সিলেটে আইসিইউ বেড সংকট, বাড়ছে রোগীর চাপ

Published: 8 July 2021

সিলেট অফিস :


সিলেটে করোনাআক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন। করোনা আক্রান্ত কিংবা শ্বাস কষ্টে ভূগছেন এরকম রোগী নিয়ে হাসপাতালে গেলে সিট সংকটের কারণে রোগীকে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে একের পর এক হাসপাতালে। কোন হাসপাতালে সিট মিললেও মিলছে না আইসিইউ বেড। যার কারণে সিলেটে বাড়ছে রোগী মৃত্যুর হার।

সিলেটে অক্সিজেন সংকটের দোহাই দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে না আইসিইউ বেড। অথচ অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে; এখনো সিলেটে অক্সিজেনের তেমন সংকট নেই। বর্তমান চাহিদার দ্বিগুণ অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে তারা সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হবেন। তবে আরও ২০ থেকে ৩০ ভাগ ‘কিউবিক মিটার’ অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় সেটিও তারা এখনই দিতে পারবেন। কিন্তু করোনার এই ‘পিক টাইমে’ সিলেটে কেবলমাত্র অক্সিজেনের দোহাই দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও আইসিইউ সংকট দেখাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন- অনেক হাসপাতালে সাধারণ আইসিইউ বেড খালি থাকলেও সেগুলোতে করোনা উপসর্গ ও শনাক্ত হওয়া আশঙ্কাজনক রোগীকে ভর্তি করা হচ্ছে না। গত চারদিন ধরে সমানতালে চলছে আইসিইউ সংকট। সরকারি- বেসরকারি কোথাও আইসিইউ বেড খালি নেই।

আইসিইউ’র অপেক্ষায় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়াচ্ছেন স্বজনরা। রোগীরাও অক্সিজেন সংবলিত গাড়িতে করে হাসপাতালের সামনে আইসিইউ’র জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এ কারণে করোনায় সিলেটে চলছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙছে। গতকালও সিলেটে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৯ জন মারা গেছেন। উপসর্গ নিয়েও মৃত্যুবরণ করেছেন ১০ জনের মতো রোগী। তাদের হিসাব কেউ রাখছে না। সিলেটে এই মুহূর্তে আইসিইউ সংকটের কারণে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকারিভাবে সিলেটের শামসুদ্দিন হাসপাতালে ১৬টি আইসিইউ বেড ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮টি আইসিইউ বেড করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ পাওয়া এখন সোনার হরিণ।

খোদ হাসপাতালে ভর্তি থাকা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ রোগী আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এ কারণে নতুন রোগীদের অপেক্ষা বাড়ছেই। বেসরকারি ভাবে চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মিলে ৫১টি কোভিড আইসিইউ বেড রয়েছে। টাকা দিয়ে, তদবির করেও আইসিইউ বেড পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আইসিইউ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন সাপোর্ট স্বাভাবিক রয়েছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় জানিয়েছেন, ‘সরকারিভাবে আইসিইউ বেডের লিমিটেশন রয়েছে। সেটি সবাই জানেন। সরকারিভাবে দুটি হাসপাতালে ২৪টি আইসিইউ বেডে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। রোগীর চাপ রয়েছে। তবে সিলেটের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো চেষ্টা করলে আইসিইউ বেড বাড়াতে পারে। তারা করোনার এই সময়ে এগিয়ে এলে লড়াই করাটা আরও সহজ হবে।’ তিনি আরও জানান, ‘এরপরও ওসমানী হাসপাতালে ২শ’র উপরে কোভিড বেডে চিকিৎসা চলছে। শামসুদ্দিনে তো রয়েছেই।’

এদিকে- সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেনের কোনো সংকট নেই। শামসুদ্দিনে অক্সিজেনের চাহিদা আগের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বেড়েছে। সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মোজয় দত্ত মানবজমিনকে জানিয়েছেন, শামসুদ্দিন স্প্রেক্টা কোম্পানির পক্ষ থেকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে। আগে যেখানে ১৫ দিনে একবার ১০ হাজার কিউবিক মিটার অক্সিজেনের প্রয়োজন হতো এখন সেখানে ৩ দিনেই প্রয়োজন হচ্ছে ওই পরিমাণ অক্সিজেনের। অক্সিজেন নিয়ে আসতে হয় চট্টগ্রাম থেকে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিয়ে সব সময় চিন্তা থাকে। কখনো কখনো অক্সিজেন শেষ হওয়ার মুহূর্তে গাড়ি আসে সিলেটে। সেই গাড়ি আসতে একটু বিলম্ব হলে শামসুদ্দিনে সংকট দেখা দেবে। তবে এখনো সিলেটের শামসুদ্দিন হাসপাতাল অক্সিজেনের সংকটে পড়েনি বলে জানান তিনি। বেসরকারি মেডিকেল ও ক্লিনিক মালিকদের পক্ষে বলা হচ্ছে- আইসিইউ বেড তারা বাড়াতে পারছেন না অক্সিজেন সংকটের কারণে। এই মুহূর্তে অক্সিজেনের যে সরবরাহ রয়েছে সেগুলো দিয়ে তারা কোভিড রোগীদের চিকিৎসা স্বাভাবিক রাখছেন। আর বাড়াতে অক্সিজেন সাপোর্ট লাগবে।

অক্সিজেন সাপোর্ট বাড়ালে তাদের পক্ষে আরও বেশি সংখ্যক আইসিইউ বেড বাড়ানো সম্ভব হবে। আগের তুলনায় এখন চার থেকে পাঁচগুণ বেশি অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে। সক্ষমতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সিলেটের বেসরকারি মেডিকেল ও ক্লিনিক এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. নাসিম হোসাইন জানিয়েছেন, ‘সিলেটে এই মুহূর্তে বেসরকারি পর্যায়ের আইসিইউর দ্বিগুণ বেড দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলো। আমরা অক্সিজেন পাচ্ছি না। বর্তমানে কোভিড আইসিইউতে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ অক্সিজেন লাগছে। এই অক্সিজেন জোগাড় করতেও কষ্ট হচ্ছে। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তারা কোভিড রোগীদের জন্য আইসিইউ বেড বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এরপরও এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

দরোজায় এসে আইসিইউ সংকটের কারণে যাতে রোগীরা ফিরে না যায় সেদিকে সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।’ সিলেটে লিন্ডে ও ফ্রেস কোম্পানির অক্সিজেন সরবরাহ করেন দক্ষিণ সুরমার স্থানীয় এজেন্ট মোহাম্মদ আলী। তিনি জানিয়েছেন, ‘সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একাংশ সহ বেশির ভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ক্লিনিকে তিনি অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকেন। আগে যেখানে প্রতিদিন অক্সিজেনের চাহিদা ছিল ২ হাজার কিউবিক মিটারের, এখন সেখানে প্রতিদিনই চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার কিউবিক মিটারে। সিলেটের কেউ যাতে অক্সিজেন সংকটে না ভুগে সেদিকে তারা বেশি নজর দিচ্ছেন। বর্তমান চাহিদার আরও ২০ ভাগ অক্সিজেন অতিরিক্ত প্রয়োজন হলে তারা দিতে পারবেন। তবে বর্তমান চাহিদার দ্বিগুণ পরিমাণ অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে তাদের পক্ষে হয়তো যোগান দেয়া কষ্টকর হতে পারে।