ভবিষ্যতের সমাজ ও রাজনীতি

Published: 11 December 2021, 3:04 PM

।। ড. মো. আনিসুজ্জামান।।

৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান ইজম দূর হয়নি। খেলার মাঠে, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নির্বাচনে পাকিস্তান ইজম উদগ্রভাবে প্রকাশ পায়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং মতদ্বৈধের সুযোগ নেয় পাকিস্তানপন্থীরা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কখনো কখনো তারা ক্ষমতায় যায় অথবা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ওপর আঘাত করে। ছদ্মবেশী পাকিস্তানপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। চিহ্নিত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়; কিন্তু ছায়ার আড়ালে থাকা শত্রু বড় ভয়ংকর।

৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশ ইজম প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন। পঁচাত্তরের রুধিরাক্ত বাংলাদেশে পাকিস্তান ইজম গতি পায়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন মানুষের বাস। আমরা অনেকেই ভুল করি এই ভেবে যে পাকিস্তান শুধু একটি দেশের নাম। কিন্তু পাকিস্তান একটি মতবাদের নাম। এই মতবাদ কখনো তালেবান সৃষ্টি করে, আবার কখনো ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশকে পাকিস্তান ইজমে বিশ্বাসীরা ব্যর্থ রাষ্ট্রের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল।

সামরিক স্বৈরশাসকদের সহযোগিতায় পাকিস্তান ইজম বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পায়। সরকারি-বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানপন্থীরা সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত। তারা তাদের মতাদর্শিক লোক সৃষ্টি করছে। ব্যাংক-বীমা অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানে তাদের লোকের কোনো অভাব নেই। মৌলবাদের অর্থনীতি তাদের চালিকাশক্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাকিস্তান ইজমে বিশ্বাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে। সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানপন্থী লোকদের দম্ভ এখনো কমেনি। সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য মহোদয়রা অনেক সময় জামায়াত-বিএনপি জোটের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। সরকারের নিয়োগকৃত সম্মানিত প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা কী সব সময় বাংলাদেশ ইজম সৃষ্টিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন?

বাংলাদেশ ইজমের ওপরই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ ইজমের জন্যই লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বে সম্মানিত এবং উন্নয়নে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানপন্থীরা বসে নেই। ধর্মীয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী চিন্তাশীল মানুষের ওপর তারা শারীরিক এবং মানসিক আঘাত হানছেই। মানসিক আঘাতের ফলে বাংলাদেশপন্থীরা কখনো কখনো আত্মসম্মান হারিয়ে নিষ্ক্রিয় জীবন যাপন করেন। পাকিস্তানপন্থীদের মদদদাতা এবং অর্থ ও আশ্রয়দাতাদের সম্পর্কে সতর্ক না হলে পাকিস্তান ইজমে বিশ্বাসীদের সংখ্যা হ্রাস করার অন্য কোনো উপায় নেই। সরকারি-বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তান ইজমে বিশ্বাসীদের নিরাপদে-নির্বিঘ্নে এবং সম্মানের সঙ্গে রেখে শুধু স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশ ইজম বাঙালির মননজগতে বৃদ্ধি করা যাবে না। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তির ঐক্যবদ্ধতা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের অগ্রণী ভূমিকা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে গণজাগরণ সৃষ্টি করা অসম্ভব।

চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সমাজ থেকে পাকিস্তানপন্থী উন্নয়নের পরিপন্থী এবং প্রগতিবিরোধীদের সংখ্যা কমেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দেশের মানুষের কাছে তারা ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে বাংলাকে আফগানিস্তানে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। তরুণ প্রজন্মকে পকিস্তান ইজমে বিশ্বাসীরা বিভ্রান্ত করে। সবাই প্রতারিত হয় না। তবে কেউ কেউ যে হয় তা মাঝেমধ্যে প্রকাশ পায়।

সরকারি-আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশবিরোধী শক্তিকে চিহ্নিত করা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির অন্যতম দায়িত্ব। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পোষ্য কোটা এবং চাচা কোটায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পরিপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা নিয়োগদাতাদের জবাবদিহি আওতাবহির্ভূত রেখে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হতে কতক্ষণ।

মুজিববর্ষে অন্যতম অঙ্গীকার হওয়া উচিত দেশ থেকে স্বাধীনতা এবং উন্নয়নবিরোধীদের চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো। খেলার মাঠে কিংবা ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’ স্লোগানের মধ্যে সময়ের পার্থক্য থাকলেও মূল সূত্র একই। ধর্মী জঙ্গিরা পাকিস্তান ইজমে বিশ্বাসী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ ইজম প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা ছাড়া উন্নয়ন স্থায়ী হবে না। সরকারের নিয়োগকৃত উপাচার্য সম্মানিত মহোদয়রা এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারেন। ইউজিসিরও ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং সেল গঠন করে বাংলাদেশ ইজম প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন উপাচার্য বলেছিলেন, রাজনীতি এবং শিক্ষা, গবেষণা ভিন্ন। একটির সঙ্গে অন্যটি যায় না। এই মনোভাবে আড়ালে তিনি কোনো কোনো সময় জামায়াত-শিবির প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছেন। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দুর্বলতার সুযোগ নেয় বাংলাদেশবিরোধী শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দুর্বলতা দেখালেও জামায়াত-বিএনপি জোট কখনো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল শক্তিকে সামান্যতম সহযোগিতা করেনি। চিহ্নিত শত্রুর আড়ালে থেকে সিভিল সোসাইটির চাদর গায়ে দিয়ে কখনো কখনো দাবি করা হয় মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পর স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে দেশকে বিভক্ত করা হচ্ছে। এসব কথা বলে তারা স্বাধীনতাবিরোধীদের রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বাংলাদেশবিরোধীদের অনুকম্পা দেখালেও জামায়াত-শিবির কখনো স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির উপকারে আসে না।