ভারত যে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ থেকে

Published: 30 March 2021

।। মানজিৎ ক্রিপালানি, রাজিব ভাটিয়া, সাগ্নিক চক্রবর্ত।।

বাংলাদেশ এই মাসে তিনটি বড় অনুষ্ঠান পালন করছে। সেগুলো হলো- জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষ বা সুবর্ণ জয়ন্তী এবং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর। বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল উন্নয়নের একটি কেসস্টাডি হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে এ দেশটি বৈশ্বিক জিডিপি তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ছিল আকর্ষণীয়, শতকরা ৮.৪ ভাগ, যা ওই বছর ভারতের জিডিপির দ্বিগুণ ছিল। কোভিড-১৯ মহামারিকালে যেসব দেশ ইতিবাচক বা পজেটিভ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানকার মাথাপিছু জিডিপি দুই হাজার ডলারের সামান্য নিচে।
প্রায় ভারতের সমান এই অংক। ২০২৬ সাল নাগাদ পরবর্তী ৫ বছরে স্বল্পোন্নত দেশের ট্যাগ থেকে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশ। ভারতের পাশাপাশি এগিয়ে যাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায়।

বাংলাদেশ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য এটা একটা গর্বের সময়। দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে ভিয়েতনাম। ঠিক তাদের মতোই এগুচ্ছে বালাদেশ। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির সদিচ্ছা প্রদর্শন করেছে।

ভিয়েতনাম বাজার এবং অর্থনৈতিক সংস্কার করেছে ১৯৮৬ সালে, যা দোই মোই হিসেবে পরিচিত। এর ফলে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং শিল্পায়ন সম্ভব হয়েছে। তারা টেক্সটাইল এবং গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদন শুরু করে। এর ফলে তারা এখন বৈশ্বিক একটি ‘প্লেয়ারে’ পরিণত হয়েছে। শুরু করেছে মোবাইল ফোন এবং ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি করা। চীন থেকে যেহেতু সরবরাহ চেইন বিস্তৃত, এর সুবিধা পাচ্ছে ভিয়েতনামও। বহুজাতিক কৌশল হিসেবে ‘চায়না +১’ কৌশলের অধীনে ভিয়েতনাম এখন ‘+১’। অব্যাহতভাবে এখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে জাপান ও থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার দেশ থেকে আসছে এসব বিনিয়োগ।

বাণিজ্য চুক্তি এবং নিজেকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের মধ্যে আনতে স্মার্ট সব চুক্তি আছে ভিয়েতনামের। তারা যুক্ত হয়েছে আসিয়ানে। এর ফলে ১৯৯৫ সাল থেকে তারা মুক্ত বাণিজ্য করতে পারে আসিয়ানে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আছে। তাদের একই রকম চুক্তি আছে আসিয়ানের মাধ্যমে ভারত, জাপান ও চীনের সঙ্গে। এসব ঘটনায় ভিয়েতনামের জনসংখ্যাকে দক্ষ শ্রমশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যাতে তারা কলকারখানায় বড় মাপের উৎপাদন করতে পারে। এমনটা করার মাধ্যমে খরচ কমিয়ে আনা হয়েছে। বিস্তৃত করা হয়েছে রপ্তানি।

একই কৌশল অনুসরণ করছে বাংলাদেশ। এরও উত্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত টেক্সটাইল এবং গার্মেন্ট শিল্প। বাংলাদেশ যত পণ্য রপ্তানি করে তার মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই এই গার্মেন্ট শিল্পের। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে প্রিফারেন্সিয়াল ট্রেড সুবিধা পায় বাংলাদেশ। অন্যদিকে জাপানকে অনুল্লেখযোগ্য বা জিরো ট্যাক্স দিতে হয়। ভারতের সঙ্গেও ঢাকা তৈরি পোশাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পায়। বছরের পর বছর বাংলাদেশ তার কৃষি উৎপাদন, পাওয়ার জেনারেশন, প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বৈদেশিক রেমিটেন্স বৃদ্ধি করেছে।
ভিয়েতনামের মতো বাংলােিদশে বিনিয়োগ খাত বিনিয়োগবান্ধব। বাংলাদেশের উদার সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি (এফডিআই পলিসি) স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে শতভাগ তারল্য সুবিধা অনুমোদন করে। বেশির ভাগ সেক্টর থেকে লভ্যাংশ ফেরত আসার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। বাংলাদেশে ক্রমেই বাড়ছে ভারতীয় কোম্পানির উপস্থিতি। এখানে ভারতীয় পণ্যের রয়েছে জনপ্রিয়তা। এটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বন্ধনের ফলাফল।

ক্ষুদ্রঋণে অন্য যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের ওপরে অবস্থান বাংলাদেশের। এই দেশটিই এই ক্ষুদ্রঋণ মডেলে রপ্তানি করেছে। গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্র্যাকের মতো বিশ্বের সবচেয়ে সফল এবং ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ের প্রবক্তা সংগঠন দেশে এবং আঞ্চলিকভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়ক হয়েছে। বছরের পর বছর এসব স্কিম পরিচালিত হতো নারীদের জন্য। এ থেকে শুধু আর্থিক স্বনির্ভরতা এসেছে এমন নয়। এর ফলে ওই সব নারীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলশ্রুতিতে টেক্সটাইল সেক্টরে বাংলাদেশের জনশক্তির প্রায় সবাই নারী। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির শতকরা ৮০ ভাগই এই তৈরি পোশাক। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পে নারীর সংখ্যা শতকরা ৯৫ ভাগ। শেখ হাসিনার মতো একজন নারী প্রধানমন্ত্রীকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পেয়ে তাদের জন্য সহায়ক হয়েছে। সরকারের পুষ্টি আপা প্রকল্প এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকের সঙ্গে এসব বিষয় মিলে বাংলাদেশের উন্নয়ন সূচক বাড়াতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশে কমে গেছে শিশু মৃত্যু হার, পয়ঃনিষ্কাশন, ক্ষুধা এবং লিঙ্গ সমতায় ভারত সহ অনেক দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের সফল উন্নয়ন প্রক্ষেপণ থেকে ভারত, দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্ব কি শিক্ষা নিতে পারে? অবশ্যই জনশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে উদারীকরণ করতে হবে। ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা হাতের নাগালে থাকতে হবে। এসব হবে বাংলাদেশের কাছ থেকে শিক্ষা। উপমহাদেশে বৈশ্বিক প্রাণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন হবে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা, থাকতে হবে কানেকটিভিটি এবং দেশের ভিতরের এবং বিদেশি বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ। দেশের ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যাবসাকে শক্তিশালী করতে আভ্যন্তরীণ উদ্যোক্তারা এর ভিত্তি রচনা করেন।
২৬শে মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে গেস্ট অব অনার হিসেবে ঢাকা সফর করেন। এ সময়ে তিনি দীর্ঘবিলম্বিত দ্বিপক্ষীয় সংযুক্তি বিষয়ক প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেয়ার কথা বলেছেন এবং কয়েকটি চালু করেছেন। তিনি আরো করতে পারেন। ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মানসুর গত সপ্তাহে গেটওয়ে হাউজ এবং কনরাড অ্যাডেনাউর স্টিফটাং আয়োজিত এক সেমিনারে বলেছেন, ১৯৪৭ সাল থেকেই সংযুক্তি বা কানেক্টিভিটি না থাকার কারণে উভয় দেশই ভুগেছে। এর মূল্য অনেক বেশি। এখন সময় আমাদের পাওয়ার সিস্টেমকে সন্নিবেশ করার। মুক্ত বাণিজ্য নিয়ে চিন্তা করার এবং ভিসা প্রক্রিয়াকে উদারীকরণ করার।

দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের বোঝা ভারত একা সব সময় বহন করবে এমনটা হতে পারে না। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যকারভাবে সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে এমন একটি অংশীদার পেয়েছে এখন।

(লেখকরা গেটওয়ে হাউজ: ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অন গ্লোবাল রিলেশন্স, মুম্বই-এর সঙ্গে যুক্ত। তাদের এ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে)