দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলছে চীন!

Published: 6 January 2022, 3:56 PM

পোস্ট ডেস্ক :


দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলছে চীন। এর ফলে এসব দেশ ঋণ শোধ করতে লড়াই করছে। এক পর্যায়ে বিপন্ন অবস্থায় পড়া দেশগুলোর ওপর চাপ বা প্রভাব সৃষ্টি করে চীন। এ অভিযোগ নিয়ে চীনের সমালোচনা বহুদিন ধরে। কিন্তু আসলেই কি তাই? এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। তাদের অভিযোগ, চীনের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করার জন্যই পশ্চিমারা এমন সব প্রচারণায় নেমেছে। চীনের বক্তব্য, এমন একটি দেশও নেই, যারা চীনের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার ফলে কথিত ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়েছে। এসব নিয়ে অনলাইন বিবিসিতে দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন লিখেছেন কাই ওয়াং।

তিনি আরো লিখেছেন, বিশ্বে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা দেশগুলোর অন্যতম চীন।
গত এক দশকে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে দেশটি ঋণ দিয়েছে তিনগুন। ২০২০ সালের শেষ সময় পর্যন্ত এর পরিমাণ ১৭০০০ কোটি ডলার। তবে এই সংখ্যায় যা বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে চীনের। যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম অ্যান্ড ম্যারি ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক পরিষদ এইডডাটার গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে চীন যেসব ঋণ দিয়েছে, তার অর্ধেকই সরকারি ঋণ বিষয়ক পরিসংখ্যানে দেখানো হয় না। সরকারের ব্যালেন্সড শিটেও তা দেখানো হয় না। এসব হিসাব রাখে রাষ্ট্র মালিকানাধীন কোম্পানি এবং ব্যাংকগুলো, যৌথ উদ্যোগ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ফলে এসব হিসাব সরাসরি সরকার থেকে সরকার পর্যন্ত রাখা হয় না।

এইডডাটার তথ্যমতে, চীনের কাছ থেকে কমপক্ষে ৪০টি নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশ ঋণ নিয়েছে। এসব দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মোট যে পরিমাণ তার শতকরা ১০ ভাগের বেশি এই ঋণের পরিমাণ। এটাকে বলা হচ্ছে ‘হিডেন ডেবথ’ বা ঋণের ফাঁদ।
জিবুতি, লাওস, জাম্বিয়া এবং কিরগিজস্তান তাদের নিজেদের বার্ষিক জিডিপির শতকরা কমপক্ষে ২০ ভাগের সমান ঋণ নিয়েছে চীনের কাছ থেকে। এর বেশির ভাগই নেয়া হয়েছে সড়ক, রেলপথ, বন্দরের মতো অবকাঠামো বিষয়ক প্রকল্পে। ঋণ নেয়া হয়েছে খনি এবং জ্বালানি শিল্পে। এসব ঋণ দেয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে।

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বৃটেনের পররাষ্ট্র বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর প্রধান রিচার্ড মুর বলেছেন, অন্য দেশগুলোর ওপর আধিপত্য অর্জনের জন্য এই ঋণের ফাঁদ পাতছে চীন। এর ফলে যেসব দেশকে চীন ঋণ দিচ্ছে, তারা যদি ঋণ পরিশোধ করতে না পারে তাহলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে চীন। এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন প্রত্যাখ্যান করেনি বেইজিং। এক্ষেত্রে সমালোচকরা একটি উদাহরণ হিসেবে শ্রীলঙ্কার কথা তুলে ধরেন। সেখানে চীনের বিনিয়োগে হাম্বানতোতা বন্দরে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে। কিন্তু চীনের কাছ থেকে শত কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং চীনের কন্ট্রাক্টর দিয়ে এর কাজ করানোর বিষয়টি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কাকে ঋণের ভারে জর্জরিত করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সালে আরো চীনা বিনিয়োগ পেতে এই বন্দরের শতকরা ৭০ ভাগ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ চীনের রাষ্ট্র মালিকানাধীন চায়না মার্চেন্টসকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে রাজি হয় শ্রীলঙ্কা।

বৃটেনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের এই বন্দর প্রকল্প বিষয়ক বিশ্লেষণে এই বন্দরের বিষয়টি ঋণের ফাঁদ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বলা হয়েছে, এই চুক্তি করা হয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক উদ্দেশে। আর চীনও কখনো ওই বন্দরের আনুষ্ঠানিক মালিকানা নেয়নি। এর অর্থ হলো শ্রীলঙ্কার সার্বিক ঋণের বিশাল একটি অংশের মালিক চীনের সরকারি পর্যায়ের ঋণদাতারা নন। এ ছাড়া এই বন্দর থেকে সামরিক কোনো সুবিধা চীন নিয়েছে এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

তা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কায় চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গত এক দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এর ফলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে, তারা এ অবস্থাকে ব্যবহার করে এ অঞ্চলে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা বাস্তবায়ন করতে পারে। বিশ্বে আরো অনেক দেশ আছে যারা চীনের ঋণ নিয়েছে এবং তাতে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে চীনকে কণ্ট্রাক্ট দেয়া হয়েছে। ফলে এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর চীনের একটি লিভারেজ আসতে পারে। তবে এইডডাটার গবেষণা অথবা অন্য গবেষণায় শত শত ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি যে, চীনের রাষ্ট্র মালিকানাধীন ঋণদাতারা ঋণগ্রহীতাদের বড় কোনো সম্পদ প্রকৃতপক্ষে জব্দ করেছে।

চীন আসলে বিদেশে দেয়া ঋণের রেকর্ড প্রকাশ করে না। এক্ষেত্রে তারা চুক্তির মধ্যে অনেক ধারা রাখে, যা প্রকাশ করা হয় না, যা ঋণগ্রহীতাদের থেকেও তথ্য প্রকাশে বাধা দেয়। আন্তর্জাতিক ঋণ বিষয়ক চুক্তিতে একে দেখা হয় গোপনীয় হিসেবে এবং এই চর্চাটি সাধারণ বিষয়। লন্ডনের কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর লি জোনস বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক ঋণের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। উন্নয়ন খাতে চীন যে অর্থায়ন করে তা মৌলিক অর্থেই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর বেশির ভাগই প্যারিস ক্লাবের মাধ্যমে তাদের ঋণ বিষয়ক তথ্য শেয়ার করে থাকে। এই গ্রুপে যোগ দেয়নি চীন। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ডাটা ব্যবহার করে অন্যদের তুলনায় চীনের দেয়া ঋণ পরিষ্কারভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
পশ্চিমা সরকারগুলোর চেয়ে অধিক সুদহারে ঋণ দেয়ার প্রবণতা আছে চীনের। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ৪ ভাগ ঋণ দেয়া হয় বাণিজ্যিক বাজারের হারে, যা বিশ্বব্যাংক বা ফ্রান্স, জার্মানির মতো একক দেশের দেয়া প্রচলিত ঋণের চেয়ে চারগুন। চীনের দেয়া ঋণ পরিশোধের সময়ও স্বল্প। ১০ বছরের কম। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই সময় প্রায় ২৮ বছর। চীনা রাষ্ট্র মালিকানাধীন ঋণতাদাদের চাহিদায় থাকে এই যে, ঋণ গ্রহিতার একটি অফসোর একাউন্টে ন্যূনতম অর্থ জমা থাকতে হবে। ওই একাউন্টে ঋণ গ্রহীতার ‘এক্সেস’ থাকতে হবে। এইডডাটার নির্বাহী পরিচালক ব্রাড পার্কস বলেন, যদি ঋণ গ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে খারাপ ঋণ (ব্যাড ডেবট) সংগ্রহের পথে না গিয়ে সরাসরি একাউন্ট থেকে অর্থ নিতে পারে। পশ্চিমাদের দেয়া ঋণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিরল।

বর্তমানে বৃহৎ এবং দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতিগুলোর সংগঠন জি২০ একটি উদ্যোগ নিয়েছে। তার অধীনে করোনা মহামারিকালে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সমস্যা মোকাবিলা করতে ঋণ প্রস্তাব করছে। এতে যোগ দিয়েছে চীন। বলেছে, এই পরিকল্পনায় যেসব দেশ যোগ দিয়েছে তাদের যেকারো তুলনায় সবচেয়ে বেশি অর্থ তারা দিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, ২০২০ সালের মে মাস থেকে এই স্কিমের অধীনে জি২০ দেশগুলো ডেবট রিলিফ হিসেবে কমপক্ষে ১০৩০ কোটি ডলার বিতরণ করেছে।