বদলি হজ কী কেন কিভাবে
জাওয়াদ তাহের

হজ এমন এক ইবাদত, যাতে শারীরিক ও আর্থিক উভয় সক্ষমতার প্রয়োজন হয়। তবে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও বার্ধক্য, চিরস্থায়ী অসুস্থতা বা মৃত্যুর কারণে তিনি নিজে তা আদায় করতে পারেন না। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বিনের পথে যে প্রশস্ততা ও সহজতা রেখেছেন, তার অন্যতম নিদর্শন হলো ‘বদলি হজ’। বদলি হজ মূলত অক্ষম ব্যক্তির পক্ষ থেকে অন্য কারো মাধ্যমে তার ফরজ হজ আদায় করিয়ে নেওয়া।
এই ইবাদতটি কবুল হওয়ার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শরয়ি বিধি-বিধান রয়েছে, যা প্রেরণকারী ও পালনকারী, উভয় পক্ষের জন্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
১. বদলি হজের যোগ্যতা ও প্রেরণকারীর পরিচয়
বদলি হজের মূল লক্ষ্য হলো ওই ব্যক্তির পক্ষ থেকে জিম্মাদারি আদায় করা, যিনি নিজে হজ করার সামর্থ্য হারিয়েছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু ওই ব্যক্তিই নিজের পক্ষ থেকে বদলি হজ করাতে পারবেন, যিনি হজ ফরজ হওয়ার পর তা আদায় করার আগেই এমন কোনো শারীরিক অক্ষমতায় আক্রান্ত হয়েছেন, যা থেকে সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, বিদায় হজের সময় জনৈক নারী রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর বৃদ্ধ পিতার হজের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বদলি হজের অনুমতি দেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৫৫)
তবে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার আশা আছে বা যিনি নিজে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তিনি অন্যকে দিয়ে বদলি হজ করালে তাঁর ফরজ আদায় হবে না। (হিদায়া : ১/২৯৬)
নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান হলো, যদি মাহরাম না থাকার কারণে তিনি হজ করতে না পারেন এবং শেষ পর্যন্ত মাহরাম পাওয়ার আশা না থাকে, তবে তিনি বদলি হজের ব্যবস্থা করবেন।
২. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বদলি হজ
যদি কোনো ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ ছিল, কিন্তু তিনি তা আদায় না করেই মৃত্যুবরণ করেছেন, তবে তাঁর ওয়ারিশদের ওপর দায়িত্ব হলো মৃতের অসিয়ত অনুযায়ী বদলি হজের ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে গেলে তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে খরচ মেটানো হবে।
যদি তিনি অসিয়ত না করেন, তবে ওয়ারিশরা যদি নিজেদের পক্ষ থেকে বা মিরাসের সম্পদ থেকে সব অংশীদারের (নাবালেগ থাকলে তাদের অংশ বাদে) সম্মতিতে হজ করানো, তবে আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৪৯; আদ্দুররুল মুখতার : ২/৫৯৯)
৩. বদলি হজ পালনকারীর বৈশিষ্ট্য
যিনি বদলি হজ আদায় করবেন তাঁকে অবশ্যই হজের মাসায়েল সম্পর্কে সম্যক অবগত হতে হবে। সবচেয়ে উত্তম হলো, এমন ব্যক্তিকে পাঠানো যিনি এর আগে নিজের ফরজ হজ আদায় করেছেন।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৮১১)
যে ব্যক্তি নিজের ফরজ হজ আদায় করেননি, তাঁকে দিয়ে বদলি হজ করানো মাকরুহ। বিশেষ করে যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে, কিন্তু আদায় করেননি, তাকে দিয়ে অন্য কারো বদলি হজ করানো শরিয়তে অপছন্দনীয়।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে নিজের হজ করার আগে অন্য কারো বদলি হজ করতে দেখে তাকে আগে নিজের হজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (মাসিক আলকাউসার, বদলি হজের মাসায়েল, অক্টোবর : ২০১১)
৪. যাতায়াত ও ব্যয়ের বিধিমালা
বদলি হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা হলো, প্রেরণকারীর নিজ দেশ থেকেই হাজিকে পাঠাতে হবে। যদি নিজ দেশ থেকে পাঠানোর সামর্থ্য থাকে, তবে অন্য দেশ (যেমন—মক্কায় বসবাসরত) থেকে কাউকে দিয়ে হজ করালে ফরজ আদায় হবে না। হজের যাবতীয় খরচের অন্তত বেশির ভাগ প্রেরণকারীকে বহন করতে হবে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো, প্রেরণকারী এই টাকা হাদিয়ার নিয়তে দেবেন না, বরং হজের খরচ হিসেবে দেবেন। প্রেরিত ব্যক্তি যদি সেই টাকার মালিক হয়ে যান, তবে সেই হজ প্রেরণকারীর পরিবর্তে তার নিজের হজ হিসেবে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই টাকা প্রদানের সময় প্রেরণকারী মালিকানা নিজের কাছে রেখে ব্যয়ের অনুমতি দেবেন। তবে হিসাবের ঝামেলা এড়াতে বলতে পারেন যে অবশিষ্ট টাকা আপনাকে ফেরত দিতে হবে না।
৫. ইহরাম ও নিয়তের গুরুত্ব
বদলি হজের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। ইহরামের সময় স্পষ্ট মনে রাখতে হবে যে এই হজ কার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। মুখে উচ্চারণ করা উত্তম, যেমন—‘আমি অমুকের পক্ষ থেকে হজের ইহরাম করছি।’ তালবিয়া পাঠের সময়ও অমুকের পক্ষ থেকে লাব্বাইক বলা যেতে পারে। যদি মুখে নাম বলতে ভুলে যায়, কিন্তু অন্তরে নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে নিয়ত থাকে, তবে হজ আদায় হয়ে যাবে। হজের প্রতিটি কাজে আলাদাভাবে নিয়ত করার প্রয়োজন নেই; ইহরামের সময় করা নিয়তটিই পুরো হজের জন্য যথেষ্ট।
৬. হজের প্রকারভেদ ও সুন্নতের অনুসরণ
প্রেরণকারী যদি নির্দিষ্ট কোনো প্রকারের হজের (ইফরাদ, তামাত্তু বা কিরান) নির্দেশ দেন, তবে আদায়কারীকে সেই নির্দেশই পালন করতে হবে। যদি প্রেরক ইফরাদ করতে বলেন, কিন্তু আদায়কারী তামাত্তু করেন, তবে প্রেরকের হজ আদায় হবে না এবং আদায়কারীকে টাকা ফেরত দিতে হতে পারে। তবে যদি প্রেরক কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা না দেন, তবে আদায়কারী সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো প্রকার হজ পালন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ইফরাদ হজ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে গণ্য।
৭. নফল আমল ও দোয়া
বদলি হজ পালনকারী ব্যক্তি হজের ফরজ ও ওয়াজিব কাজগুলো শেষ করার পর নিজের জন্য বা অন্য কারো জন্য যত ইচ্ছা নফল তাওয়াফ করতে পারেন। তবে ইফরাদ বা কিরান হজকারী হলে হজের আগে নফল ওমরাহ করার সুযোগ নেই। নফল তাওয়াফ বা জিকিরের সওয়াব তিনি নিজের জন্য বা প্রেরণকারীর জন্য, উভয়ের জন্যই আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন।
৮. বদলি হজ বনাম ঈসালে সওয়াব
অনেকেই বদলি হজ ও ঈসালে সওয়াবের হজের মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেন। ঈসালে সওয়াবের হজ হলো নফল হজ, যা একজন ব্যক্তি নিজের খরচে আদায় করে তার সওয়াব অন্য কাউকে উপহার দেন। এতে আদায়কারীর নিজের হজও সম্পন্ন হয়। কিন্তু বদলি হজ শুধু ওই ব্যক্তির হজ হিসেবেই গণ্য হয়, যার পক্ষ থেকে তা করা হচ্ছে। বদলি হজের বিধান অত্যন্ত কঠোর এবং এতে প্রেরকের খরচে হজে যাওয়া আবশ্যক।
বদলি হজ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমত। এটি মূলত হজের মতো মহান ইবাদত থেকে কোনো মুমিন যেন মাহরুম না থাকে, তারই একটি বিকল্প ব্যবস্থা। তবে এটি শুধু বিশেষ পরিস্থিতির জন্যই প্রযোজ্য। যাঁরা বদলি হজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে যে তাঁরা একজন মুমিনের আমানত বহন করছেন। অত্যন্ত বিশ্বস্ততা, ইলম এবং তাকওয়ার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করলেই শুধু প্রেরকের দায়মুক্তি ঘটবে এবং উভয় পক্ষ আল্লাহর দরবারে মকবুল হজের সওয়াব লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সব ইবাদত কবুল ও মঞ্জুর করুন। আমিন।
(তথ্যঋণ : কিতাবুল মানাসেক, মাসায়েলে হজ ও ওমরাহ, মাসিক আল কাউসার, হজ গাইডলাইন)




