রয়টার্সের প্রতিবেদন

রয়টার্সের প্রতিবেদন
ইরান যুদ্ধের তিন মাস, হারছেন ট্রাম্প?

Published: 23 May 2026

পোস্ট ডেস্ক :


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে একের পর এক কৌশলগত সাফল্যের দাবি করলেও, যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পর এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে তিনি কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটি হারছেন? সামরিক হামলায় ইরানের ক্ষতি হলেও দেশটির কৌশলগত সক্ষমতা পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব এখনো বহাল রয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিও পুরোপুরি থামানো সম্ভব হয়নি। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ণ বিজয় দাবি অনেকের কাছেই দুর্বল মনে হচ্ছে।

বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একদিকে অনিশ্চিত কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রায়শই নতুন হামলার হুমকি দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নতুন হামলা হলে ইরান পুরো অঞ্চলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, নৌবাহিনী এবং শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। কিন্তু এরপর তেহরান হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে অবরুদ্ধ করে তেল ও গ্যাসের বাজারে চাপ সৃষ্টি করে। ইসরাইল ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে হামলা চালায়। এরপর ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের নির্দেশ দেন। এতেও তিনি তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, যে যুদ্ধটিকে ট্রাম্প স্বল্পমেয়াদি সহজ সাফল্য হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন, সেটি এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য এটি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি নিজেকে পরাজিত হিসেবে দেখতে একেবারেই পছন্দ করেন না।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস অবশ্য দাবি করেছেন, অপারেশন এপিক ফিউরি-তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে কিংবা অতিক্রম করেছে। তার ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব বিকল্প খোলা রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে: দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা তার পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে একটি হলো সীমিত সমঝোতাকে সম্মানজনক সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা। অন্যটি হলো আরও সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করা।

পারমাণবিক ইস্যুতে অচলাবস্থা: ট্রাম্প যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখনো সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পরও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় মজুত ভূগর্ভে রয়ে গেছে। যা ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধার করে অস্ত্র তৈরির উপযোগী করা সম্ভব হতে পারে। ইরান দাবি করছে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। এছাড়া দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নির্দেশ দিয়েছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো যাবে না।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধ ইরানকে উল্টো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে আরও আগ্রহী করে তুলতে পারে। যাতে ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার মতো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে প্রভাব: এই যুদ্ধের কারণে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও দুর্বল হয়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেক ইউরোপীয় দেশই এই যুদ্ধে সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কারণ যুদ্ধের বিষয়ে তাদের আগে জানানো হয়নি। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতা এবং যুদ্ধ মোকাবিলায় ইরানের কৌশল থেকে শিক্ষা নিচ্ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জেষ্ঠ্য গবেষক রবার্ট কাগান মন্তব্য করেছেন, ইরান যুদ্ধের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানের জন্য ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।