতের আকাশে হার্ট অ্যাটাকের শিকার বাংলাদেশ বিমানের পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইউম এখনো সংজ্ঞাহীন। তার শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হয়েছে। মহারাষ্ট্রের নাগপুরের কিংসওয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ) ‘কোমা’য় আছেন তিনি। হাসপাতালের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) রোশান ফুলবান্ধেকে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস এ খবর দিয়েছে। ফুলবান্ধে বলেন, ‘তার (ক্যাপ্টেন নওশাদ) অবস্থা গুরুতর। তিনি সম্পূর্ণ ভেন্টিলেশনের সহায়তায় বেঁচে আছেন। তার মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। তিনি কোমায় আছেন।’ হাসপাতালের মেডিকেল সার্ভিসেস ডিরেক্টর ডা. সুভরজিৎ দাশগুপ্ত, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ফিজিশিয়ান ডা. রঞ্জন বারোকার এবং ডা. বীরেন্দ্র বেলেকারের অধীনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

‘কোমা’য় পাইলট নওশাদ শিরোনামে প্রচারিত খবরে বলা হয়, শুক্রবার মধ্য আকাশে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন বিমানের পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ কাইউম। ওমানের মাস্কাট থেকে শতাধিক যাত্রীসহ বিজি-০২২ ফ্লাইটটি নিয়ে ঢাকা আসার পথে ভারতের আকাশে থাকা অবস্থায় ক্যাপ্টেন কাইউম অসুস্থ বোধ করেন। পরবর্তীতে বিমানটিকে মহারাষ্ট্রের নাগপুরের ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়।

আকাশে অসুস্থ হয়ে পড়ার সাথে সাথেই ক্যাপ্টেন কাইউম কলকাতার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কাছে জরুরি অবতরণের অনুরোধ জানান। একই সময় তিনি কো-পাইলটের কাছে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করেন।

কলকাতার এয়ার ট্রাাফিক কন্ট্রোল বিমানটিকে তার নিকটস্থ নাগপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করার নির্দেশ দিলে কো-পাইলটই বিমানটিকে অবতরণ করান। বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের বিমানটিতে ১২৪ জন যাত্রী ছিল। তারা সবাই নিরাপদে ছিলেন।
এদিকে শুক্রবারই আরেকটি ফ্লাইটে করে বিমানের আট সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল নাগপুরে যায়। মধ্যরাতের পর যাত্রীসহ উড়োজাহাজটিকে ঢাকার বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়।

বিমান প্রতিমন্ত্রীর প্রার্থনা
এদিকে ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইউমকে দক্ষ পাইলট আখ্যা দিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী এমপি শনিবার বলেন, অসুস্থ পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইউমের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করবে সরকার। বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকাল প্রতিমন্ত্রী এ আশ্বাস দেন। বলেন, ক্যাপ্টেন নওশাদের মত দক্ষ পাইলট একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ। তিনি কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে তার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তার হঠাৎ অসুস্থতায় আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। তার চিকিৎসার বিষয়ে মন্ত্রণালয় এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সার্বক্ষণিক তদারকি করছে। তার দ্রুত সুস্থতার জন্য দেশবাসীর প্রতি প্রার্থনার অনুরোধ করেন প্রতিমন্ত্রী।

এরই নাম দায়িত্ববোধ!
ওদিকে ‘এরই নাম দায়িত্ববোধ!’ ‘নওশাদ বাঁচালেন, নিজেও বাঁচলেন’ ইত্যাদি শিরোনামে ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইউমের কর্মময় জীবনের ওপর বিভিন্ন স্ট্যাটাস ফেসবুকে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিমানের কর্মকর্তারাও তা শেয়ার দিচ্ছেন। এরই নাম দায়িত্ববোধ!’ শীর্ষক লেখায় অসত্য কোন তথ্য আছে কি-না? জানতে হওয়া হয়েছিল বিমানের জনসংযোগ বিভাগের পাঠিয়ে। তারাও লেখাটির বিষয়ে আপত্তি করেননি। লেখাটি ছিল এমন ‘মাঝপথে পাইলট হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ বোধ করলেন। নিজের তীব্র কষ্টের মধ্যেও যাত্রীদের কথা বিবেচনায় জরুরি অবতরণে নিকটবর্তী এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের ক্লিয়ারেন্স চাইলেন। তাদের নির্দেশনায় জরুরি অবতরণ করলেন। চটজলদি পাইলটকে হাসপাতালে নিতে হলো না, এটি কোন সিনেমার গল্প নয়, বাস্তব জীবনের গল্প। আর এই গল্পের নায়ক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইউম। খবরটা পড়ার পর থেকে ভাবছি একজন মানুষের ভেতর কী দারুণ পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধ থাকলে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া যায়। ৪৫ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন নওশাদের এনজিওগ্রাম হয়েছে। দোয়া করি দ্রুত তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার যে পরিচয় পাইলট দেখিয়েছেন সেজন্য তাকে ধন্যবাদ। ১২৪ জন মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ পেতে পারেন তার সব সহকর্মী। কো-পাইলট এই সময় সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। পুরো টীমকে ধন্যবাদ। পাঁচ বছর আগের আরেকটি ঘটনায় তার দায়িত্বশীলতায় দেড় শতাধিক প্রাণ বেঁচে ছিলো। তাও এই মাস্কাট রুটে। ওমান থেকে ফ্লাইটটি যাচ্ছিল চট্টগ্রামে। মাস্কাটের স্থানীয় সময় তখন রাত তিনটা। গভীর রাতে দেড় শতাধিক আরোহী নিয়ে মাস্কাট থেকে গর্জন করে আকাশে উড়াল দিতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। রানওয়ে থেকে উড়াল দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে উড়োজাহাজটিতে বিস্ফোরণের শব্দ। পরে কন্ট্রোল টাওয়ারে যোগাযোগ করে জানতে পারেন ল্যান্ডিং গিয়ারের ডান পাশের চাকার টায়ার ফেটেছে। শুরু থেকেই যাত্রীদের আতঙ্কিত না হতে বলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ। তিনি ও ফার্স্ট অফিসার মেহেদী হাসান বুঝতে পারছিলেন, কী ঘটেছে। ১৮ টন জ্বালানি আর উড়োজাহাজটির ওজন ৬০ টন। সব মিলিয়ে ৭৮ টন ওজনের বিশাল উড়োজাহাজের ওমানে জরুরি অবতরণ ছিল কঠিন। এদিক-সেদিক হলেই বিস্ফোরিত হতো। পাইলট দেশের পথেই উড়তে থাকলেন। পাঁচ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করান ক্যাপ্টেন নওশাদ। জীবন রক্ষা পায় দেড়’শ যাত্রীর। এই দুঃসহ অভিযাত্রার স্বীকৃতি হিসেবে বৈমানিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের প্রশংসাপত্র পেয়েছিলেন। আসলে দায়িত্বশীলতা হঠাৎ করে একদিনে আসে না। এটি চর্চার বিষয়। ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন নওশাদ। ধন্যবাদ কো-পাইলটসহ পুরো টিমকে। আপনাদের কাছ থেকে এই দেশের নানা পেশায় থাকা লোকজন দায়িত্বশীলতা শিখতে পারেন। এভাবেই দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব আর মানবিকতার জয় হোক সবখানে।’