পশ্চিমবঙ্গে খামারিদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল
পোস্ট ডেস্ক :

পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র এ বছর কোরবানিতে গরু-মহিষ জবাই না করার বার্তা পৌঁছে গেছে। মুসলিম নেতাদের এই বার্তায় বলা হয়েছে, পরিকাঠামোর অভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক পশু জবাই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিটি কোরবানিতে গরু জবাই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। অযথা হয়রানি ও হেনস্থার মুখোমুখি না হয়ে মুসলমানদের গরু কোরবানি পরিহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে গবাদি পশু কেনা বন্ধ রয়েছে। যারা ইতিমধ্যে গরু ও মহিষ কিনেছিলেন খামারিদের কাছ থেকে তারা অর্থ ফেরত চাইতে শুরু করেছেন।
পশুজবাই নিয়ে গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার যে বিজ্ঞপ্তি জারি করে, তা বহাল থাকবে বলে জানিয়ে দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। অর্থাৎ জবাইয়ের উপযুক্ত বলে সনদ ছাড়া পশুজবাই করা যাবে না। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্রটের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের বেঞ্চ জানিয়েছে, প্রকাশ্যে পশুজবাই নিষিদ্ধ, এই শর্তও বিজ্ঞপ্তিতে যুক্ত করতে হবে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া গবাদি পশু জবাই করা যাবে না। ১৪ বছর বয়স হয়নি, এমন গবাদি পশুকে জবাই করা যাবে না। তা ছাড়াও মাংস কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণিসম্পদ দফতরের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন হবে। এর ফলে ঈদে গরুজবাই নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে দাবি।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসমি মুসলমানদের গরু-কোরবানি পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিটি এই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। তিনি বলেন, এই ধরনের নিয়ম কার্যকর করার আগে সরকারকে প্রথমে যথাযথ কসাইখানা এবং পশুচিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন,সরকারের উচিত প্রতিটি এলাকায় কসাইখানা নির্মাণ করা এবং প্রতিটি বাজারে পশুচিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা তোহা সিদ্দিকীও একই ধরনের আবেদন জানিয়েছেন। তিনি মুসলমানদের এ বছর কোরবানির জন্য গরু না কেনার আহ্বান করেছেন। বিজেপি সরকারের পশু জবাই সংক্রান্ত কঠোর নির্দেশিকার কথা উল্লেখ করে সিদ্দিকী বলেন, এ বছর গরু কোরবানি নয়; আমি সকলের কাছে গরু না কেনার আবেদন জানাচ্ছি। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, নতুন নিয়ম মেনে চলার কারণে গরু কোরবানি একটি কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে এবং এটি এড়িয়ে চললে ঈদুল আজহার উদযাপনের সময় বিতর্ক বা অশান্তি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এর পরিবর্তে সিদ্দিকী কোরবানির জন্য ছাগল বা অন্যান্য অনুমোদিত পশু উৎসর্গ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গরু জবাই নিয়ে রাজ্য সরকারের নিদের্শিকা সত্ত্বেও ১৪০০ বছরের পুরনো ঈদ কোরবানির ঐতিহ্য অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন আম জনতা পাটির্র বিধায়ক হুমায়ুন কবির। তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক আখতারুজ্জামানসহ অনেকেই দাবি করেছেন যে, এই বিধিনিষেধ ঈদুল আজহার ধর্মীয় রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। আখতারুজ্জামান বলেন, কোরবানি ইসলামের একটি ধর্মীয় প্রথা। এই সময়ে, নিজের পালিত গরু বা মহিষ আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়।
হুমায়ুন বলেছেন, এটি এমন একটি ঐতিহ্য যা ১,৪০০ বছর ধরে চলে আসছে এবং যতদিন এই পৃথিবী থাকবে, ততদিন এটি চলতে থাকবে। সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কবির কোরবানি প্রসঙ্গে বলেন, সরকার গরুর মাংস না খাওয়ার জন্য নিয়ম তৈরি করতে পারে, কিন্তু কোরবানি চলতেই থাকবে। আমরা কোনো আপত্তি শুনব না।
এদিকে, সরকারের কঠোর নির্দেশিকার ফলে পশুপালনের উপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর উপর আর্থিক ক্ষতি চাপছে। রাজ্যের দরিদ্র মানুষের আর্থিক ক্ষতি হবে। দরিদ্র মানুষ এই আশায় গবাদি পশু পালন করেন যে, সেগুলো বিক্রি করে কিছু আর্থিক সঞ্চয় হবে। কিন্তু, রাজ্য প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। অনেকের মতে, প্রস্তাবিত সরকারি বিধিনিষেধ মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে এবং কৃষক ও গবাদি পশু ব্যবসায়ীদের জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে, যাদের অনেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
কলকাতার নিকটবর্তী ভোজের হাটের জব্বর শেখ নামের এক খামার ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদককে জানান, এবছর রাজ্যের খামারিরা এমন বিপদের মুখে পড়লেন যে, তাদের পরিবারে কান্নার রোল শোনা যাচ্ছে। প্রায় সকলেই দাদন নিয়ে এ সময়ে কিছু লাভের আশায় গরু প্রতিপালন করেছিলেন। তারা কেউ গরু বিক্রি করতে পারছেন না। কলকাতার রাজাবাজারের আকিল আহমেদ জানিয়েছেন, কোরবানিতে গরু জবাই না হওয়ার বহু গরীব মানুষের জীবিকা শেষ হয়ে যাবে। তিনি প্রথমেই বলেন, গরুর হাটগুলোকে কেন্দ্র করে যে শেলা বসতো তাতে আশেপাশের বহু মানুষ নানাভাবে উপকৃত হতেন। খামারিদের দুদর্শা তো বলার মতো নয়। এছাড়া জবাই করার সঙ্গে যুক্ত কয়েক হাজার কসাই এবছর কাজ হারালেন। তেমনি চামড়া কারখানাতে চামড়ার সংকটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
আকিল আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রাজ্যে দুধের সংকট দেখা দেবে। গরু প্রতিপালনে খামারিরা অনাগ্রহী উঠছে বলে অনেকে জানিয়েছেন। এক খামারি বলেন, কোরবানির গরু বিক্রি করে আমরা নতুন করে গরুবাছুর কিনে তাদের প্রতিপালন করে পরের বছরের জন্য তৈরি হতাম। কিন্তু এখন থেকে আইন বলবৎ হওযার ফলে এই ব্যবসা থেকে সরে আসার কথা ভাবছেন খাটাল ব্যবসায়ীরাও।




