অবাধে মারা যাচ্ছে ডলফিন, নয় মাসে সৈকতে ভেসে এলো ২৩ টি

Published: 29 September 2021

বরিশাল প্রতিনিধি :

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকতে একের পর এক ভেসে আসছে মৃত ডলফিন। গত নয়মাসে সৈকতে পাওয়া গেছে ২৩টি মৃত ডলফিন যা পরিবেশ বিপর্যয়ের আলামত বলে মনে করছেন পরিবেশবিদগণ। এর আগে কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে ১০/১২ টি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। সর্বশেষ বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে দ্বিতীয় ঝাউবন এলাকায় আরো একটি মৃত ডলফিনদেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডারকে খবর দেয়।

এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর তেঁতুলিয়া নদীর বাউফল তীরে একটি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছিল। এটার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় আট ফুট । এ নিয়ে চলতি বছরে ২৩টি মৃত ডলফিন পটুয়াখালীর উপকূলে ভেসে আসলো।

এর আগে গত ৬ ও ৮ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এসেছিলো আরো ২টি ডলফিন। এর একটি ৬ ফুট লম্বা মৃত ইরাবতী ডলফিন। ৯ সেপ্টেম্বর সকালে সৈকতের সানসেট পয়েন্টে ডলফিনটি দেখতে পায় ট্যুর গাইড মো. ফজলুর রহমান। পরে তিনি বিষয়টি কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্যদেরকে জানান। খবর পেয়ে ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বন বিভাগ ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের খবর দেন।
গত বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে ৭ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি একটি মৃত ডলফিন সৈকতে ভেসে আসে। এ নিয়ে এ বছর কুয়াকাটা সৈকতে ২৩টি মৃত ডলফিন পাওয়া গেল।

ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্যরা জানান, গতকাল ভেসে আসা প্রায় ৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের ডলফিনটির মুখে ও পেটে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মনে হচ্ছে জেলেদের জালে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এ ডলফিনটির মৃত্যু হয়েছে।

ইকোফিশ-২ প্রকল্পের পটুয়াখালী জেলার সহকারী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের গত ৮ সেপ্টেম্বর দুটি ডলফিন ভেসে এসেছিল। সেগুলোর কলিজা, জিহবাসহ বেশ কিছু স্যাম্পল সংগ্রহ করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এখন যে ডলফিনটি এসেছে সেটির বিষয়ে বনবিভাগ ও মৎস্য বিভাগের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, দুই দিনে কুয়াকাটা সৈকতে তিনটি মৃত শুশুক ও ইরাবতী ডলফিন ভেসে আসলো। চলতি একমাসে ৬ টি ডলফিন মৃত পাওয়া গেল। বিষয়টা ভালো বার্তা দিচ্ছে না। এটা নিয়ে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন।

পটুয়াখালী জেলা বন কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম জানান, গতকাল ভেসে আসা মৃত ডলফিনের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। স্যাম্পল কালেকশন করে মাটিচাপা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে পটুয়াখালী জেলার সাংবাদিক নেতা ও অবজারভার প্রতিনিধি মুজাহিদুল ইসলাম প্রিন্স জানান, চলতি বছরের পুরো আগস্ট ও সেপ্টেম্বর জুড়ে কুয়াকাটা সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ইরাবতি, শুশুকসহ ১২টি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। গত বছর জুলাইতেও সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ভেসে আসে ৮টি মৃত ডলফিন। এর আগের বছর প্রায় একই সময়ে সৈকতে ভেসে আসে আরো দুটি মৃত ডলফিন। ডলফিন ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সৈকতে মৃত তিমি মাছের খন্ডিত অংশও পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

প্রিন্সের বরাত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক নূরজাহান সুমি, কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির প্রধান রুমান ইমতিয়াজ তুষার ও ওয়ার্ল্ড ফিস সেন্টার বাংলাদেশের ইকো ফিস প্রকল্পের সহকারী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি জানান, সমুদ্রে যে পরিমাণ ডলফিন মারা যাচ্ছে তার সামান্য অংশ আমাদের চোখে পড়ছে। ৭১০ কিলোমিটার উপকূলের মাত্র ১০ কিলোমিটারের তথ্যই ভয়ানকভাবে আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। কত ডলফিন মারা যাচ্ছে তার কোন সঠিক তথ্য নেই কারো কাছে। এটি নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণার প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তারা।

এর আগে গতবছর কক্সবাজারের সৈকতেও এভাবে ১০/১২টি ডলফিনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলসের প্রধান নির্বাহী রাশেদুর মজিদ বলেছেন, ‘‘আমাদের হাতে তথ্য রয়েছে যে সাম্প্রতিক সময়ে ১০ থেকে ১২টি ডলফিনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে জেলেরা। আটকা পড়ার পর জাল বাঁচাতে সেগুলোকে হত্যা করা হয়। এভাবে হত্যার শিকার ডলফিনগুলোই টেকনাফ, ইনানী ও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে, কুয়াকাটায় ভেসে আসছে। মৃত প্রায় সব ডলফিনদের শরীরে আঘাতে চিহ্ন রয়েছে।’’

বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক শাখার উপপ্রধান ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, ‘‘কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সৈকতে মৃত ডলফিন ভেসে আসার খবর আমি পেয়েছি। তবে আমার মনে হয়, জেলেরা এত নিষ্ঠুর নয়, যে ডলফিন হত্যা করবে। কারণ, প্রাণীটি সাগরে কারও ক্ষতি করে না। বিশেষ করে জেলেরা বিশ্বাস করে যে, ডলফিন খুব উপকারি প্রাণী। দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত কিংবা জেলেদের বিপদে ডলফিনরা সাহায্য করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে জেলেরা ডলফিন হত্যা করবে বলে মনে হয় না। তবে ইঞ্জিন চালিত বোট বা ট্রলারে ধাক্কা খেয়েও এসব প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে। ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কিছু মন্তব্য করা কঠিন।