ভারতের প্রবৃদ্ধিতে বৈশ্বিক আস্থা, পূর্বাভাস ৭ শতাংশের ওপরে

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাসে নতুন আশাবাদ; মহামারির ধাক্কা সামলে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে অবস্থান আরও মজবুত ভারতের। ভারতের অর্থনীতি নিয়ে ফের আশাবাদী বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ শতাংশ বা তারও বেশি করেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও ভারতের অর্থনৈতিক গতিশীলতা আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, ভারতের সাফল্যের গুরুত্ব রয়েছে তার ব্যাপ্তিতেও। ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যার একটি দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সহজ নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিবিদ কিউনঘুন কিম সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ভারতের গত এক দশকের অর্থনৈতিক সাফল্য বিশ্বজুড়ে আরও বেশি আলোচনার দাবি রাখে।
বর্তমান সাফল্যের মূল সূত্র মহামারির পর অর্থনীতির দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারতের অর্থনীতি ৫.৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধি পৌঁছে যায় ৯.৭ শতাংশে। এরপর টানা চার বছর ৭ শতাংশের বেশি হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে দেশটি। অর্থনীতিবিদরা একাধিকবার তাঁদের পূর্বাভাস সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে অনুমানের চেয়ে ভালো হয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৮৩ শতাংশ। ১৯৬০ সালের পর এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের গড় প্রবৃদ্ধি। এর চেয়ে সামান্য বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের সময়ে, যখন ভারত প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম উদীয়মান শক্তি হিসেবে পরিচিতি পায়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। দুই দশক আগে ভারতের অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে আজকের ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে ভারতের অবদান এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আইএমএফ সম্প্রতি ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭ শতাংশে উন্নীত করেছে। সংস্থাটির মতে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং পরিষেবা খাতের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধির হার ৭.১ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে এডিবি বলেছে, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ভোক্তা ব্যয়ের স্থিতিশীলতা ভারতের প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের প্রবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি কাজ করছে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ কর্মক্ষম জনসংখ্যা, অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ, উৎপাদন শিল্পে সম্প্রসারণ এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা এবং উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিও অর্থনীতিকে নতুন গতি দিয়েছে। তবে সামনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতও ভারতের প্রবৃদ্ধির পথে ঝুঁকি হয়ে থাকতে পারে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের বার্তা স্পষ্ট। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এখন ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্পই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে যে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পথ ভারত তৈরি করেছে, তা শুধু একটি দেশের সাফল্য নয়; বরং বর্তমান দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ঘটনা। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দিকে অগ্রসরমান ভারতের এই যাত্রা আগামী বছরগুলোতেও বৈশ্বিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
সুমনা আদক, UK




